Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | সাদা পোশাকে পুলিশি অভিযানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ সিএমপির

সাদা পোশাকে পুলিশি অভিযানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ সিএমপির

image_printপ্রিন্ট করুন

নিউজ ডেক্স : সাদা পোশাকে পুলিশি অভিযানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিলেন অবশেষে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (সিএমপি) মো. মাহবুবর রহমান। দীর্ঘদিন ধরে নগরীর বিভিন্ন থানার সিভিল টিমে কাজ করা ১২ জন উপ পুলিশ পরিদর্শককে (এসআই) অন্য জোনের ডিসি অফিসে সংযুক্ত করে বদলি করা হয়। সিএমপির উপ কমিশনার (সদর) আমীর জাফর এ অফিস আদেশ জারি করেন। সাদা পোশাকে ডিউটির বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে সিএমপি কমিশনার বিভিন্ন ডিসিদের নির্দেশনা দিয়েছেন।

তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, সার্বক্ষণিক সিভিল টিম পরিচালনার সুযোগ নেই। শুধু মাত্র জরুরি প্রয়োজনে সিনিয়র অফিসারদের অনুমতি নিয়ে আসামি ধরার কৌশল হিসেবে সিভিল টিম পরিচালনা করা যাবে। এছাড়া এই টিমের অপব্যবহার করে অপরাধ বা অন্যায় করলে বিধি অনুযায়ী শাস্তি অনিবার্য।

এদিকে ১২ জন এসআইয়ের অন্য জোনে বদলি প্রক্রিয়াকে নিয়মিত বদলির অংশ বলে আখ্যা দেওয়া হলেও সিএমপির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, গত ১৬ জুলাই রাতে নগরীর ডবলমুরিং থানার সিভিল টিমের সদস্য এসআই হেলালের আগ্রাবাদ মসজিদ গলিতে সোর্স নিয়ে সাদা পোশাকে অভিযানে যাওয়া, মারুফ নামে এক তরুণকে ইয়াবা ব্যবসায়ী সাজিয়ে আটকের চেষ্টা, তাকে না পেয়ে তার মা বোনকে টানা হ্যাঁচড়া করা এবং সর্বোপরি মারুফের আত্মহত্যার ঘটনাটি সিএমপির ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে নাড়া দিয়েছে। তাছাড়া এর আগেও অন্য একটি থানার একটি সিভিল টিম ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের অবহিত না করে অভিযানে গিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছিল। এ দুটি ঘটনার পর সিএমপি কমিশনার ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্ত নেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাদা পোশাকের পুলিশি হয়রানির অনেক ঘটনা রয়েছে। অনেক ঘটনায় অভিযোগ দাখিল হয় না। ফলে সেগুলো পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসে না। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যদের সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন নিয়ে সারা দেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আস্থা অনাস্থার দোলাচলে পড়ে পুলিশ-র‌্যাব। জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সুদৃঢ় হওয়ার আগেই ওই বছরেরই ৪ মে এক সপ্তাহের মাথায় পুলিশ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত পুলিশের জরুরি ক্রাইম কনফারেন্সে তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজি) হাসান মাহমুদ খন্দকার সিভিল টিমের (সাদা পোশাকের দল) কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেন। তার এই নির্দেশে কিছুদিন বন্ধও ছিল সাদা পোশাকি সিভিল টিমের সকল কার্যক্রম। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই থানার ওসিরা ওই নির্দেশের তোয়াক্কা না করেই সিভিল টিমের সদস্যদের মাঠে নামান। আবারও অভিযোগ উঠলে ২০১৬ সালে জানুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর আদেশ জারি করে যে, ‘ডিউটিরত অবস্থায় সাদা পোশাকের পুলিশের কোনো সদস্য অভিযান চালাতে পারবেন না। ডিবি, সিআইডি ও এসবির সদস্যরা অভিযানে গেলে বিধিবদ্ধ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক। ওই সময় পরিচয়পত্র দেখানোও বাধ্যতামূলক।’ কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই ওই নির্দেশ না মানার প্রবণতা শুরু হয়, এরপর থেকে সিভিল টিমের অভিযান চলছেই।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, থানা পুলিশের সিভিল টিম গঠনের বা সাদা পোশাকে অভিযান চালানোর এবং আটক করার আইনগত ভিত্তি নেই। পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে (অর্গানোগ্রাম) বা পরিচালনা কাঠামোতে (পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল) থানা পুলিশের সিভিল টিম বলতে কিছু নেই। এর পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও থানা এলাকায় নজরদারির জন্য ওসি নিজ থানার আয়তন অনুসারে সিভিল টিম গঠন করেন। কিন্তু প্রায়শ: দেখা যায়, তারা রাতের বেলায় বেশি তৎপর থাকে। তাদের বিরুদ্ধে আটকের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ অগণিত। প্রায়শই তারা বেপরোয়া আচরণ করে। থানা পুলিশের সিভিল টিমই শুধু নয়, ডিবির সদস্যদের বিরুদ্ধেও পোশাক ব্যবহার না করে অভিযান চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

কয়েকটি থানায় সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, সন্ধ্যার পরই সিভিল টিমের সদস্যরা মাইক্রোবাস ও মোটর সাইকেল নিয়ে ‘টহলে’ বের হন। পথ চলতি মানুষকে আটকে নানা ধরনের হয়রানি ছাড়াও তারা ছিনতাই, চাঁদাবাজির সঙ্গেও জড়িত। বাড়তি আয় করতে সিভিল টিমের সদস্যরা লোক ধরা-ছাড়ার বাণিজ্যও করে থাকেন। থানার ওসি তার পছন্দের এসআইসহ অন্যদের নিয়ে সিভিল টিমের কার্যক্রম শুরু করেন। বহুদিন ধরেই নগরীতে সাদা পোশাকে পুলিশের অভিযানের বিরুদ্ধে জনমনে আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছিল। জনমনের সন্দেহ আর অবিশ্বাসের কারণেই বিভিন্ন স্থানে প্রকৃতভাবে সিভিল টিমের সদস্যরাও ভুয়া হিসেবে গণ্য হচ্ছেন। ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হচ্ছে। এই ভুল বোঝার কারণে জনমনে জন্ম নেওয়া ক্ষোভ কখনও কখনও অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। গত ১৬ জুলাই আগ্রাবাদ বাদামতলী এলাকায় সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পুলিশের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর বিক্ষোভ তার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত। এরপর গতকালের এই কঠোর সিদ্ধান্তে জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

সিএমপি সূত্রে জানা গেছে, আগ্রাবাদে তরুণ মারুফের আত্মহত্যার ঘটনাটির তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকার পাশাপাশি সিএমপি সদর দপ্তর থেকে বিভিন্ন জোনের উপ-কমিশনারদের কাছে বিভিন্ন থানায় সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালনকারী এসআইদের বিষয়ে তথ্য জানতে চাওয়া হয়। এরপরই সিভিল টিমের ১২ জন এসআইকে অন্য জোনে বদলির সিদ্ধান্ত আসে। এদের মধ্যে সিএমপির দক্ষিণ জোনের কোতোয়ালী থানার এসআই সজল কান্তি দাশ, তারিকুজ্জামান ও সরদঘাট থানার তন্ময় ভট্টাচার্যকে উত্তর জোনে বদলি করা হয়েছে। দক্ষিণ জোনের সদরঘাট থানার মোর্শেদ আলম ও বাকলিয়া থানার রেজোয়ানুল ইসলামকে পশ্চিম জোনে এবং একই থানার জামাল উদ্দিনকে বন্দর জোনে বদলি করা হয়েছে। এছাড়া উত্তর জোনের বায়েজিদ বোস্তামী থানার এসআই গোলাম মোহাম্মদ নাসিম, পাঁচলাইশ থানার আব্দুল মোমিন, চান্দগাঁও থানার সালাউদ্দিন খান নোমান, পশ্চিম জোনের ডবলমুরিং থানার হাসানুজ্জামান রোমেল, হালিশহর থানার পলাশ চন্দ্র ঘোষ এবং পাহাড়তলী থানার আব্দুল্লাহ আল মাসুদকে দক্ষিণ জোনে বদলি করা হয়েছে। দৈনিক আজাদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!