
আবু বকর মুহাম্মদ হানযালা: পবিত্র মেরাজ শরীফ বিশ্ব ইতিহাসের অত্যাশ্চর্য ও এক বিস্ময়কর ঘটনা। মহানবি (সাঃ)-এর মেরাজ হলো প্রকৃত বন্ধত্বের নিদর্শনস্বরূপ আশ্বস্তকরণের এক দীপ্ত নমুনা। মেরাজ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের সুরা বনি ইসরাঈলের প্রথম আয়াতে বর্ণিত হয়েছে- “পবিত্রতম ও সকল দুর্বলতামুক্ত সেই মহিমাময় সত্তা, যিনি স্বীয় বান্দাকে রজনীযোগে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদুল হারাম হতে মসজিদুল আকসায়।” পবিত্র মেরাজ শরীফ বিষয়ে বহু সাহাবির বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়।
সংক্ষেপে বলতে পারি, রজব মাসের ২৬ তারিখ রাতে মহানবি (সাঃ) কাবা শরিফের নিকটে বা উম্মে হানী (রাঃ)-এর ঘরে অবস্থান করছিলেন। এ সময় হজরত জিব্রাঈল (আঃ)সহ ফেরেশতারা এসে নবিজিকে জাগ্রত করেন এবং তাঁর বক্ষ বিদারণ করে ঈমান ও হেকমতে পরিপূর্ণ করেন। এরপর ‘বোরাক’ নামের বাহনে চড়ে তিনি আসমানসমূহ অতিক্রম করেন। প্রথম আসমানে হজরত আদম (আঃ) এবং পরবর্তী আসমানগুলোতে বিভিন্ন নবির সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। সপ্তম আসমানে তিনি বায়তুল মামুর ও সিদরাতুল মুনতাহা দেখেন। সেখানে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে উম্মতের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়।অল্প সময়ের মধ্যেই এই মহা সফর শেষ করে নবিজি (সাঃ) ফিরে আসেন। আধুনিক বিজ্ঞানের ভূমিকায়, বিজ্ঞান ‘মিরাজ’কে সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করতে পারে না, কারণ এটি একটি অলৌকিক ঘটনা। মহান আল্লাহ তা’আলার কুদরতির অপার নিদর্শন। যা আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক নবীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছেন,ইসলামি পরিভাষায় যেটাকে ‘মুজিজা’-য় অভিহিত করা হয়। মূলত এরই মাধ্যমে বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসীদের হেদায়াতের নির্দেশ ঘটে।

তবে, বিজ্ঞানের কিছু ধারণা, যেমন আপেক্ষিকতা তত্ত্ব, মহাকাশ ভ্রমণ, বা সময়ের ভিন্নতা, মেরাজের মতো অতিপ্রাকৃত ঘটনাকে বুঝতে সাহায্য করতে পারে, যা চিরাচরিত বৈজ্ঞানিক ধারণার বাইরে। মেরাজের বিশ্লেষণে দুটি মতবাদের অবতারণা হয়। এক, আধ্যাত্মিক মেরাজ: এই মত অনুসারে, নবী (সাঃ) আত্মিক ভাবে ঊর্ধ্বলোকে গমন করেছিলেন।এক্ষেত্রে, জড় পদার্থের উপর প্রযোজ্য বৈজ্ঞানিক সূত্রগুলো সরাসরি প্রয়োগ করা যায় না, তাই এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অপ্রাসঙ্গিক। দুই,সশরীর মেরাজ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ: এই দৃষ্টিকোণে,নবী (সাঃ) সশরীরে মেরাজে গিয়েছিলেন এবং আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিশেষত আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ এর ব্যাখ্যা দেয়া যায়।
মিরাজের ঘটনা মূলত সময়, গতি ও বাস্তবতার সীমা অতিক্রমের প্রশ্নের সাথে যুক্ত। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে গতি বাড়লে সময়ের প্রবাহ পরিবর্তিত হয়। আলোর গতির কাছাকাছি বা তার চেয়ে ভিন্ন মাত্রার গতিতে সময় সংকুচিত বা প্রসারিত হতে পারে। ফলে স্বল্প সময়ে দীর্ঘ ভ্রমণ হওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব নয়। পবিত্র কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা’আলা বলেন- “তোমাদের যদি সাধ্য থাকে তবে তোমরা আকাশের সিমা অতিক্রম কর”
আর-রহমান ৩৪। মহান আল্লাহর ক্ষমতা, সৃষ্টির বিশালতা ও বৈচিত্র্যতা সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং বিজ্ঞান সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকার কারণে বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে মিরাজ ও বৈজ্ঞানিক সম্পর্কে সাংঘর্ষিক প্রশ্ন ও যুক্তির অবতারণা করা হয়।
Herold Leland Goodwin-এর বক্তব্য অনুযায়ী, আলোর গতি ছাড়াও মানসিক বা অ-ভৌত বাস্তবতায় গতির ধারণা ভিন্ন মাত্রায় কাজ করতে পারে। এতে বোঝা যায়, মিরাজকে কেবল বস্তুগত গতির মানদণ্ডে সীমাবদ্ধ করলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। আবার, মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিগুয়েল আসীনের গবেষণা দেখায় যে মিরাজের ধারণা ইউরোপীয় মধ্যযুগীয় চিন্তা ও সাহিত্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে, বিশেষত দান্তের Divine Comedy-তে। এটি প্রমাণ করে যে ঘটনাটি কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার বিষয়ও ছিল।
সুতরাং আধুনিক বিজ্ঞান সময়ের আপেক্ষিকতা, শক্তি ও বাস্তবতার বহুমাত্রিক ধারণা স্বীকার করে। সেই আলোকে বিচার করলে মহানবী ﷺ-এর মিরাজ কোনো বৈজ্ঞানিক অসংগতির সৃষ্টি করে না। বরং এটি এমন এক বাস্তবতা নির্দেশ করে, যা বর্তমান বিজ্ঞান ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে, কিন্তু এখনো সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি। সুতরাং, বিজ্ঞান কোনো চূড়ান্ত সত্য নয়; সময়ের সাথে তার ধারণা ও ব্যাখ্যা বদলায়।
একসময় যা অসম্ভব মনে হয়েছে, আধুনিক বিজ্ঞান আজ তা সম্ভব বলে স্বীকার করছে। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী উচ্চ গতি ও ভিন্ন মহাকর্ষে সময়ের প্রবাহ পরিবর্তিত হয়, যা পরীক্ষায় প্রমাণিত। কুরআন বহু আগেই সময়ের আপেক্ষিকতার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছে। মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল রাতের অতি অল্প সময়ে, আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থায়। বুরাকের অতিদ্রুত গতি এই সময়-সংকোচনকে বোধগম্য করে। তবে মিরাজ কোনো বৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়, এটি একটি মুজিযা। বিজ্ঞান এখানে ব্যাখ্যায় সহায়ক,কিন্তু সত্যতা যাচাইয়ের মাপকাঠি নয়। আসুন,এই পর্বে পবিত্র মেরাজ শরীফের শিক্ষা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি, আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআন মাজীদে সুরা বনী ঈসরায়েলে ২২-৩৭ নং আয়াতে পবিত্র মেরাজ শরীফের ১৪ দফা মৌলিক শিক্ষা পেশ করেছেন-
১. আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করে একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা। ২. বাবা-মার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান, সদ্ব্যবহার ও দোয়ার মনোভাব রাখা। ৩. ভুলের জন্য তওবা করা এবং আল্লাহর ক্ষমার ওপর ভরসা রাখা।৪. আত্মীয়স্বজন, মিসকিন ও মুসাফিরদের ন্যায্য অধিকার আদায় করা। ৫. অপচয় পরিহার করা; অপব্যয় শয়তানি স্বভাব। ৬. অপারগ হলেও হকদারদের সাথে নম্র ও ভদ্র আচরণ করা। ৭. ব্যয়ে সংযমী থাকা; কৃপণতা ও বেহিসাবি উভয়ই বর্জন করা। ৮. দারিদ্র্যের ভয়েও সন্তান হত্যার মতো জঘন্য কাজ থেকে বিরত থাকা। ৯. ব্যভিচারের নিকটবর্তী হওয়াও পরিহার করা। ১০. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা না করা এবং প্রতিশোধে সীমালঙ্ঘন না করা। ১১. এতিমের সম্পদ রক্ষা করা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সতর্ক থাকা। ১২. মাপ ও ওজনে পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। ১৩. যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে অনুসরণ ও মন্তব্য না করা। ১৪. অহংকার ও দম্ভ পরিহার করে বিনয়ীভাবে জীবনযাপন করা।
অতএব,মিরাজ একটি মুজিযা, আর মুজিযা স্বভাবতই সাধারণ নিয়মের ঊর্ধ্বে ও মানববুদ্ধির সীমার বাইরে। আধুনিক বিজ্ঞান এখানে কেবল যাত্রার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আংশিক ধারণা দিতে পারে, সত্যতা যাচাই করতে পারে না। মুসলিম হিসেবে বিশ্বাস করতে হয়, রাসুলুল্লাহ (সা.)সশরীরে মিরাজে গমন করে মহান আল্লাহর দিদার লাভ করেছেন এবং অতি অল্প সময়ে প্রত্যাবর্তন করেছেন। এ সত্য অস্বীকার করা ঈমানের পরিপন্থী।
শিক্ষার্থী : আরবি বিভাগ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, মোবাইল : 01829910500
Lohagaranews24 Your Trusted News Partner