Home | ব্রেকিং নিউজ | টংকাবতী বনে ৭ টংঘর, বন্যহাতির করিডোরে মানবসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা

টংকাবতী বনে ৭ টংঘর, বন্যহাতির করিডোরে মানবসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা

মোহাম্মদ মারুফ: বনাঞ্চলজুড়ে বন্যহাতির নিরাপদ বিচরণ এবং চলাচল নিশ্চিত করতে সরকার ও বনবিভাগ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও লোহাগাড়ায় পদুয়া বন রেঞ্জের আওতাধীন টংকাবতী বিট এলাকায় উল্টো চিত্র দেখা গেছে। বনজ সম্পদ নষ্ট করে বনের গাছের উপর আধা কিলোমিটারের মধ্যে ৭টি স্থানে টংঘর নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষ–হাতি সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টংকাবতী বনবিট চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের অধীন পদুয়া বন রেঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল। লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ও পুটিবিলা ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত এই বনবিটটি বন্যহাতির বিচরণ ও চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হিসেবে পরিচিত। এই বিটের উপর দিয়ে বয়ে গেছে টংকাবতী নদী। টংকাবতী বিটটি পার্বত্য এলাকা হয়ে মিয়ানমার সীমান্তমুখী পাহাড়ি বনভূমির অংশ। যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বন্যহাতির চলাচলের একাধিক করিডোর রয়েছে। টংকাবতী বনবিট কার্যালয়ের সামনে বয়ে যাওয়া টংকাবতী নদীর পাড় ঘেঁষে প্রায় আধা কিলোমিটার অংশের মধ্যে ৭টি স্থানে বন্যহাতির করিডোরে গাছের উপর টংঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এতে বন্যহাতি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে উত্তেজিত হয়ে বন্যহাতি লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। বনের গাছ কেটে টংঘর নির্মাণ শুধু করিডোরের জন্যই নয়, বনজ পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। এতে বনভূমির প্রাকৃতিক কাঠামো নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বনাঞ্চলে মানুষের অবাধ যাতায়াত ও অবস্থান বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় অনেকে জানান, টংকাবতী বনবিটের জায়গায় চাষাবাদ করা ফসল রক্ষা করতে বনের গাছ কেটে বন্যহাতির করিডোরে স্থানীয় কৃষক নুরু, মালেক, কাদের, মঞ্জুর, তৈয়ব আলী, আবদুল মজিদ ও সেলিম উদ্দিন এসব টংঘর নির্মাণ করেছেন। এসব করিডোর দিয়ে বন্যহাতি চলাচল থেকে বিরত রাখতে টংঘর থেকে তাদেরকে বিভিন্নভাবে বিরক্ত ও বাধা প্রদান করা হয়। টংকাবতী এলাকা দীর্ঘদিন থেকে বন্যহাতির চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হিসেবে পরিচিত। খাবার ও পানির সন্ধানে হাতির পাল নিয়মিত এসব পথ ব্যবহার করে এক বনাঞ্চল থেকে অন্য বনাঞ্চলে যাতায়াত করে। কিন্তু করিডোরের বিভিন্ন স্থানে টংঘর নির্মাণ ও মানুষের উপস্থিতি বাড়ার কারণে হাতিরা বাধার মুখে পড়ছে। এতে তাদের স্বাভাবিক আচরণে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। আগে রাতের বেলায় হাতির পাল নির্দিষ্ট পথ ধরে চলাচল করলেও বর্তমানে অনেক সময় পথ পরিবর্তন করতে দেখা যায়। ফলে হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এতে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি, বসতঘরে হামলা, মানুষ ও হাতির মুখোমুখি সংঘাতের আশংকা তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় বন বিভাগকে ম্যানেজ করে এসব টংঘর নির্মাণ করা হয়েছে। তারা দ্রুত অবৈধ স্থাপনা অপসারণ, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনরুদ্ধার ও হাতির করিডোরকে দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।

গত ৪ জুন বিকালে সরেজমিনে দেখা যায়, টংকাবতী বিট কার্যালয়ের সামনেই টংকাবতী নদীর বুকে গড়ে উঠা বিশাল একটি চর রয়েছে। যা স্থানীয়ভাবে ‘ভরারচর’ নামে পরিচিত। নদী পার হয়ে পাড়ঘেষা প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বন্যহাতির চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ করিডোরে গাছের ডালপালা কেটে গাছের উপর একাধিক টংঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি টংঘর বিট কার্যালয় থেকে খালি চোখেই স্পষ্ট দেখা যায়। টংঘরগুলোর নিচের ঝোপঝাড় ও প্রাকৃতিক উদ্ভ্ভিদ কেটে পরিষ্কার করা হয়েছে। কয়েকটি স্থানে চাষাবাদের প্রস্তুতির আলামতও পাওয়া গেছে। টংঘরগুলোতে মানুষের নিয়মিত যাতায়াত লক্ষ্য করা গেছে। যা এলাকাটিতে মানব উপস্থিতি বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, যেখানে টংঘর নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্যহাতির চলাচলের স্বীকৃত করিডোর হিসেবে পরিচিত। এসব করিডোর ব্যবহার করে হাতির পাল এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াত করে। কিন্তু করিডোরের উপরে গাছে টংঘর নির্মাণ ও মানুষের অবাধ বিচরণ বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। বনবিভাগের বিট কার্যালয়ের এত কাছাকাছি স্থানে টংঘর নির্মাণ ও করিডোরের পরিবেশ পরিবর্তনের ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যেও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাদের মতে, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দৃষ্টিসীমার মধ্যেই বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথে এই ধরণের স্থাপনা গড়ে উঠা রহস্যজনক।

পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা মতে, হাতির করিডোর দখল বা সেখানে স্থাপনা নির্মাণ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নীতিমালার পরিপন্থী। হাতি একটি বৃহৎ স্তন্যপায়ী প্রাণী, যার নিরাপদ চলাচলের জন্য নিরবচ্ছিন্ন করিডোর প্রয়োজন। করিডোরে বাধা সৃষ্টি হলে তারা বিকল্প পথ খোঁজে। যা প্রায়ই জনবসতিপূর্ণ এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। এর ফলেই মানুষ–হাতি সংঘাত বাড়ে। তাই তাদের চলাচলের পথ সুরক্ষিত রাখা ও করিডোরগুলোকে দখলমুক্ত রাখা এখন সময়ের দাবি। টংকাবতীতে গড়ে উঠা এসব টংঘর অপসারণ ও বনভূমির ক্ষতি রোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও প্রকট হতে পারে।

টংকাবতী বনবিটের বিট কর্মকর্তা ইমন বিল্লাহ জানান, বন্যহাতি যাতে লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারে তারজন্য টংঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের সাথে মাঝে মধ্যে বনবিভাগের লোকজনও সেখানে অবস্থান করেন। তবে টংঘর নির্মাণের জায়গাগুলো বনবিভাগের না বলে দাবি করেছেন তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হাতি বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আবদুল আজিজ জানান, বন্যহাতির চলাচলের পথে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না। হাতির করিডোরে স্থাপনা নির্মাণ বা মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি তাদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত করে। চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি হলে হাতি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে। যার ফলে মানুষ–হাতি সংঘাত বৃদ্ধি পাবে। তাই হাতির করিডোরগুলোকে সম্পূর্ণ প্রতিবন্ধকমুক্ত রাখা জরুরি। এছাড়া টংকাবতী এলাকার হাতির করিডোরে টংঘর নির্মাণের বিষয়টি বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। করিডোরের স্বাভাবিক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!