
মোহাম্মদ মারুফ: লোহাগাড়ায় টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় চাম্বি খালের প্রতিরক্ষা বাঁধ বিলীন হয়ে খালের গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। এতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চাম্বি রাবার ড্যাম এবং ড্যামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অবকাঠামো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বন্যার প্রবল স্রোতে খালের মূল চ্যানেল ছেড়ে পানি নতুন পথে প্রবাহিত হওয়ায় আগের চ্যানেলে পানির প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে রাবার ড্যামের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা বাঁধ, সংযোগ সড়ক, তীর সংরক্ষণকাজসহ প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনাও হুমকির মুখে পড়েছে।
জানা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সারাদেশে পুকুর, খাল উন্নয়ন শীর্ষক প্রকেল্পর আওতায় চাম্বি খাল উন্নয়ন এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করে। ৫৭ লাখ ৪২ হাজার ৫২৭ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের কাজের দায়িত্ব পায় মেসার্স হক এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালের ৩ জুলাই চুক্তির স্বাক্ষরের পর ১৫ জুলাই কাজ শুরু হয়ে ২০২৬ সালের ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি শেষ হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।

স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, আগে যে পথ দিয়ে চাম্বি খালের পানি প্রবাহিত হতো, বন্যার পর সেই প্রবাহের ধারা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। নতুন গতিপথে তীব্র স্রোত বইতে থাকায় মূল খালের কিছু অংশে নাব্যতা কমে গেছে। অন্যদিকে নতুন চ্যানেলে শুরু হয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। এতে শুধু রাবার ড্যামের কার্যকারিতাই নয়, আশপাশের কৃষিজমি, বসতভিটা, গ্রামীণ সড়ক এবং বিভিন্ন স্থাপনাও ঝুঁকিতে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সম্প্রতি খাল উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সংস্কার করা প্রতিরক্ষা বাঁধ এক বর্ষার বন্যাতেই বিলীন হয়ে গেছে। ফলে প্রকল্পের নির্মাণমান নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, নিরপেক্ষ কারিগরি তদন্তের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির কারণ নির্ণয় এবং দায়-দায়িত্ব নিরূপণ করা হোক।
গত সোমবার উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পানত্রিশা এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বন্যার প্রবল স্রোতে প্রতিরক্ষা বাঁধ বিলীন হয়ে খালে নতুন প্রবাহপথ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে পানি সেই নতুন পথ দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে আগের মূল চ্যানেলে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন প্রবাহপথে তীব্র ভাঙনও দেখা দিয়েছে। এতে রাবার ড্যাম, প্রতিরক্ষা অবকাঠামো ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পের স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মুহাম্মদ রেজাউল বাহার রাজা জানান, প্রতিবছর বর্ষায় খালে পানি বাড়লেও এবার পাহাড়ি ঢলের তীব্রতা ছিল অনেক বেশি। মুহুর্তের মধ্যেই খালের চেহারা পাল্টে যায়। পানি কমার পর দেখা যায় আগের প্রবাহপথ ছেড়ে নতুন চ্যানেল তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এটি আরো বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
চাম্বি খাল ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সভাপতি মাহাবুবর রহমান জানান, সম্প্রতি বন্যার প্রবল স্রোতে রাবার ড্যামের উজানে চাম্বি খালের গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। এতে রাবার ড্যাম ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্প মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দ্রুত খালের মূল প্রবাহ পুনরুদ্ধার, ভাঙনরোধ ও প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ শুরু না হলে আবারো টানা বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। এ ব্যাপারে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
প্রকল্পের ঠিকাদার মো. আলমগীর জানান, এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হয়েছে। নির্মাণকাজে কোনো ধরণের ত্রুটি বা গাফিলতি ছিল না। সম্প্রতি বন্যার পানির তীব্র স্রোতে বাঁধের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকল্পের ওয়ারেন্টি শর্ত ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
লোহাগাড়া উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) কাজী ফাহাদ বিন মাহমুদ জানান, বন্যার পানির প্রবল স্রোতে চাম্বি খালের গতিপথ পরিবর্তনের বিষয়টি অবগত হয়েছি। ইতোমধ্যে বিষয়টি ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি খালের বাঁধ সংস্কার কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো ধরণের গাফিলতি বা ত্রুটি ছিল কিনা তা তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তে অনিয়ম বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
Lohagaranews24 Your Trusted News Partner