Home | সাহিত্য পাতা | বিস্ময়ে বিমুড়

বিস্ময়ে বিমুড়

22

শুভ্রা নীলাঞ্জন : আমরা যখন জিগাতলা বাসায় থাকি তখন আমার বাবাকে দেখাশুনা করার জন্য একজন গৃহপরিচারিকা রাখা হল । বয়স৪০/৪২ হবে।নাম মায়া। যথার্থ নামকরণ হয় নাই। কিন্তু জন্মগ্রহন করছে নজরুলের মন্ত্রে দিক্ষিত হইয়া “কারার ঐ লৌহ কবাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট” এই গান গাইতেই গাইতেই সে ভূমিষ্ঠ হইয়া পৃথিবীর আলো বাতাস দেখছে। তার কথা শুনে সবসময় আমরা টাস্কিত। সে আমার বাবার নামে আমার কাছে অভিযোগ করে শুনেন দিদি, মানুষ মাছেরে খায় দুই পীঠ ভাইজা আপনার বাবায় খায় আমারে চার পীঠ ভাইজা। শুনে আমি ভাষা হারা। একদিন আমার বাসায় যে মেয়েটা থাকে তার সাথে তুমুল ঝগড়া। একসময়য় শুনতে পাইলাম মায়া বলতেছে শুন তোর কপালে ধান রাইখ্যা গুরালি দিয়া ঘইষ্যা চাল বানাইয়া ফেলুম। আমি বাণী শুনে মুগ্ধ তার প্রতি শ্রদ্ধা বাইরা গেল। ওর তো সংসদে যাওয়ার কথা ছিল ভুলে এইখানে আইসা পড়ছে।

আমাদের যে বাড়িওয়ালী সেও কম যায় না। হিটলারও উনাকে দেখলে ভুলে সালাম দিয়া দিত। আমরা তো ভয়ে সারাক্ষণ তটস্থ। উনি দোতলায় আমি তিনতলায় । উপর থেকে কোন টুঁ শব্দ হতে পারবেনা। ডায়নিং এর চেয়ার অনেক সাবধানে সরাই একটুকু ও যেন শব্দ না হয়। সারাক্ষণ আতংক। ভয় পাইতে পাইতে আমার জীবন থেকে পাঁচ বছর আয়ু মনে হয় কমে গেছে।

আমার ছেলে অতনু দুষ্টের শিরোমণি লংকার রাজা,  চুপি চুপি চানাচুর ভাজা সে খায় না। যতরকম শব্দ আছে সে একটার পর একটা করতে থাকে। আর যখন তখন কলিং বেল। দরজা খুলে দেখা যায় নীচের বাসার মেয়েটা। ম্যাডাম বলছেন আরেকবার শব্দ হইলে উনি নিজে আসবেন। শুইনা তো অপমানে ভোঁ ভোঁ করে মাথা ঘুরতে থাকে।

আমি তো রাগে অতনু কে মারতে যাই । তখন সে আরও বিভিন্ন রকম শব্দ করে প্রবল বেগে দৌড়ায় । যাতে তারে আমি ধরতে না পারি। মার সাথে দৌড়াদৌড়ি এইটা তো তার কাছে আরও মজার খেলা। আমার দেখাদেখি পিচ্চী (বাবু)টা একটা স্কেল নিয়া একবার ভাইর পিছে একবার আমার পিছে দৌড়ায় । মনে হয় বাসায় একটা ছোটোখাটো দৌড় উৎসব হইতেছে। অতনু যখন দিশাহারা তখন সে খাটের নীচে চলে যায়। আমি নিচু হয়ে বলি বের হ আজকে তোর একদিন আমার যতদিন লাগে।

আমার উনি অফিস থেকে আসলে আমি বলি এই কড়া টাইপের মহিলার বাসায় আমি আর থাকব না। বিচার দিতে দিতে আমার জীবন পাটপাতা কইরা ফেলল। আগাম কোন খবর না দিয়া সেই কড়া টাইপের মহিলা একদিন বাসায় হাজির। দেখে তো আমার গলা শুকাইয়া গেল। আমি ভাবলাম অতনু কি আবার বল খেইলা জানালার গ্লাস ভাইঙ্গা ফেলছে নাকি? আমি ভয়ে ভয়ে বললাম কি হইছে আপা? উনি রাগতস্বরে আপনার বাবার বাসার কাজের মেয়েটা বেয়াদবের আছাড়ি। কোনসময় আদাব সালাম দেয় না। সেই সময় বেয়াদপটা ঘরে ঢুকছে।

ও বলে আমি আবার কি করলাম? বাড়িওয়ালী কি কর নাই আবার? তুমি ভাবছ আমি কিছু বুঝিনা?সবসময় আমার সাহেবের দিকে আড়চোখে তাকাইয়া তাকাইয়া যাও ।মায়ার কথা তো হরতালের ককটেলের মত যেখানে ইচ্ছা এইখানে ছুঁইরা মারে।মায়া মাথায় হাত দিয়া হায় ভগবান কি মিছা কথা গো, কি কন এইগুলি? আপনার সাহেবের মত বদসুরৎ বুইড়া বেটার দিকে একশ টাকা দিয়া হাদলেও (সাধলে) আমি ফিইরাও তাকামু না। আমি ঘটনার আকস্মিকতায় বিস্ময়ে বিমুড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*