Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | মামিকে বেশি করে খাবার দিতে বলতেন জিন্নাত

মামিকে বেশি করে খাবার দিতে বলতেন জিন্নাত

image_printপ্রিন্ট করুন

নিউজ ডেক্স : ‘দেশের দীর্ঘকায় তরুণ জিন্নাত আলীর পরিবার আমাদের প্রতিবেশী। সম্পর্কে আমি জিন্নাতের মামি হই। গ্রাম-শহরে আমাদের ভাগা-ভাগি বসবাস হলেও স্নেহ করতাম বলেই শিশুকাল থেকেই জিন্নাত আমার ভক্ত। ক্ষুধা পেলেই বাসায় ঢুকে বলতো মামি বেশি করে খাবার দেন। দুই ঈদে এটি বেশি হতো। কোনো সময় শহরে এলেও গ্রামের বাড়ির মতো এখানকার (কক্সবাজার শহরে) বাসাতেও একইভাবে আচরণ ছিল তার। এইতো করোনা পরিস্থিতির আগেও কক্সবাজারের বাসায় এসে বেড়িয়ে গেছে জিন্নাত। কিন্তু সেটাই যে তার শেষ আসা ছিল তা কল্পনা করতেও কষ্ট হচ্ছে।’

দেশের সবচেয়ে লম্বা মানব কক্সবাজারের রামুর গর্জনিয়া বড়বিল এলাকার বাসিন্দা সদ্য প্রয়াত জিন্নাত আলী সম্পর্কে তার প্রতিবেশী চেয়ারম্যান বাড়ির পুত্রবধূ আঁখি চৌধুরী স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এসব কথা বলেন।

করোনা সংকটে যখন দেশে এক ধরণের অচলাবস্থা বিরাজ করছে ঠিক সেই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন দেশের সবচেয়ে লম্বা মানুষ অজপাড়া গর্জনিয়ার জিন্নাত আলী। কক্সবাজার সদর হাসপাতাল থেকে তাকে রোববার (২৬ এপ্রিল) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিউরোলজি বিভাগে নেয়া হয়। তার মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ায় সংকটাপন্ন অবস্থায় তাকে অস্ত্রোপচারের জন্য চমেক হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়েছিল সোমবার। অস্ত্রোপচার পর্যন্ত অপেক্ষা না করে শেষ রাতে পরপারের ডাকে সাড়া দেন দীর্ঘকায় তরুণ জিন্নাত। সেহেরির সময় সবাই জাগ্রত হলে খবরটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে যান জিন্নাতকে সন্তানের মতো দেখা আঁখি চৌধুরীও।

তিনি বলেন, রান্না বসিয়ে (কক্সবাজারের বাসায়) তাহাজ্জুদ পড়তে যাচ্ছিলাম এমন সময় জিন্নাতের মারা যাওয়ার খবরটি পেয়ে আর হাত-পা চলছিল না। পুসর্বশেষ বাসার যে সোফায় এবং খাটে সে বসেছিল তা দেখছিলাম আর তার উপস্থিতি অনুভব করছিলাম। কখন যে চোখ বেয়ে পানি চলে এসেছে বুঝতে পারিনি। আমার স্বামীরও ছিল একই অবস্থা। কোনো মতে সেহেরি সারলেও লকডাউনের কারণে গ্রামে যেতে পারিনি। সারাদিন যোগাযোগ রেখে দাফন পর্যন্ত খবর নিয়েছি। দীর্ঘ দেহের জিন্নাতের জন্য ১০ ফুট লম্বা কবরের ছবি ফেসবুকে দেখেছি আর কেঁদেছি। মঙ্গলবার সারাদিন, সারারাত একইভাবে অস্থিতরতায় কেটেছে।

শুধু আঁখি চৌধুরী নন, জিন্নাতের সঙ্গে সময় কাটানো রামু সীমান্তের বাইশারী (নাইক্যংছড়ি) পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সাবেক ইনচার্জ উপ- পরিদর্শক আবু মুছা, কলাতলীর সোহেল ইমরান, ঈদগাঁওর প্রবাসী মিজানুর রহমান, ইউপি সচিব নুরুল কাদের, বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক কবিরুল আলমসহ নানা পেশার লোকজন জিন্নাত আলীর সঙ্গে নিজের তোলা কিংবা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জিন্নাতের তোলা ছবি নিজ ফেসবুক ওয়ালে দিয়ে তার জন্য মাগফেরাত কামনা করেছেন। ব্যক্ত করেছেন নিজের বেদনা ভরা মনের অনুভূতি।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরের দিকে জিন্নাত আলীর মরদেহ রামুতে এসে পৌঁছায়। বিকেল ৩টায় রামু গর্জনিয়ার থোয়াইংগাকাটা বড় কবরস্থান মাঠে জানাজা শেষে ওই কবরস্থানেই তাকে দাফন করা হয়। সবার আগ্রহ থাকলেও করোনার কারণে গর্জনিয়াতে বাইরের কাউকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারির কারণে জানাজায় যোগ দিতে পারেননি ইউনিয়নের বেশি মানুষও।

মসজিদে থাকা সামাজিক খাটিয়ায় দেহ সংকুলান না হওয়ায় বড়বিল নিজ বাড়িতে তৈরি বাঁশের খাটিয়াতেই তাকে জানাজার মাঠে আনা হয়। কক্সবাজার সদর-রামু আসনের সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমলসহ স্থানীয় সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যান এবং স্বজনরা তার খাটিয়া কাঁধে দীর্ঘপথ হাঁটেন। জানাজায় রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণয় চাকমা, রামু থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়েরসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা অংশ নেন।

১৯৯৬ সালে জন্মগ্রহণ করা জিন্নাত আলী গর্জনিয়ার বড়বিল গ্রামের বর্গা চাষি আমীর হামজার ছেলে। এক মেয়ে, তিন ছেলের মাঝে জিন্নাত তৃতীয়। অন্য সবার মতো স্বাভাবিক ছিল জিন্নাতের গড়ন। কিন্তু বয়স যখন ১১ বছর সে সময় থেকেই দ্রুত উচ্চতা বাড়তে থাকে তার। প্রতি বছর ২ থেকে ৩ ইঞ্চি করে আকৃতি বাড়তে থাকে তার। আর পরবর্তী ১০ বছরে প্রায় ৪ ফুট উচ্চতা বেড়ে মৃত্যুর আগপর্যন্ত অর্থাৎ ২১ বছর বয়সে ৮ ফুট ৬ ইঞ্চির দীর্ঘ মানব হিসেবে ‘রেকর্ড’ ছিল জিন্নাতের।

দেশের সবচেয়ে লম্বা মানুষ (৮ ফুট ৬ ইঞ্চির) জিন্নাত আলী ২০১৮ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। এরপরই দেশব্যাপী তাকে নিয়ে হইচই পড়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেসময় জিন্নাত আলীকে চিকিৎসার জন্য রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। তখন চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, জিন্নাতের মস্তিষ্কে টিউমার রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়াও হরমোন সমস্যার কারণে তার উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অবশেষে মাথায় টিউমার নিয়েই পৃথিবী ছাড়লেন জিন্নাত আলী। জাগোনিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!