Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | চট্টগ্রামে আইনি মারপ্যাঁচে পাহাড়ে অবৈধ দখলদারদের হচ্ছে না উচ্ছেদ

চট্টগ্রামে আইনি মারপ্যাঁচে পাহাড়ে অবৈধ দখলদারদের হচ্ছে না উচ্ছেদ

image_printপ্রিন্ট করুন

নিউজ ডেক্স : নদী দখলের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগরের পাহাড়গুলো দখলে নিচ্ছে একশ্রেণীর ভূমিদস্যু। শত শত একর পাহাড় দখল করে কেটে বসতি নির্মাণ করা হয়েছে। আইনি মারপ্যাঁচে এসব পাহাড় থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে ব্যর্থ হচ্ছে প্রশাসন। বিশেষ করে নগরীর ১৬ স্পটে রেলওয়ে, গণপূর্তসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মালিকানাধীন পাহাড় অবৈধ দখলদারদের দখলে। বর্ষায় পাহাড়ের ঢালুতে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরানো ও মাইকিংয়ের মধ্যে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ সীমাবদ্ধ থাকে।

কম আয়ের আশ্রয়হীন মানুষ সবুজ পাহাড়কে মাথার গোঁজার ঠাঁই বানিয়েছে। বেশিরভাগ পাহাড় দখল করেছে প্রভাবশালীরা। দখলকারীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক আমলা, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় বড় কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মতিঝর্ণা বাটালি হিল, পোড়া কলোনি, একে খান পাহাড়, আমিন জুট মিল সংলগ্ন পাহাড়, ভেড়া ফকিরের পাহাড়, টাংকির পাহাড়, খুলশী, আকবর শাহ, পাহাড়তলী, রেলওয়ের মালিকানাধীন লিজ দেয়া অপদখলীয় ঝিল-১, ঝিল-২, ঝিল-৩, সী ওয়ার্ল্ডের পেছনে শান্তিনগর, জিয়ানগর, মধ্যমনগর, মুজিবনগর ও লেক সিটির আশেপাশের এলাকা, বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সিডিএ লিংক রোড এলাকার পাহাড়গুলো ঝুঁকিপূর্ণ। ভারী বৃষ্টিতে সম্ভাব্য পাহাড় ধসে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এসব স্থান থেকে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে মসজিদ-মাদ্রাসা হতে নিয়মিত মাইকিংয়ের মাধ্যমে সতর্কবার্তা দেয়া হচ্ছে।

গতকাল সরেজমিনে ফিরোজ শাহ, পশ্চিম খুলশী ও জালালাবাদ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাহাড়ের পাদদেশে সরকারি জায়গাতে সাবেক আমলা, রেলওয়ের বড় বড় কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের নামে সাইনবোর্ড ঝুলানো হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ঝুলছে সাইনবোর্ড। এক সাবেক অতিরিক্ত সচিবের স্ত্রীর নামেও ঝুলছে সাইনবোর্ড। কোথাও পাহাড় কেটে রাস্তা ও প্লট তৈরি করা হয়েছে।

গতকাল দুপুরে কৈবল্যধাম বিশ্ব কলোনি সংলগ্ন ঝিল-১ এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোতে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং করতে দেখা গেছে। মাইকিং টিমে থাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কর্মচারী আকবর বলেন, এখানে বর্ষা মৌসুমে লোকজনকে সরানোর জন্য মাইকিং করা হয়। তারপরও তারা সরে না। ঘূর্ণিঝড় কিংবা অতি বর্ষণের সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরিয়ে নেওয়া হলেও তারা পুনরায় চলে আসে।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা পাহাড় দখল করে কেটে বসতি নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছে। এসব পাহাড়ে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। রয়েছে ওয়াসার পানির সংযোগও। প্রশাসনের উচ্ছেদ ঠেকাতে নিম্নআয়ের মানুষদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দখলদাররা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, রেলওয়ে ফয়’স লেক সংলগ্ন পাহাড় একটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দিলেও তারা ইজারাকৃত পুরো জায়গা দখলে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইজারাকৃত জায়গাগুলোতে এখন অবৈধভাবে দখল হয়েছে। এর মধ্যে রেলওয়ে ওই জায়গার ইজারা বাতিল করলে ইজারা নেওয়া প্রতিষ্ঠান উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়। আদালত ওই জায়গায় স্থগিতাদেশ দেয়। এরপর অবৈধ দখলকারীদের অনেকে ওই মামলায় পক্ষভুক্ত হয়েছে। যে কারণে দখল হওয়া জায়গাগুলোতে উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না। রেলওয়ের ওই পাহাড়গুলোতে দখলদাররা শত একরের মতো জায়গা দখল করে ঝিল-১, ঝিল-২, ঝিল-৩ নামের বড় বড় বসতি তৈরি করেছে। যেখানে কয়েক হাজার পরিবার বসবাস করে।

ফিরোজ শাহ ইউনিট আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক মো. ফারুক গতকাল বলেন, পুরো ফিরোজ শাহ একটি স্টেট। হাউজিং স্টেটের প্লট হিসেবে দখল কিনেছি। এখানে বাবার নামে কারো জায়গা নেই। সবাই মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়েছে। তিনি বলেন, ১ নং ঝিল, ২ নং ঝিল, ৩ নং ঝিল সবই রেলের জায়গা। যে যার মতো করে বসতি নির্মাণ করেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যালয়ের পরিচালক মো. নূরুল্লাহ নূরী বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীতে আমাদের হিসেবে ১৬ স্পটে পাহাড়গুলোতে অবৈধ বসতি রয়েছে। বেশিরভাগ পাহাড় রেলওয়ে ও গণপূর্তের। একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন রয়েছে। এসব পাহাড় নিয়ে উচ্চ আদালতে অসংখ্য মামলা রয়েছে। মামলার কারণে অনেক পাহাড় থেকে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ সম্ভব হয় না।

কাট্টলী সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) তৌহিদুল ইসলাম বলেন, বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের আশঙ্কা তৈরি হলে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোয় পাহাড়ের পাদদেশের বসতির লোকজনকে সরিয়ে নিই। তারা আবার ওইসব স্থানে বসবাস শুরু করে। তিনি বলেন, ফিরোজ শাহ কলোনি সংলগ্ন পাহাড়গুলোর পুরো জায়গা রেলওয়ের মালিকানাধীন। মামলা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে আমরা চাইলেও উচ্ছেদ করতে পারি না। তারপরও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মাইকিং করা হচ্ছে, লোকজনকে সরে যাওয়ার জন্য সচেতন করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম বলেন, ফয়’স লেকের আশেপাশের পাহাড়গুলো রেলওয়ের হলেও কিছু অংশ লিজ দেওয়া হয়েছে। এসব জায়গা নিয়ে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে। আমাদের আইন কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলেছি। মামলা নিষ্পত্তি হলে ওই জায়গাগুলো থেকে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করে নিজেদের দখলে নেব। দৈনিক আজাদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!