Home | উন্মুক্ত পাতা | মেনিনজাইটিসের সাথে বসবাস

মেনিনজাইটিসের সাথে বসবাস

image_printপ্রিন্ট করুন

আহমেদ আল ওয়ালী রাফি : মাথাটা ঘুরছিল লাটিমের মতো। চোখগুলো ঝাপসা হয়ে আসছিলো ধীরে ধীরে। মনে হচ্ছিলো অন্ধকার নেমে আসছে আমার চারিদিকে। খবর পেয়ে আব্বু তড়িঘড়ি করে নিয়ে গেলো কেরানীহাটের একটা হাসপাতালে। ডাক্তার সব দেখেশুনে বললেন, আমার ডেঙ্গু হয়েছে। কিছু প্রয়োজনীয় ঔষধ দিয়ে ডাক্তার আমাকে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু মাথা ব্যাথা কমলো না, প্রতিদিন নিয়ম করে জ্বরও আসে। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে আমি আব্বুর সাথে ঘুমানো শুরু করি। একদিন গভীর রাতে আচানক বমি শুরু হলো। ভয়ানক বমি। এখনও মনে পড়লে গা শিরশির করে উঠে।

সেদিন রাতে আর কী হয়েছিল মনে পড়ছে না। সকালে চোখ খুলে দেখি আমি চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের এইচডিইউতে। দূরে আম্মু কাঁদছে, আব্বু ছোটাছুটি করছে। আমার ভীষণ ভয় হয়। আমি এখানে কিভাবে আসলাম এসব নিয়ে ভাবি। কিন্তু মাথা ব্যাথার জন্য ভাবতেও পারছিলাম না। এইচডিইউতে একদিন থাকার পর আমাকে ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হলো। আব্বুকে মোবাইলে বলতে শুনি আমার জন্য নাকি মেডিকেল বোর্ড বসানো হয়েছে। আশেপাশে থাকা আত্মীয়দের বিমর্ষ চেহারা এবং আব্বুর মুখে মেডিকেল বোর্ড শুনে আমার আরও ভয় হয়। আমার কী হয়েছে? আমি কী তবে সমাপনী পরীক্ষা দিতে পারবো না, আমি কী তবে আমার ছোট ভাই সাবিতের সাথে আর খেলতে পারবো না। এসব ভেবে ভেবে মাথা ব্যাথা যেন আরও বেড়ে যাচ্ছিলো। শিক্ষা অফিসার ফারুক মামা আমাকে দেখতে গিয়ে বললো, সমাপনী পরীক্ষা নাকি দুই মাসের জন্য পিছিয়ে গেছে। আমি বিশ্বাস না করায় মামা আমার হেড স্যারের সাথে কথা বলিয়ে দিলো। স্যার বলায় কিছুটা বিশ্বাস আসে। কিন্তু মাথা থেকে পরীক্ষার চিন্তা নামাতে পারি না।

হাসপাতালে টানা বারো দিন ছিলাম। প্রতিটা সময়, প্রতিটা সেকেন্ড, প্রতিটা দিন মনে হয়েছিল আমি যেন জেলে ছিলাম, বন্দী ছিলাম। জেল দেখতে কেমন তো জানি না, এক জায়গায় আটকে ছিলাম বলেই হাসপাতালকে আমার জেল মনে হয়েছে। হাসপাতালে থাকতেই জানতে পারি আমার মেনিনজাইটিস হয়েছে। আম্মুকে মোবাইলে বলতে শুনি, এটা আবার কেমন রোগ?

বাসায় এসে দুইদিন পর স্কুলে যাই। আমাকে দেখে আমার বন্ধুরা সবাই এগিয়ে আসে। কেউ কেউ বলে, আমি নাকি জীবন্ত কঙ্কাল হয়ে গেছি, আবার কেউ কেউ বলে, মেনিনজাইটিস কোন রোগের নাম হয় নাকি? আমাকে দেখে সাবেরা ম্যাডাম জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং বললেন, তোমার জন্য অনেক দোয়া করেছি বাবা।

এরপর তো সমাপনী পরীক্ষা চলে আসে। প্রতিদিন মাথা ব্যাথা নিয়ে পরীক্ষাগুলোতে অংশ নিই। জিপিএ ফাইভ পাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে পড়া শুরু করেছিলাম। শেষে রোগটা হয়ে ভয় ধরিয়ে দিছিল। রেজাল্টের দিন স্কুলে গিয়ে জানতে পারি জিপিএ ফাইভ পেয়েছি। স্যারদের দোয়া ছিলো বলে আমি এই রেজাল্ট করতে পেরেছি। এরপর দঃ সাতকানিয়া গোলামবারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিই এবং মেধাতালিকায় ২৫ তম হই।

এখনও মাঝেমাঝে আমার মাথাব্যথা হয়। রোদ দেখলে ভয় লাগে। অনেক মানুষের ভিড় দেখলেও ভয় লাগে। পড়ালেখা শেষ করে মেনিনজাইটিস নিয়ে গবেষণা করবো। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। লেখক : ষষ্ঠ শ্রেণি, রোল নম্বর- ২৫, দক্ষিণ সাতকানিয়া গোলামবারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!