Home | সাহিত্য পাতা | শুভ্রতার সুখ-দুঃখ (১৫ তম পর্ব)

শুভ্রতার সুখ-দুঃখ (১৫ তম পর্ব)

image_printপ্রিন্ট করুন

379

ফিরোজা সামাদ : অাজকে অার ওর কাছে গেলামনা। অারিফ বিশ্রাম নিয়ে বাচ্চাদের কাছে নিয়ে একটু অাদর করে হসপিটালে চলে যায়। রাতে ফিরে অাসে। টেবিলে রাতের খাবার ঢেকে রেখে অামি দুই ছেলের মাঝখানে শুয়ে পড়ি। লক্ষ্য করলাম অারিফ খেয়ে সোজা ওর স্ট্যাডি রুমে চলে গেলো । চাবীটা অামি কেবিনেটের একটি ড্রয়ারে রেখেছিলাম, অাশ্চর্য ! অারিফ সরাসরি ড্রয়ার খুলে চাবী বের করে কেবিনেট খুলে অাবার অামার রুমে চলে অাসে, অামাকে বললো..

…. স্ট্যাডি রুমে অাসবে একবার ?

অামি কোনো কথা না বলেই অাস্তে করে অারিফের পিছনে পিছনে স্ট্যাডি রুমে গিয়ে দাড়ালাম। অারিফ সোজা সাপটা প্রশ্ন করলো অামায়….

…. তুমি কি অামার কেবিনেট খুলেছো ?

অামি নির্লিপ্ততা নিয়ে সরাসরি তাকালাম অারিফের মুখের দিকে। অারিফ চোখ না সরিয়ে ঐ একই প্রশ্ন ছুড়ে মারলো অামার পানে । অামি অত্যন্ত কঠিন ও দৃঢ়তার সাথে বললাম…..

…. কী বললে তুমি খুশি হবে বলো ?

…. অামি হ্যাঁ কি না জানতে চেয়েছি,
ব্যাশ!

…. অামি এ বিষয়ে কিছুই বলতে চাইনা,
বলতে ইচ্ছে করছেনা। তুমি যা
বোঝার বুঝে নিতে পারো। অামি মনে
করি এই ঘরের সর্বোত্র যাওয়ার এবং
দেখার অামার একচ্ছত্র অধিকার
অাছে । তোমার অামার মধ্যে কী এমন
গোপনীয়তা, যা অামি জানতে পারবো
না ?

কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে অারিফের দিকে তাকাতেই ও চোখ সরিয়ে নিলো। অামি এই প্রথম ও শেষবারের মতো ওর সাথে জোড়ে কথা বললাম। অারিফ কিছুটা অবাক হলো হয়তো। অার কিছু না বলে অামি অাবার ছেলেদের পাশে চলে এলাম। অারিফ অার কোনো কথা না বলে কেবিনেট বন্ধ করে ওর বিছানায় শুয়ে পড়লো। অামি চুপ করে শুয়ে অাছি। চোখ দু’টো কেমন জেনো জ্বালা করছে। কাঁদতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু কান্নারা কোথায় যেনো পালিয়ে গেছে। বুকের মাঝে কষ্টেরা অাটকে অাছে। সড়াতে পারছিনা। উঠে পানি পান করলাম। কিছু হচ্ছেনা। অারিফ কি ঘুমিয়েছে ? কি হচ্ছে এসব অামার সাথে ? কোথায় যাবো ? ছেলে দু’টোর কী হবে ? ভাবনারা এলোমেলো বিচরণ করছে। অাবার ভাবছি, খুব দ্রুত ভাবছি হয়তো ওর অন্যরকম কোনো ঘটনা ছিলো, এখন নেই। যাক সে রকম কিছু হলে মিটমাট করে নেবো। নিয়তি, ভাগ্য বলেও তো একটা কথা অাছে। কি ভাবছি নিজেই বুঝিনা। নিজেকে নিজেই শান্তনা দিচ্ছি। এরই নাম বোধ হয় অাত্মপ্রবঞ্চনা। এলোমেলো ভাবতে ভাবতে রাত কখন দ্বিতীয় প্রহর পাড় হয়ে তৃতীয় প্রহরের শেষ প্রান্তে এসে গেছে বুঝতে পারছিলামনা। হঠাৎ খুট করে দরজা খোলার শব্দে ফিরে তাকালাম,দেখি অারিফ দাড়িয়ে। মুহুর্তে নিজেকে অপরাধী মনে হলো। ভাবলাম সত্যি ওর গোপনীয় অতীত দেখা অামার ঠিক হয়নি। ওকে ক্ষমা করতে খুউব ইচ্ছে হলো। জিজ্ঞেস করলাম….

…. পানি দেবো, খাবে ?

…. না, অামি তোমার সাথে কথা বলতে চাই।

…. থাকনা, পরে বলো! অাসলে অামারই
ভুল হয়েছে। তোমার অতীত কিছু
থাকতেই পারে, যা অামার খুচিয়ে
দেখা উচিত হয়নি।

অামার কথায় অারিফ একটু অবাক হলো। অামাকে ওর অসহায় দুর্বল মনে করে হঠাৎ কোমল স্বরে বললো……

…. না শুভ্র এটা অামার অতীত নয়,
তোমাকে অারো অাগেই অামার বলা
উচিত ছিলো। বলিনি,যদি তুমি
অামায় ছেড়ে যাও এই ভয়ে। প্রকৃত
অর্থে অামি তোমাকেও ভালোবেসে ফেলেছি

অারিফের কথার ছন্দে কেমন যেনো অাবার অন্য একটা অাতঙ্ক অামার মনে বসতি গড়ে। কী বলবে অারিফ ? অামাকেও ভালোবাসে,তার মানে কী? অাবারো কোনো অনিশ্চয়তা ? অাগুনে যার ঘর পুড়ে যায় গোধুলি রঙকেও অাগুন মনে হয়। অারিফের শান্ত কথাও অামার কাছে দুর্ভেদ্য মনে হতে থাকে। এক সময় অারিফ অামার একটি হাত অাকড়ে ধরে বলে ফেলে…..

…. তুমি যেমন অামার অতীত,বর্তমান
ভবিষ্যত ? তেমনটিই ঐ ছবিগুলোও
অামার জীবনে জড়িয়ে অাছে দেশের বাড়ীতে।

অামি কিছু শুনছিলাম কিনা জানিনা । মনে হয়েছিলো ভুমিকম্প, তারপর সকাল সাতটায় অাবিস্কার করলাম নিজেকে অারিফের হসপিটালের বেডে। বাঙালি নার্স স্যুপের বাটি ও চামচ হাতে দাড়িয়ে, হাসিমুখে অামার কুশল জানতে চেয়ে চামচ দিয়ে অামার মুখে স্যুপ দিতে চাইলো। অামি ইশারায় না করলাম। রাতের কথাগুলো মনে পড়তে লাগলো। কিছুক্ষণ পরে অারিফ এলে, অামি বাসায় ফিরতে চাইলাম। অারো ঘন্টা খানিক পর অামার ছেলেদের নিয়ে এলো। ছেলেরা অামার কাছে এসে অামাকে অাদর করতেই অাবার কোথা থেকে শ্রাবণের ধারার মতো অামার দু’চোখে নিরব অশ্রুধারা বয়ে চললো। কিছুতেই থামাতে পারছিলাম না। বেবী দু’টো মুখের দিকে তাকিয়ে অামার চোখ মুছিয়ে দিচ্ছে । এগারোটার সময় অামি চুপচাপ বাসায় স্বাভাবিক ভাবেই চলে এলাম। ওরা বলেছিলো…..

…. ম্যাডাম হুইল চেয়ারে উঠুন, অাপনি দুর্বল

কিন্তু অামি অাস্তে করে হেঁটেই চলে এলাম। বাসা হাঁটা পথেই। বাসায় অাসতেই অারিফ ধাবা থেকে দুপুরের খাবার পাঠিয়ে দিলো। অারিফ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট । বেশ কয়েকদিন কেটে গেলো । অারিফ অামায় খুব একটা কাছে ডাকেনা। অামিও প্রয়োজন না হলে কিছু বলছিনা। অামাদের মধ্য কোনোদিও ঝগড়া হয়নি। এমনকি কথা কাটাকাটিও। অামি যেমন এসব পছন্দ করিনা। অারিফও বেশ ভদ্রলোক গোছের। চলছে দিন যাচ্ছে সময় তার গতিতে।

মাসখানেক পর অারিফ বললো….ওদের বাংলাদেশ থেকে এখানে নিয়ে অাসতে চাই, ওদের অবশ্য এখানে রাখবো না। অন্য জায়গায় বাড়ি ভাড়া নিবো। তোমাদের কোনো অসুবিধা হবেনা।

কথাগুলো অনায়াসে বললো অারিফ, যেনো এসবকিছু স্বাভাবিক। কোনো অপরাধবোধ বা অামার সাথে ওর অাগের স্ত্রীর সাথে যা হয়েছে তারজন্য কোনো রকম অনুশোচনা বোধ নেই। অারিফকে অাদিম যুগের সামন্তবাদীদের উত্তরসূরী মনে হলো। নারী শুধু ভোগের বস্তু। নারীকে করুনা করা যায়,ভালোবাসা যায় না। অারব অামিরাতে সাধারনত বহুবিবাহ প্রচলিত। অারিফ মনেপ্রাণে এই প্রচলনটাকে অাকড়ে ধরেছে বুঝতে পারলাম। এভাবে কতোদিন বেঁচে থাকা যায় ? চারিদিকে মনের চোখ দিয়ে তাকালাম, কোথাও কোনো অভয়ের জায়গা খুঁজে পেলাম না। বারে বারে শুধু মায়ের মুখটা মনে পড়ছিলো। কতোদিন দেখিনা মায়ের মুখ ! ডাঃঅাজাদ ও ভাবী অামার অসুস্হতা দেখতে অাসলে অামি হাসি মুখেই তাদের বসালাম। অাপ্যায়নে ব্যস্ত হলাম। ওরা অামার মুখ দেখে অবাক!…

…. ভাবি অাপনি এতোটা অসুস্থতা বুঝতে পারিনি তো।

…. না তেমন না। শরীরটা খুব ক্লান্ত লাগছে।

…. অাচ্ছা ভাবী অারিফ ভাই এখান
থেকে দূরে কেনো বাড়ী ভাড়া নিলো?
এখানে অসুবিধা কি ? এই বাড়ি তো
প্রাইভেট বাড়ির থেকে অনেক
ভালো। তাছাড়া এতো বছর
নিজেদের মতো করে সাজিয়েছেন,
কেনো চলে যাবেন ?

…. ওটা অামাদের জন্য নয়,ভাবি। অন্য
কারোর জন্য নেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে
কারোর একটি পরিবার অাসবে।
তাই ভাড়ার দায়িত্বটা অারিফের।

অাজাদ ভাই ভাবি চলে যাওয়ার পর অামি অামার কেবিনেট খুলে পাসপোর্ট বের করলাম। ছেলে দু’টো নিয়ে প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে বাংলাদেশ দূতাবাসে এসে হাজির হলাম। এখানে দুএকজনার সাথে পরিচয় ছিলো। তাছাড়া এই একটি যুগ অারব অামিরাতে থাকায় জায়গাগুলি বেশ চিনে ফেলেছি। ওদের কাছে অামার পাসপোর্ট ও ছেলেদের কাগজপত্র গুছিয়ে দিতে অনুরোধ করায় ওরা অামাকে সাত দিনের সময় হাতে নিয়ে অাবার যেতে বললেন। অামি বাচ্চাদুটো নিয়ে বাসায় ফিরে দেখি অারিফ তখনো ফিরেনি। বেশ ভালো লাগলো। রান্না করে অামি ওদের নিয়ে খেলাম। অারিফের খাবার গুছিয়ে রাখলাম। তিনটে নাগাদ অারিফ এলো,খেলো, বিশ্রাম নিয়ে হসপিটালে চলে গেলো। অামি অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগলাম সাতদিন পর কবে অাসবে ?

সঠিক সময়েই সাত অামার সামনে এসে দাড়ালো। অারিফকে বললাম অাজ বাইরে খেয়ে নিতে। ও কোনো কথা না বলে চলে গেলো। অামি ওদের নিয়ে গেলাম দূতাবাসে। অালহামদুলিল্লাহ্ পাসপোর্ট ও কাগজপত্র তৈরী। ভিসা লাগিয়ে টিকিট সাথে নিয়ে ফিরে এলাম। মনে হলো বিশ্ব জয় করে ফেললাম।

তবে অামি যাচ্ছি কোথায় ? তাও ভাবলাম। কিন্তু পিছুটান অনুভব করলাম না। অাগামী অামায় হাতছানি দিচ্ছে অনিশ্চয়তার পথে। তাই অামি সেই অচেনা পথেই পা রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম। বাসায় ফিরে দেখি অারিফ ফিরেছে। কিন্তু অামায় কিছুই জিজ্ঞেস করলো না। তাহলে কি অারিফ সব লক্ষ্য করেছে ? ও কি চায়, অামি সত্যি সত্যি চলে যাই ? অামি পরদিন দুটো লাগেজ গোছালাম। অামার কাছে যে গহনা ছিলো, সব নিলাম, অনেক দিরহাম ছিলো বাংলাদেশি টাকায় দুই অাড়াইলক্ষ টাকার মতো। তাও নিলাম। চলে অাসার সময় অারিফ হসপিটালে। ভাবলাম চুরি করে কেনো যাবো? ওর সামনে থেকেই চলে যাবো। গাড়ী ডাকলাম,লাগেজ গাড়িতে তুললাম। বাসার দাড়োয়ান সাহায্য করলো। টেলিফোন করলাম অারিফকে জরুরী বাসায় ফিরতে। দশ মিনিটের মধ্যে ফিরলো অারিফ। সামনে গাড়ি দেখে হয়তো অবাক হয়েছিলো। অামি ভেতরে এমপি থ্রি তে অামার পছন্দের হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর গান চালালাম, করুন সুরে বেজে উঠলো ” অাজ দু’জনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে “। অারিফ বাসায় ঢুকতেই ওর হাতে বাড়ির চাবী গোছা দিয়ে না তাকিয়ে বাচ্চা দু’টো নিয়ে বের হতে যাচ্ছি,তখন অারিফ বলে ওঠে…..

…. তুমি চলে যাচ্ছো যাও, অামার
ছেলেদের রেখে যাও।

…. কার কাছে রেখে যাবো? সত মায়ের
কাছে? তাছাড়া তুমি নিশ্চয়ই চাওনা
অামি এটা জানাজানি করি বা তোমার
বিরুদ্ধে প্রতারণার বিরুদ্ধে অভিযোগ
করি? অভিযোগ কাউকে নয়,
প্রতারক তুমি ও অামার বাবা অার
অভিযোগ শুধু অাল্লাহর কাছে। কারন
তোমার হাতে সংশোধনের গুটি শেষ।

অামি দু’টো ছেলের হাত ধরে পা রাখলাম অজানার পথে। পিছনে পড়ে রইলো বারো বছরে অামার সাজানো গোছানো সংসার। গাড়ী চলা শুরু হলো অারিফ ঘরের ভেতর কী করছে কে জানে? শুধু শোনা যাচ্ছে গানের একটি কলি ” অামার এ কূল ছাড়ি তব বিশ্বলয়ের খেয়া ভরা পালে অকূলে দিয়েছি পাড়ি……… অামার এপথ অাঁধারে অাছে যে ঢেকে, অাজ দু’জনার…. “। ক্রমশ…….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!