Home | সাহিত্য পাতা | অশ্বমেধের ঘোড়া

অশ্বমেধের ঘোড়া

image_printপ্রিন্ট করুন

600

শীলা ঘটক : কি গো তুমি এখনো রেডি হওনি? তাড়াতাড়ি করো, রাস্তায় জ্যামে পড়লে তখন কিন্তু খুব মুশকিল হবে নাটকটা শুরু থেকে দেখা যাবেনা’। শাড়ি পরতে পরতে রঞ্জনা কথাগুলো বলতে থাকলো। রণজয় ল্যাপটপ বন্ধ করে ঢুকে গেলো বাথরুমে। গিরীশমঞ্চে নাটক চলছে ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’। সবাই বলছে নাটকটা নাকি খুব ভালো হয়েছে। সকালে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে রঞ্জনা তখনই বলে রেখেছে আজ নাটক দেখতে যাবে। অফিসের কাজের চাপে এসব খুব একটা দেখা হয়না রণজয়ের। আজ রবিবার সকাল সকাল কাজ সেরে নিয়েছে রঞ্জনা নাটক দেখতে যাবে বলে।

‘কি গো ? তুমি রেডি হলে?’
‘আমার বেশীক্ষণ লাগবে না’

বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি ডেকে উঠে পড়লো দুজনে।
খুব ভিড় হয়েছে হলে। সবাই বলছে নাটকটা নাকি খুব ভালো হয়েছে।
নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট সিট এ গিয়ে বসলাম। রঞ্জনা যে খুব আনন্দ পেয়েছে বুঝতে পারছি। ঘর থেকে খুব একটা বের হয়না তো, তাই একটু বের হতে পারলে খুব আনন্দ পায়।

একটু পরেই নাটক শুরু হবে আমরা সবাই অপেক্ষা করছি। হলের আলো নিভে গেল।
শুরু হোল নাটক ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’।

রঞ্জনা খুব উচ্ছসিত! কানের কাছে ফিস্‌ফিস্‌ করে বলল, ‘নাটকের নায়িকা কে’ দেখো কি সুন্দরী দেখতে! খুব নাম করেছে নাটকটা। অনেক কল পাচ্ছে এই নাটকটা। বাইরেও গেছে শুনলাম’।
‘নায়িকার নাম কি?’ মোবাইলে টাইম দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করলাম।
খুব গদগদ হয়ে বলল, ‘মোহিনী রায়’।

‘মোহিনী রায়!’ নামটা যেন বুকের মধ্যে একটা ধাক্কা দিয়ে চলে গেল।
‘তুমি আসার সময় বড় বড় ছবি গুলো দ্যাখনি? বাইরে লাগানো ছিল’।
‘আসলে এতো দেরি হয়ে গেছিল ওসব আর দেখার চেষ্টা করিনি। জানি তো ভেতরে এসে বসলেই কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখতে পাবো’।
নাটক শুরু হয়েছে।
সবাই মোবাইলের সুইচ অফ করে দিল। আমিও করে দিলাম। রঞ্জনা কে বললাম, ‘মোবাইল বন্ধ করে দাও’।
শুনে ও বলল, আমি সাইলেন্টে রেখেছি ও কিছু হবে না।।
হল কানায় কানায় পূর্ণ। মৃদু স্বরে ভেসে আসছে কবি জীবনানন্দের কবিতার ‘কুড়ি বছর পরে’ কবিতাটি।
স্টেজে নায়িকার আগমন —
এ আমি কাকে দেখছি! মোহিনী! অসাধারণ সুন্দরী ! রূপ যেন জোছনার মতো ছড়িয়ে পড়েছে সাড়া শরীরে। মঞ্চে আবৃতি করতে করতে প্রবেশ করলো……

‘আবার বছর কুড়ি পরে তাঁর সাথে দেখা হয় যদি।
আবার বছর কুড়ি পরে
হয়তো ধানের ছড়ার পাশে
কার্তিকের মাসে
তখন সন্ধ্যর কাক ঘরে ফেরে- তখন হলুদ নদী
নরম নরম হয় শর কাশ হোগলায়- মাঠের ভিতরে’।

কুড়ি বছর হয়ে গেল!
ডুবে গেলাম কুড়ি বছর আগের সেই স্মৃতির সমুদ্রে।
আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি। সালটা ১৯৮৫, সবে মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। মা বলল, ‘কয়দিন মামারবাড়ি থেকে ঘুরে আসবি চল’। আমিও সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। বহরমপুরে আমার মামার বাড়ি। বহরমপুরের কাশিমবাজার। বাস থেকে নেমে বেশ কিছুটা ভেতরদিকে যেতে হয়। আমি আর মা চলেছি । এখন ছুটি আছে, কয়দিন থাকবো ওখানে।
পৌঁছে গেলাম মামারবাড়ি।

পরের দিন মা বলল, ‘চল মাধুরীদের বাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে আসি’। কয়েকটা বাড়ির পরেই মায়ের ছোটবেলার বান্ধবীর বাড়ি। সকালবেলায় গেছি আমাদের দেখে মাধুরী মাসির সেকি উচ্ছ্বাস! মাকে বলল, ‘ সই খেয়েদেয়ে সন্ধ্যে বেলায় যাবি এখন যাওয়া চলবেনা। অনেক কথা জমে আছে সারাদিন গল্প করবো তোর সাথে’। মা ও দেখলাম খুশীতে ডগমগ হয়ে মাসীর সাথে গল্প করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো, অগত্যা বাইরের দিকে তাকিয়ে আমি বসে রইলাম। বাড়িটা বেশ বড়, চারদিকে গাছগাছালিতে ভরা। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘরের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল একটি অল্প বয়সী কিশোরী, আমার চেয়ে কিছু ছোট হবে, দরজার আড়াল থেকে আমাকে দেখছে। আমি ওর দিকে তাকাতেই হাত নেড়ে আমাকে ঘরে যাবার জন্য ডাকল। মাধুরীমাসি সেটা খেয়াল করেছিল। আমাকে বলল, ‘যা ওর সাথে গল্প কর, বাগানটা দেখে আয়। ও হোল মহিনী। আমার মেয়ে, আমি ওকে মনি বলে ডাকি’।

কি অসাধারণ দেখতে! উঠে গেলাম ওর কাছে। কম সময়ের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেল আমার আর মহিনীর মধ্যে। সারাদিনটা ওর সাথে কাটালাম। খুব ভালো লেগে গেল মেয়েটিকে।
কয়দিন পর বাড়ি ফিরে এলাম।

বাড়ি ফেরার পর থেকেই কেন জানিনা খুব অস্থির লাগতো মহিনীর জন্য। আবার মন চাইতো যাই ওর কাছে। তখনও জানতাম না প্রেম কাকে বলে সদ্য মাধ্যমিক দিয়েছি। সব মেয়ের মুখের মধ্যে ওর মুখ খুঁজে বেড়াতাম পাগলের মতো। কিছু ভালো লাগতো না।

বেশ কিছুদিন পর আবার একদিন মামারবাড়ি গেলাম, শুধু ওকে দেখার জন্য… কিন্তু নাহ পেলাম না ওর দেখা। পরেরদিনই ফিরে এলাম ।

এরপর অনেক বছর কেটে গেছে …… মহিনী ছিল আমার জীবনে প্রথম প্রেম বুঝেছিলাম যত সময় গেছে। আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে গেছে মহিনী, বিয়ে করেছি রঞ্জনাকে। কিন্তু স্মৃতির ঘেরাটোপে সে যে এখনো এতো জীবন্ত বুঝলাম সেটা নাটক দেখতে এসে। ১৯৮৫ সালে একদিন দেখা হয়েছিল তার সাথে, আর আজ ২০০৫ সাল। মাঝখান থেকে কেটে গেছে কুড়িটা বছর। কুড়ি বছর !!!
হঠাৎ পাশে বসে রঞ্জনা একটা মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, দেখো দেখো তোমার নামও রণজয় আর নাটকের নায়কের নামও রণজয়।

আমি যেন কিছুটা চমকে উঠলাম। তাইতো!

‘জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার!’
নায়ক বলে চলেছে নাটকের ডায়ালগ।
১৯৮৫ থেকে ২০০৫ সত্যিই তো কুড়ি বছর পার হয়ে গেছে নিঃসাড়ে।
নাটকে মোহিনীর নাম সূর্যতপা।
এখানেও রণজয়ের সাথে সূর্যতপার প্রেম সার্থক হোল না! কানে ভেসে আসছে নাটকের কথাগুলো, ‘কত কিছুই তো অসমাপ্ত থেকে যায়…’ রণজয় মৃত্যুপথ যাত্রী, আজ তাঁর জীবনের শেষ দিন ৪ঠা সেপ্টেম্বর…… রণজয় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে—-
কি বলল! ৪ঠা সেপ্টেম্বর! ওই দিন তো আমার জন্মদিন…… রণজয় তুমি মরতে পারো না… মনে মনে বেরিয়ে এলো কথা গুলো।

এলোমেলো ভাবে কবিতার লাইনগুলো ভেসে ভেসে আসছে……

‘সোনালি সোনালি চিল—- শিশির শিকার করে নিয়ে গেছে তারে —
কুড়ি বছরের পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে!’

‘জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার —
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার!’

হলে আলো জ্বলে উঠলো। স্ক্রিনের ঘর্ঘর আওয়াজ……

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!