ব্রেকিং নিউজ
Home | সাহিত্য পাতা | শুভ্রতার সুখ-দুঃখ (১৪ তম পর্ব)

শুভ্রতার সুখ-দুঃখ (১৪ তম পর্ব)

358

ফিরোজা সামাদ : হা বিধাতা তুমি অামায় অার কতো কি দেখাবে।  এতো মীরাক্কল ? শুনেছি বাচ্চা গর্ভকালীন মা যা কল্পনা করে ভাবে সন্তানের উপর তার প্রভাব পড়ে।  তাহলে ! নিজেকে অপরাধী ও লজ্জিত মনে হলো। ওদের যখন পাঁচ বছর বয়স, ওদের মুখ দু’টি দেখতে স্পষ্ট “মারুফ”। বিধাতা অামায় এমন শাস্তি দিলেন যা সারা জীবন অামাকে তাড়িয়ে বেড়াবে।

বাচ্চা দু’টো যতোই বড়ো হতে থাকে অামার মন ততোই অজানা সঙ্কায় দিন কাটে।  এই পাঁচ বছরে অারিফ কম হলেও ছয় সাতবার দেশে ফিরেছে। এর মধ্যে অামি অারো একটিবার অনুরোধ করেছিলাম ওর সাথে ছেলে দুটো নিয়ে ফেরার জন্য। অামার সে অনুরোধ অামলে নেয়নি। তার মতোই সে কাজ করে গিয়েছে।  অারিফ একরোখা মানুষ, যা বলে তাই করে। অামিও বিষয়টি মেনে নিয়েছিলাম।  কী হবে অযথা কথা কাটাকাটি করে ?  ছেলে দুটোর বয়স ছয় পাড় হতে চলছে।  এমনি সময় অারিফ অাবার দেশে ফিরলো। কিন্তু ভুল বশত ওর কেবিনেটের চাবীটা ফেলে রেখে যায়। অামি বিছানা গোছাতে গিয়ে চাবীর ব্যাগটি নজরে অাসে।  প্রথমতঃ কিছু মনে হয়নি। কিচেনে রান্না করতে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো… এই চাবীটা অারিফ জক্ষের ধনের মতো অাগলে রাখে,সেটা ফেলে গেলো?  কৌতুহল দমাতে না পেরে রান্না ফেলে এক প্রকার দৌড়েই গেলাম চাবীটা নিয়ে অারিফের স্ট্যাডি রুমে।

স্ট্যাডি রুমে ঢুকে কেবিনেট চাবী ঢুকালাম, নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হলো, চোর মনে হলো, অামি একি করছি? নিজেকে প্রশ্ন করে থেমে গেলাম নিমিষেই। ফিরে এলাম। অাবার ভাবনারা ডানা মেলে উড়তে শুরু করে। কেবিনেটের  ভিতর কী অাছে ?  হয়তো ওর পুরোনো প্রেমিকার চিঠি / ছবি যা একান্তই অারিফের, কী দরকার ওটা খুলে ? থাকনা ওর নিজস্ব কিছু।  অামি দেখলে হয়তো ভেঙ্গে যেতে পারে মন।  হয়তো কোনো অজ্ঞাত কারনে মনে ক্ষোভ জন্মাতে পারে, ভেঙে যেতে পারে বালুর নির্মিত এই থাকার জায়গাটুকু।  নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হলো। ফিরে গিয়ে রান্না সেড়ে বাচ্চাদের খাওয়ালাম। অামার মুখে খাওয়ার কোনো রুচি এলোনা।  বাচ্চাদের নিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে বিছানায় যেতেই ওরা ঘুমিয়ে পড়লো।  অামার মনে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে অাবার সন্দেহের গাছটি মহীরুহেরর মতো।

বিছানা থেকে নেমে চাবী নিয়ে চলে গেলাম স্টাডি রুমে।  কেবিনেটের লকে চাবী ঘোরাতেই খট করে খুলে গেলো।  কেবিনেটের দরজা সজোরেই টান দিলাম। মাঝারি সাইজের একটা ব্রিফকেস। লক নাম্বার জানা নেই।  কী করি ?  হঠাৎ বেপরোয়া হয়ে উঠলাম । দোকানে ফোন করলাম, লোক এলো, বললাম নাম্বার মনে করতে পারছিনা।  লোকটি দুই মিনিটেই খট করে লক খুলে দিলো। লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে দিরহাম দিয়ে বিদায় করে স্ট্যাডি রুমে ঢুকে ব্রিফকেস নিয়ে টেবিলে রেখে চেয়ার টেনে বসলাম। বুকে হাজারো হাতুড়ী পেটানোর শব্দ টের পাচ্ছি, কাঁপা কাঁপা হাতে ব্রিফকেস খুলতেই অগুণতি চিঠি ভর্ত্তি খাম। নীচে বেশ কতোগুলো ছবি।  অামার মাথা ঘুরছে, যেনো পড়ে যাচ্ছি। নিজেকে সামলে ব্রিফকেস ওখানে রেখেই চলে এলাম রুমে।  ক্ষাণিক বসলাম, পানি পান করলাম ,তারপর বাচ্চা দুটোর কাছে একটু শুলাম।  চোখ বন্ধকরে ভিসিঅার এর ক্যাসেট রিউইণ্ড এর মতো বর্তমান থেকে নিমিষেই চলে গেলাম অতীতে।  অাবার ফিরেও এলাম ততোধিক দ্রুতগতিতে। যে কোনো পরিস্হিতি মোকাবেলা করতে মানসিক নিলাম । প্রস্তুতি নিয়ে অাবার ছুটলাম স্ট্যাডি রুমে।  ছবিগুলো বের করলাম। লম্বা দীঘল কালো একরাশ চুলের একটি যুবতি মেয়ের সাদা-কালো ছবি। অজান্তেই দৃষ্টি অাটকে গেলো।  বাহ্  বেশ সুন্দরী তো।  অাবার সম্বিৎ ফিরে পেয়ে অার একটি ছবি নিলাম।  এ ছবিটিও সাদা-কালো, কিন্তু চোখ রাখতে পারছিলাম না। এটি মেয়েটির সাথে অারিফের যুগল ছবি। এটা কোনো সাধারণ ছবি নয় বুঝলাম। অার ইচ্ছে হলোনা ছবি দেখতে, যা বোঝার অামি বুঝে নিয়েছি । সাথে অন্য একটি পারিবারিক ছবি।  কাউকেই চিনিনা,তবে সাথে অারিফ ও মেয়েটির যুগল ছবিটি একইভাবে অাছে। অামার পা দুটো থরথর করে কাঁপছে মনে হলো, মাথাটা ঘুরছে,চোখের সামনে জোনাকিরা জ্বলছে অার নিভছে।  তারপর কী হয়েছিলো জানিনা। যখন চোখ খুললাম স্ট্যাডি রুমের ঘড়িটা জানিয়ে দিলো অামি দুঘণ্টা পড়েছিলাম।  মনে পড়লো বাচ্চাদের কথা। উঠে গিয়ে দেখি ওরা নির্বিঘ্নে ঘুমুচ্ছে। তাকিয়ে রইলাম নিষ্পাপ দু’টি শিশুর মুখের দিকে।ওদের অাশ্রয় অভয় হারিয়ে যাচ্ছে ওরা বুঝতেও পারছেনা। ভাবলাম,কেনো? কী প্রয়োজন ছিলো এই রহস্য অাবিস্কারের?তাহলে কী চাবীটা অারিফ ভুলে নয় ইচ্ছে করেই ফেলে গেছে ?

দুপুর থেকে খাওয়া হয়নি, শুধু পানির তেষ্টা।  মনে হচ্ছে এক সাগর পানি চুমুকেই পান করলে তৃষ্ণা মিটে যাবে। চোখ জ্বলছে। কান্নার চেষ্টা করলাম,কিন্তু নাহ্ !  শুধু অাতঙ্ক অার অনিশ্চয়তা ও ভয় মনটাকে অাষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। বাচ্চাদের জাগালাম।  মুখ হাত ধুয়ে বিকেলের নাস্তা খাওয়ালাম। তারপর অন্য একটি রুমে খেলার সরঞ্জাম দিয়ে খেলতে দিলাম। প্রতিদিন অামিও ওদের খেলার একজন সাথী, কিন্তু অাজ ওদের দুজনকেই খেলতে দিয়ে অাবার ফিরলাম সেই ভয়ঙ্কর কক্ষটিতের। অাস্তে করে চিঠির একটি খাম খুললাম। অর্ধেক পড়ে অার এগুতে পারছিনা। নিজেকে দুর্ভেদ্য মনে হচ্ছে। সব চিঠি একসাথে পড়তে ইচ্ছে করছে, কিন্তু কেনো পারছিনা ?  অামি এতো অক্ষম কেনো ? হা বিধাতা কোন পাপে তুমি অামায় এতো শাস্তি দিচ্ছো ?

সব এলোমেলো রেখে নামাজে চলে গেলাম।  অার পারছিলাম না।  নামাজে দাড়াতেই নাকের ভেতরটা কেমন ক্ষতবিক্ষত হয়ে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করলো।  নামাজেই গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করলাম। মনে অাছে  সেদিন সব নামাজ পড়তে পারিনি, শুধু কেঁদেছিলাম,অামার সারাজীবনের কান্না। সেই যে শুরু এর শেষ কোথায় অাজো জানিনা।

তারপর সব চিঠিগুলো অাবার যত্ন করে গুছিয়ে ব্রিফকেসে ঢুকিয়ে চিরতরে বন্ধ করে দিলাম। কি করবো সারারাত ভেবে ভেবে রাতের শেষে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল থেকে মনটা কেনো জানি হালকা মনে হলো।  মনে হলো এমনই হবার কথা ছিলো হয়তো। চারদিন দেশে থেকেই অারিফ কোনো জানান না দিয়ে চলে এলো। অামি একটুও অবাক হলাম না। যেনো অামি জানতাম । বরং অারিফ একটু অবাক হলেও ওর গাম্ভীর্যের অাড়ালে বুঝতে দিলোনা। খেয়ে বিশ্রাম নিতে গেলো।  এ সময় সাধারনত অামি পাশে থাকি। কিন্তু অাজ ওর কাছে গেলামন।  …..ক্রমশ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*