Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | ইয়াবা পাচারে এক ডজন রোহিঙ্গার বসবাস চট্টগ্রামে

ইয়াবা পাচারে এক ডজন রোহিঙ্গার বসবাস চট্টগ্রামে

Untitled art 1

“রয়েছে ফ্ল্যাট, প্লট ও গাড়ি ।।

biman-ad

বেশির ভাগেরই হাতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ও পরিচয়পত্র”

নিউজ ডেক্স : মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে। এ পর্যন্ত তিন শতাধিক ‘মাদক ব্যবসায়ী’ বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। মাদকপাচার বন্ধে স্পেশাল টাস্কফোর্স গঠনসহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এরপরও মাদকপাচার বন্ধ হয়নি। প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেছেন, চাহিদা থাকায় মাদক আসছে। মাদক পাচার নির্বিঘ্ন রাখতে রোহিঙ্গা প্রভাবশালী ইয়াবা পাচারকারীরা নাম পরিচয় পাল্টে চট্টগ্রাম নগরীতে অবস্থান করছে এবং বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরব যাচ্ছে ও মিয়ানমার থেকে সৌদি আরব হয়ে নিয়ে আসছে ইয়াবার চালান।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মাদকের আগ্রাসন রোধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি স্ট্র্যাটেজিক কমিটি করা হয়েছে। ওই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাদকের বিরুদ্ধে ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরি করা হয়েছে। সেই প্ল্যান অনুযায়ী মাদকের বিরুদ্ধে কাজ চলছে। মন্ত্রণালয়ে সুরক্ষা বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধানদের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে এনফোর্সমেন্ট কমিটি। এই কমিটি মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। এছাড়া, তাৎক্ষণিক ও আকস্মিক অভিযান চালাতে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। মাদকপাচার বন্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো তাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রেখেছে। মাদকের প্রধান রুট হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারকে ঘিরেও অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ঢেলে সাজানো হচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে। তারই অংশ হিসেবে কক্সবাজারে নৌ ইউনিটসহ মাদক অধিদফতরের একটি বিশেষ জোন স্থাপনের কাজ চলছে। নতুন আইন পাস হয়েছে সংসদে। মাদকপ্রবণ এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্স। টেকনাফেও গঠন করা হয়েছে স্পেশাল টাস্কফোর্স। ইয়াবার অনুপ্রবেশ রোধে আকস্মিক অভিযান পরিচালনার জন্য টেকনাফে স্পেশাল টাস্কফোর্স নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, মাদকের সরবরাহ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এটা সম্পূর্ণ বন্ধ করা কঠিন কাজ। তবে আমাদের অপারেশনগুলো চলছে। একইসঙ্গে মানুষকে সচেতন করার কাজও চালাচ্ছি। আশা করছি, মানুষ এটা প্রতিরোধ করবে। ‘কঙবাজার জেলায় নৌ ইউনিটসহ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি বিশেষ জোন স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে। একইসঙ্গে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন, আলোচনা সভা ও সেমিনার অনুষ্ঠানের পাশাপাশি পোস্টার, লিফলেট, স্টিকার, স্যুভেনির প্রকাশ ও বিতরণের কাজও অব্যাহত আছে।

ইয়াবা পাচারের সুবিধার্থে মিয়ানমারের এক ডজন নাগরিক বাস করছেন চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে। যাদের রয়েছে বিশাল ফ্ল্যাট, প্লট ও গাড়ি। তাদের বেশির ভাগেরই হাতে রয়েছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র। এমন তথ্য এখন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের হাতে। গত ৭ নভেম্বর ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে মালয়েশিয়া পালিয়ে যাওয়ার সময় বিমানবন্দর থেকে ধরা পড়ে জুবায়ের ওরফে রিদোয়ান নামে মাদক সম্রাটদের একজন। পরে দেখা যায় এই জুবায়ের গত ৩ মে নগরীর হালিশহর শ্যামলী হাউজিং সোসাইটির একটি বাসা থেকে ১৩ লাখ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার মো. আশরাফ ও তার ভাই মো. হাসানের অন্যতম সহযোগী। তিনি পুলিশের কাছে ইয়াবা পাচার সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছেন তার সাথে গত ৩ মে দেওয়া দুই ভাইয়ের তথ্যের মিল রয়েছে বেশ। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ রাশেদ মুন্না নামে মিয়ানমারের আরো এক নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে।

চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন উপকমিশনার (বন্দর) এবং বর্তমানে কাইন্টার টেরোরিজম উইনিট চট্টগ্রামের প্রধান শহীদুল্লাহ বলেন, গ্রেপ্তার আশরাফ ও হাসানকে গ্রেপ্তারের সময় সৌদি প্রবাসী বলা হলেও তারা আসলে সৌদি প্রবাসী নন। তাদের বাড়ি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে বলে জানা গেলেও তাদের বাড়ি মূলত মিয়ানমারের মংডু এলাকায়। তারা মংডুর মৃত তৈয়ব ওরফে তায়েকের ছেলে। তিনি জানান, আশরাফ মূলত বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে কয়েকবার সৌদি আরবে আসা যাওয়া করেছে মাত্র। কারণ সৌদি আরবের জেদ্দায় রয়েছে তার চারতলা দুটি ভবন। সেখানে থাকেন তার ভাই সাব্বির। সাত ভাইয়ের মধ্যে তার আরেক ভাই মোহাম্মদ আলি মালেশিয়ায়, জোহার অস্ট্রেলিয়া থাকে। সবার ছোট হোসেন থাকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘিলাতলি গ্রামে। আশরাফ পেশায় সাগরে ট্রলার চালক। সাগরে সে মাছ ধরার কাজ করতো। ১৯৯৩ সালে তার সাথে পরিচয় হয় মিয়ানমারের শীর্ষ ইয়াবা পাচারকারী আবদুর রহিমের। এরপর হাসান, হোসেন দুই ভাইকে নিয়ে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে বসবাস শুরু করে আশরাফ। সেখানে থাকা অবস্থায় জাতীয় পরিচয়পত্র ও বাংলাদেশি পাসপোর্ট হাতে পেয়ে যায় তারা। পরে ইয়াবা পাচার করে কোটিপতি হওয়া আশরাফ ২০১১-১২ সালের দিকে চট্টগ্রামের হালিশহরে ফ্ল্যাট কিনে বসবাস শুরু করে। সেখানে থেকে হাসান-হোসেন দুই ভাইকে নিয়ে ইয়াবা পাচার শুরু করে। ইয়াবা পাচারের জন্য মূলত সৌদি আরব আসা যাওয়া করে আশরাফ। নগরীর নাসিরাবাদে তার আরো দুটি ফ্ল্যাট এবং বাকলিয়ায় তিন কাঠা জমি কিনে সেখানে নয়তলা ভবনের নকশাও পাশ করিয়ে নেয় সিডিএ থেকে। ইয়াবা পাচারকারী রহিমসহ সৌদি আরবে একসাথে হজও করে।

আশরাফের দেয়া তথ্যমতে ইয়াবা পাচারের সুবিধার্থে মিয়ানমারের মংডুর সিকদার পাড়া এলাকার আবদুর রহিম চট্টগ্রামে ফ্ল্যাট কিনেন। রেঙ্গুনে তার নিজস্ব ফ্ল্যাট রয়েছে। তার বাবার নাম আবদুল মতলব। বিয়ে করেছে ফুফাতো বোন আসমা বিবিকে। নেওয়াজ উদ্দিন (২১) ও শাবানা (১৮) নামে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। যাদের থাকার জন্য চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় প্লট কিনে তৈরি করেছেন বিশাল বাড়ি। তাদের প্রত্যেকের রয়েছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয় পত্র।

তথ্যমতে, ইয়াবা পাচারে চট্টগ্রামে বসবাস করছে রাশেদ মুন্না নামে মিয়ানমারের মংডু এলাকার আরো এক নাগরিক। যাদের কাছ থেকে জানা যায়, চট্টগ্রামে ইয়াবা পাচারের মূল হোতাদের অন্যতম আবদুর রহিমের চট্টগ্রামে বসবাসের কথা। এছাড়া ইয়াবা পাচারের জন্য মিয়ানমারের নাগরিক জুবায়ের ওরফে রিদোয়ান, আলি আকবর ওরফে পট্টিবদ, কামরুল ইসলাম সুমন, শওকত, আনোয়ার, জলিল, আহমদ শফি, রশিদ, খুলুসহ অনেকে চট্টগ্রামে বসবাস করছে। যাদের সঙ্গে আবদুর রহিমের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

শহীদুল্লাহ আরো বলেন, রহিমের কাছ থেকে ২০ লাখ ইয়াবার একটি চালান সাগরপথে চট্টগ্রামে এনেছিল জোবায়ের। ওই চালানের ইয়াবার মূল্য বাবদ ১৪ কোটি টাকা এখনো পাওনা আছে জোবায়েরের কাছে। পুলিশ রাশেদ মুন্নাকে গ্রেপ্তার করলেও জোবায়ের ওরফে রিদোয়ানকে এতদিন খুঁজছিল। অবশেষে গত ৭ নভেম্বর ধরা পড়ে সে। নগরীর বায়েজিদ মোজাফফর নগরে সাত বছর আগে সে তৈরি করেছে পাঁচতলা ভবন। এছাড়া আবদুর রহিমসহ মিয়ানমারের অন্য নাগরিককেও পুলিশ খুঁজছে। তবে তাদের হদিস মিলছে না। ধারণা করা হচ্ছে, মাদক বিরোধী অভিযানে টের পেয়ে আবদুর রহিমসহ অনেকে চট্টগ্রাম ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছে।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. কামরুজ্জামান বলেন, সড়ক কিংবা সাগরপথে যত ইয়াবা বাংলাদেশে আসছে তার সবই আসছে মিয়ানমার থেকে। মিয়ানমার থেকে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি বড় মাপের ইয়াবার চালান বাংলাদেশে পাচার করছে এমন তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। হালিশহর শ্যামলী আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার করা ১৩ লাখ ইয়াবা মিয়ানমার থেকে সাগরপথে ভাটিয়ারি হয়ে নগরীতে আনা হয়েছিল। বড় মাপের এ ইয়াবার চালান মিয়ানমার থেকে যে পাঠিয়েছে তার বাড়ি মংডুতে। চট্টগ্রামে যাদের কাছে এ ইয়াবার চালান হস্তান্তর হবার কথা ছিল তাদের বেশ কয়েকজনের নাম ঠিকানা আমরা পেয়েছি। এদের মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।

ইয়াবা ব্যবসায়ী মো. জোবায়ের প্রকাশ রেজওয়ানের নাম প্রথমে সামনে আসে নগরের হালিশহরের একটি বাড়ি থেকে ১৩ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেফতার দুই ভাইয়ের আদালতে স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর। এতদিন আড়ালে থাকলেও নাম প্রকাশ হওয়ার পর মো. রেজওয়ান গা ঢাকা দেয়। ৭ নভেম্বর তিনি মালয়েশিয়া পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। মো. রেজওয়ান প্রকাশ রেদোয়ান প্রকাশ জুবায়ের নগরের বায়েজিদ বোস্তামি থানার মোজাফফর নগর এলাকার মো. ছিদ্দিকের ছেলে। নগর গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (পশ্চিম) মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, রেজওয়ানের সঙ্গে দেশের শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী হাজী সাইফুল করিমের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। সাইফুল করিমের ব্যবসায়ীক পার্টনার বলে আমাদের কাছে স্বীকার করেছে রেজওয়ান। তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

সূত্র : দৈনিক আজাদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!