ব্রেকিং নিউজ
Home | সাহিত্য পাতা | শুকনো জলের রেখা

শুকনো জলের রেখা

445

শুভ্রা নীলাঞ্জনা : কোন একদিন সন্ধ্যে বেলা পৃথিবীর পথে পা রেখে চলে এসেছিলাম একদম মায়ের কাছে। তাই মা আমার নাম রেখেছেন সাঁজবাতি। আমার নামের সাথে কেমন যেন একটা কোমল দুঃখ মেশানো। সূর্য টা যখন চলে যায়,সেই মুহূর্তে পৃথিবী টা কেমন মন খারাপ করে মুখ টা আঁধার করে রাখে । ম্লান হয়ে আসে তার মুখের আভা। তাই জন্মের সময় পৃথিবীর কিছু দুঃখ আমি চেয়ে নিয়েছি । নানা বর্ণের দুঃখ। টুকটুকে লাল,গাড় নীল, হালকা নীল, কালচে নীল, ফিকে হয়ে যাওয়া বেগুনি,গভির আকাশি দুঃখরা একসময় আমার হৃদয়ের উঠোন জুড়ে এক্কা দুক্কা খেলা করত। আমি পা ছড়িয়ে বসে দুঃখদের খেলা দেখতাম। ওরা আনন্দে মেতে উঠত । মাঝে মাঝে আমাকে আড় চোখে দেখে নিত। আমি কি আবার ওদের রেখে চলে গেলাম নাকি ? বোকা দুঃখরা ! আমি কি ওদের ছেড়ে কক্ষনো যেতে পারি ওরা যে আমার অনেক আদরের। পাঁজরের ভাঁজে ভাঁজে তোদের ঠাঁই। সাপুড়েরা যেমন দুধকলা দিয়ে কাল সাপ পুষে আমি তেমনি চোখের জল দিয়ে দুঃখ পুষি । রাত যত গভীর হয় দুঃখরা তত বেশী আমাকে জড়িয়ে ধরে। তখন তাদের আল্লাদ বেড়ে যায় ধেই ধেই করে। মাঝে মাঝে ওদের ন্যাকামিতে আমি বিরক্ত হয়ে যাই। একদিন রেগে যেয়ে বললাম ছাড় তো দেখি এবার আমায়, গলায় একদম ফাঁসের মত আটকে ধরেছিস। আমি কি তোদের দুঃখে মরে যাব ? নীল দুঃখটার একটু বেশী অভিমান । নীল দুঃখ টা অভিমানে আরও নীল হয়ে গেল। গভীরভাবে আমার দিকে তাকাল । ওর তাকানোর সাথে সাথে আমি গলতে শুরু করলাম । কারণ ও আমার অনেক প্রিয় ,ওকে আমি কখনই দুঃখ দিতে পারি না। ও দুঃখ পেলে আমি সারাক্ষণ ছটফট করতে থাকি । শ্রাবণের ধারার মত আমার চোখ দিয়ে জল গড়াতে থাকে । সত্যি বলতে কি নীল কে আমি অন্যদের চেয়ে একটু বেশী ই ভালবাসি । ও কীভাবে যেন বুঝে যায় আমি কি চাই । আমি যখন নীলের ভিতর ডুবে যাচ্ছিলাম সেই মুহূর্তে বেগুনী দুঃখটা গম্ভীর হয়ে বলল তুমি কি চাও আমরা চলে যাই ? আকাশী দুঃখটা সবসময়ই একটু রগ চটা মূখের উপর দুমদাম করে কথা শুনিয়ে দিবে । আমি নীল কে বেশী পছন্দ করি তাই আমার উপর ক্ষেপা । সুযোগ পেলেই এক হাত নিয়ে নেয়। বলল তুমি চাও তাই আছি। জোড় করে আমরা থাকতে চাই না। তোমার মত দুঃখ পোষার অনেকেই আছে । আমি একটু নরম হয়ে গেলাম । আবার বলল ঐ তো সেদিন সুলক্ষণা নামে একজন সুন্দরী বিদুষী নারী তোমার চেয়ে ঢের সুন্দর লিখেও ভাল, ফেবুতে রিকু পাঠিয়েছে । তুমি বলেছে কাউকে কনফার্ম না করতে । তাই আমরা করিনি । শুধু তুমি দুঃখ পাবে। শুনে আমি অপমানে লাল হয়ে গেলাম । শুধু বললাম তোমরা মানুষের মতই লোভী । সুন্দরী একজন দেখলেই তার পিছনে দৌড়াও । সততা, বিশ্বাস, ভালবাসা এইগুলির কোন দাম নেই তোমাদের কাছেও ? একবার ভাবছি বলব চলে যাও তোমাদের যেখানে ভাল লাগে । মুখে এক আর মনে আরএক এইরকম দুঃখের আমার কোন দরকার নেই । মেয়েরা একটু অন্যরকম অপমান সহ্য করেও ভালবাসতে পারে। তাই আমি সব ভূলে গেলাম। আমতা আমতা করে বললাম আমি কি তা বলেছি? মাঝে মাঝে না তোমরা এমন করো আমার গলার ভিতর তোমরা সবাই একসাথে দলা পাকিয়ে আসো । তখন আমার অনেক কষ্ট হয়। লাল দুঃখটা বিড়বিড় করে বলল সব বুঝতে পেরেছি। আমি তাদের সবাই কে একসাথে জড়িয়ে ধরলাম , এই এই তোমরা না আমার বন্ধু ?আমার সাথে এমন করো ? ওরা একটু মায়া মায়া করে বলল ঠিক আছে অনেক রাত হয়েছে ঘুমিয়ে পড়ো । আমি দুঃখদের উপর অভিমান করে ঘুমিয়ে পড়লাম। ওদের সাথে আজ আর রাত জাগতে ইচ্ছে করল না , ভিতর টা কেমন যেন মরে গেছে। কোন শক্তি পাচ্ছি না । দুঃখরাও কখনো আপন হয় না। ওরাও কি মানুষের মত ? কোন কিছু দিয়েই বাঁধা যায় না। হুমায়ুন আজাদের একটা লাইন মনে পড়ে গেল “কোন পুরুষই কি কখনো সাঁকো বাঁধতে পারে না ? নাকি বাঁধা সাঁকো তাকে আর আকর্ষণ করে না ?” দুঃখ ও কি তাই? আমার চোখের কোল বেয়ে শুকনো জলের রেখা ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*