Home | সাহিত্য পাতা | শেষ স্মৃতি

শেষ স্মৃতি

220

ফিরোজা সামাদ : দেওয়ানগঞ্জ রেল স্টেশনে ট্রেন থেকে নামতেই পায়ের একটা চটি ছিঁড়ে গেলো, রানুর । কাতারে কাতারে লোক নামছে উঠছে ।  ধাক্কাধাক্কিতে আর একটু হলে পড়েই যেতো ।  কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে চটি হাতে এক কোণে এসে দাঁড়ায় । চটিটার দিকে মায়া ভরা চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মুখে সামান্য হাসি ফুটে উঠল ওর । স্মৃতি বলতে এটুকুই ছিল । তাও বুঝি অাজ চলে গেলো।

এক’শ তিরিশ টাকার দুই ফিতার এই চটিটা কেনার সময় দোকানদার ব্যবসায়ী গলায় বলেছিলো,’ দু’বছরের গ্যারান্টি, আপনি নিশ্চিন্তে নিয়ে যান । নইলে পয়সা ফেরত।’  রাজীব  হো হো করে হেসে উঠেছিলো , পকেট থেকে টাকা বের করতে করতে বলেছিল, ‘ আরে এক’শ তিরিশ টাকার চটি এক’শ তিরিশ দিন চললেই অনেক।’ নাহ এক’শ তিরিশ দিন চলেনি। রাজীবের কথা মিথ্যে প্রমান করে তিনটি বছর বহু ঝড় ঝাপটা সামলে টিকেই ছিলো চটিটা । সেলাই করাতে করাতে ওটার আর কিছু অবশিষ্ট ছিলো না। কিন্তু ; আজ হয়ত আর কোনমতেই সারানো যাবে না। তবু সাইড ব্যাগ থেকে একটা বড় সেফটিপিন বের করে চটিটা লাগানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগল রানু। ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে।। বৃষ্টির ছাট এসে লাগছে  গায়ে। সেদিকে ওর ভ্রুক্ষেপ নেই। পরম মমতায় ছিঁড়ে যাওয়া ফিতেটা জুড়ে দিতে সে কি অাপ্রাণ প্রচেষ্টা ।

‘দিদি, ও চটি আর ঠিক হবে না। এবার ফেলেই দিন ‘। গলা শুনে চমক ভাঙে রানুর । পেছনে তাকিয়ে দেখে প্লাটফর্মের সেই মুচিটা ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে ।  একটু লজ্জা পায় রানু । হাসি মুখে কোমল কন্ঠে বলে, ‘হ্যাঁ তাই করতে হবে মনে হচ্ছে’। মুচির নাম দিনেশ।

ততক্ষণে ফ্লাটফর্ম প্রায় ফাকা হয়ে গেছে। রানুর হাসি মুখ দেখে একটু অাহ্লাদে গদগদ হয়ে মুচিটা বলতে থাকে  ‘গত সপ্তাহেই তো ঠিক করে দিলাম । তখনই বলেছিলাম আর…’। ওর কথা শেষ না হতেই কাতর গলায় রানু বলে ওঠে,’ আজ আর একবার দেখুন না ! ‘

-‘না না দিদি ওটা আর ঠিক হবে না। ওতে অার কিছুই নেই । যান না পাশেই তো জুতোর দোকান অাছে, অাজ নতুন একটা নিয়ে নিন, দিদি ।’

-‘আজ এটা পরেই যাবো ভাবছিলাম । দেখুন না ভাই !  কাল ঠিক নতুন চটি কিনে নিবো ‘। এ যেনো অনেকটা কৈফিয়তের মতো বলে রানু। ছেলেটি আর কথা বাড়ায় না, হয়ত একটু অবাকই হয়। হাত বাড়িয়ে চটি জোড়া নিয়ে অভ্যস্ত হাতে পেরেক , আটা দিয়ে জুড়তে থাকে। রানুর চোখ আশায় চিকচিক করে ওঠে। মনে পড়ে যায় পুরোনো দিনের কথা । রাজীব যেদিন ওকে এই চটিটা কিনে দিয়েছিলো, তারপরের দিন সন্ধ্যেবেলা রানুর কাছে খবর অাসে গাড়ি চাপা পড়ে মারা গিয়েছে রাজীব। সাজানো সব স্বপ্ন মুহুর্তে  ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিলো । ওর মরদেহটাও চোখে দেখতে পায়নি রানু । ওর কাছে জীবন্ত রাজীব সহাস্যমুখে ঘুরে ফিরে চারিপাশে। অাজ তিনবছর একা একা জীবনের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে অাছে। স্মৃতি বলতে রাজীবের দেওয়া এই উপহার এই চটিজোড়া।। আজ তাও চলে যাবে । তাহলে ও বাঁচবে কী নিয়ে ? অানমনা হয়ে যায় ক্ষণিকেই।  মুচির ডাকে সম্বিত ফিরে পায়, এই নিন দিদি, কোনোমতে ঠিক হলো, তবে বাড়ি যেতে না যেতে আবার ছিঁড়ে না যায়।’

কৃতজ্ঞতার হাসি ফুটে উঠলো রানুর চোখে। ব্যাগ থেকে দশ টাকার একটি নোট  বাড়িয়ে দিলো ও মুচির দিকে । ছেলেটি এক মুহুর্ত কী যেনো ভাবলো,  তারপর ধীর গলায় বললো , দিদি, ভালো করে তো করতে পারলাম না , তাই অাজ টাকা লাগবে না। রানু ধরা গলায় বলে উঠলো, ‘না না, এই টাকাটা না নিলে আমার খুব খারাপ লাগবে ‘। মনে মনে অাওড়াতে থাকে ‘আপনি জানেন না কী ফিরিয়ে দিলেন অামায় !’ ভাবতে ভাবতে চোখ জলে ভরে গেলাে, রানুর।মুচি ছেলেটি অবাক চোখে তাকালো রানুর দিকে। হাত বাড়িয়ে টাকাটা নিলো আর রানু চটি জোড়া প্রায় বুকে জড়িয়ে ধরে দৌঁড়ে প্লাটফর্ম থেকে বেরিয়ে গেলো । বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি, রানু ভিজছে, আর সেই সঙ্গে ভিজছে ওর ভালোবাসা,  ওর বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল ও স্মৃতি দুপাটি ছেড়া চটি !!!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*