Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | কিশোরীকে দুর্গম জঙ্গলে নিয়ে গণধর্ষণ, প্রধান আসামি গ্রেফতার

কিশোরীকে দুর্গম জঙ্গলে নিয়ে গণধর্ষণ, প্রধান আসামি গ্রেফতার

নিউজ ডেক্স: চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নে এক কিশোরীকে (১৫) মুখ চেপে ধরে নির্জন পাহাড়ি জঙ্গলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের লোহমর্ষক ঘটনা ঘটেছে। পাশবিক এই নির্যাতনের সময় অপরাধীরা মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার প্রধান আসামি মো. বাদশা মিয়াকে (৩৬) পুলিশ গ্রেফতার করেছে। দুর্গম পাহাড়ি এই এলাকায় সংঘটিত অপরাধের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনার মুখে সময়মতো পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আসামিকে থানা হেফাজতে নেয়।

শনিবার (৩০ মে) ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানায় তিনজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। এর আগেরদিন শুক্রবার স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা বাদশাকে ধরে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পরেরদিন শনিবার সকালে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে বলে। তার বিরুদ্ধে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন- চন্দ্রঘোনা থানার ধলিয়া মুসলিমপাড়ার মো. ছাবেরের ছেলে মো. সাইফুল (২৭) এবং রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া ইউনিয়নের জয়নগর মুকতুল্লা টিলার মো. জালালের ছেলে মো. মাহাবুব ওরফে মালু (৩০)। আর গ্রেফতারকৃত বাদশা মিয়া পদুয়া ইউনিয়নের জয়নগর মাতব্বর টিলার মো. জসিম উদ্দিনের ছেলে।

মামলার এজহার ও স্থানীয় বিবরণ থেকে জানা যায়, ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবা পেশায় একজন কৃষক। গত ২৪ মে সকালে তাঁদের তিনটি ছাগল স্থানীয় নুরুল কবির হুজুরের বাড়ির সামনের মাঠে ঘাস খাওয়ার জন্য রেখে আসা হয়। প্রতিদিনের মতো ছাগলগুলো সন্ধ্যায় বাড়ি না ফেরায় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ওই কিশোরী মাঠে সেগুলোকে খুঁজতে যায়।

অভিযোগে বলা হয়, মাঠে কিশোরীকে একা পেয়ে আসামি বাদশা মিয়া হঠাৎ তার মুখ চেপে ধরে পাশের নির্জন জঙ্গলের ভেতর টেনে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে সে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কল করে অপর দুই সহযোগী সাইফুল ও মাহাবুবকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনে। সেখানে আসামিরা ভীতি প্রদর্শন করে কিশোরীকে পালাক্রমে গণধর্ষণ করে।

নির্যাতনের শিকার কিশোরীর বরাত দিয়ে তাঁর স্বজনরা জানায়, পাশবিক এই নির্যাতনের সময় আসামিরা মোবাইল ফোনের ক্যামেরা দিয়ে পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করে। অবর্ণনীয় এই নির্যাতনের মুখে কিশোরী আসামিদের হাত-পা ধরে কান্নাকাটি করে আকুতি জানিয়ে বলেছিল, “আংকেল, আমার সাথে এসব না করে আমাকে বরং বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেন।” কিন্তু পাথরহৃদয় অপরাধীদের মন তাতে গলেনি। উল্টো পাশবিক নির্যাতন শেষে এই ঘটনা কাউকে জানালে ধারণকৃত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তারা পালিয়ে যায়।

লোকলজ্জা ও চরম ভিডিও ফাঁসের ভীতির কারণে শুরুতে বিষয়টি প্রকাশ না করলেও, পরবর্তীতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ২৯ মে পরিবারের কাছে কিশোরী ঘটনাটি খুলে বলে। এসময় তাকে ঔষধের একটি পাতা দিয়ে এগুলো খাওয়ার জন্যেও বলে বলে জানান তারা।

রবিবার (৩১ মে) সকালে সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, মূল উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পদুয়া রাজারহাট বাজার। সেখান থেকে আরও ৫ কিলোমিটারের অত্যন্ত দুর্গম ও পাহাড়ি পথ পেরিয়ে রাঙ্গুনিয়া ও পার্বত্য বান্দরবান সীমান্ত এলাকায় ঘটনাস্থলটির অবস্থান।

জয়নগর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান, এই দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় একটি চিহ্নিত চক্র এলাকাটিকে মাদক, দস্যুতা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। এমনকি পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের সাথেও এই চক্রের নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাস্থলে এখনও আসামিদের মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং ঝোপের ভেতর পাতা বিছানো স্পট দৃশ্যমান রয়েছে।

মো. হারুন জানান, “এই চক্রের ভয়ে এলাকার সাধারণ মানুষ তটস্থ থাকে। ধর্ষণের ঘটনার পর তারা ভুক্তভোগী পরিবারটিকে ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিল। বিক্ষুব্ধ জনতা প্রধান আসামি বাদশা মিয়াকে ধরে ফেললে, তার বাহিনীর সদস্যরা লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার পুলিশ সঠিক সময়ে উপস্থিত হওয়ায় অপরাধীরা পালিয়ে যায় এবং পুলিশ আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।”

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এই সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার ঠিক তিন দিন আগে, একই এলাকায় একটি দুর্ধর্ষ দস্যুতার ঘটনা ঘটে। পার্শ্ববর্তী জয়নগর চক এলাকার প্রবাসী আক্তার হোসেনের স্ত্রী জেসমিন আক্তার জানান, সন্ধ্যায় ৪ জন মুখবঁধা যুবক দেশীয় অস্ত্রের মুখে তাকে জিম্মি করে এবং তার সন্তানদের হাত-মুখ বেঁধে ফেল রাখে। এরপর তাকে বেধড়ক মারধর করে। দস্যু দলটি ঘর থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার ও মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়। জেসমিন আক্তারের প্রবল সন্দেহ, গ্রেফতারকৃত বাদশা মিয়াই এই দস্যুতার মূলহোতা এবং এই ঘটনায় তিনি আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়েছেন।

দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হিলাল উদ্দিন আহমেদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “ভুক্তভোগীর পিতার লিখিত এজহারটি মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামিকে গ্রেফতার করেছে। ধর্ষণের সময় ভিডিও ধারণের বিষয়টিও তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং এজহারনামীয় বাকি দুই আসামিসহ ঘটনার সাথে জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে পাহাড়ি এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ভুক্তভোগী কিশোরীর যথাযথ চিকিৎসাসেবা ও ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!