Home | উন্মুক্ত পাতা | উচ্চবিত্ত তথা মধ্যবিত্তদের সৌখিন বৃত্তান্ত

উচ্চবিত্ত তথা মধ্যবিত্তদের সৌখিন বৃত্তান্ত

ফিরোজা সামাদ : অামি নিশ্চিত যারা জীবনে সঞ্চয়ী মনোভাব পোষণ করেন নি। অাধুনিকতার নামে অকারণে ফ্যাশনেবল জীবনযাপন করেছেন। নিজেকে সৌখিন পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে অনেকেই উচ্চবিত্তদের সাথে প্রতিযোগিতা করে অাভিজাত্য দেখাতে ধার দেনা, ব্যাঙ্ক লোন করে বাপ দাদার ভিটেবাড়ি ও গাঁয়ের কথা ভুলে গিয়ে সুখের দরিয়ায় ডুবে ছিলেন? অাজ করোনা ভাইরাসের তান্ডবে দিশেহারা হয়ে শহর ছেড়ে সেই অজপাড়াগাঁয়ে অাশ্রয় নিয়ে তারাই মধ্যবিত্তদের দুঃখ দুর্দশার কথা ইনিয়ে বিনিয়ে ব্যক্ত করে সরকারের ঘাড়ে দায় চাপাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। একটিবারও কী ভেবে দেখেছেন?

সমাজের কিছু মানুষ বিলাসি জীবনে না গিয়ে সংযোমের মাধ্যমে সঞ্চয়ী মনোভাব পোষণ করে একটু একটু করে জমিয়ে অাজ এই মহামারি ও দুর্যোগে এই কংক্রিটের শহরেই বন্দী জীবনযাপন করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদেরকে? এই সমাজেরই কিছু মানুষ তাদেরকে একসময় কৃপণ, অাসামাজিক ও গেঁয়ো বলে অাখ্যায়িত করেছেন। অাসলে অামাদের সঞ্চয়ী, কৃপণ, অাসামাজিক, গেঁয়োর সংজ্ঞা সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নেই । এই সমস্ত সঞ্চয়ী মানুষদের জন্য অন্য কারোর চিন্তা করতে হয় না । তারা জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যায় কোনো না কোনো ভাবে। উচ্চবিত্ত ও সৌখিনদের জন্য যা কৃপণতা দুর্যোগ ও দুর্দিনে তাদের জন্য সেটা হয়ে ওঠে অাভিজাত্যের প্রতিকী ।

অাজ ঢাকা শহরের অভিজাত ও সাধারণ এলাকায় বাড়ি ভাড়ার অগুণতি টু-লেট। প্রায় ভবনেই বাড়ি ভাড়ার নোটিশ। কিন্তু ; ভাড়া নেয়ার মানুষ কোথায়?

অনেকেই ভাড়াবাসা ছেড়ে না দিয়েই চলে গেছে নিরাপদ অাশ্রয়ের সন্ধানে। তাদের অাভিজাত্যের প্রতিক অাসবাবপত্র অাজ অযত্নে অবহেলায় পড়ে অাছে। হায় মানুষ! অামরা যদি অাভিজাত্য ও বনেদীপনার মিথ্যা প্রতিযোগিতা না করে সীমিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত থাকতে পারতাম তাহলে সঞ্চিত অর্থ দিয়ে অাজ সমানভাবেই অভাব অনটন বিহীন সংসার পরিচালনা করতে পারতাম।

অাজ একটিবার মনে করে দেখুন তো! করোনা ভাইরাসই কি অভাব অনটনের জন্য দায়ি? না-কি অামাদের ভবিষ্যতের ভাবনাবিহীন বিলাসি যাপিত জীবন দায়ি ? অাপনার অায়ের ক্ষুদ্রতম অংশও যদি অাজ ভান্ডারে সঞ্চিত থাকতো তাহলে করোনা ভাইরাস জনিত কারনে লকডাউনকে কেউ পরোয়া করতো না।

এই সঞ্চয় অাপনার একার জন্যই থাকতো না। অাপনি অসহায়ের প্রতিও অাজ সদয় হাত বাড়াতে পারতেন। তাতে ঐশ্বরিক এক প্রশান্তিতে মন ভরে যেতো।

অামাদের শহুরে অাধুনিক জীবন যাপনে অনেক সমস্যা ছিলো। প্রয়োজনের তুলনায় লোক দেখানোটাই যেনো বেশি প্রয়োজন ছিলো। নাহলে অন্তত ছয় মাস বসে খাওয়ার মতো টাকা সব পরিবারেই জমে থাকার কথা। যতটুকুন অায় ছিলো , কালের স্রোতে গা ভাসাতে গিয়ে তারচেয়ে অতিরিক্ত খরচ করেছে। যার যে স্ট্যাটাস, যেটুকু সামর্থ্য ছিলো, কিছু মানুষ তার চেয়ে উঁচু তলায় বসবাস করেছে।

গত শতাব্দীতে মানুষের আর্থিক অবস্থা অনেক খারাপ ছিল। অামাদের দাদা- দাদী , মা-বাবারা এই খারাপ অবস্থার মধ্যে থেকেও ভবিষ্যতের জন্য আজীবন সঞ্চয় কনে গেছেন। তারা খেয়ে না খেয়ে, অাধপেটা খেয়ে, মোটা সুতোর দুটো কাপড় পড়ে সঞ্চয় করে সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবনায় এই শহরেরই এক কোণায় এক টুকরো জমি কিনে রাখতো। গাঁও গ্রামে একটা স্থায়ী ঠিকানা ছিলো। সেই অাবাসন তারা কখনোই পরিত্যাগ করেন নি। গোটা সংসার হাতটানা অবস্থায় চললেও মায়ের আঁচলের গিঁট্টুতে আর মাটির ব্যাঙ্কে থাকতো অপার খুচরা টাকা পয়সা। মাটির হাড়িতে থাকতো মুঠি মুঠি চাল, যা ছিলো তাদের দানের সঞ্চয়।

বিংশশতাব্দীতে এসে মানুষ অাকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নের নেশায় মত্ত্ব। অবুজ সন্তানের হাতে অাধুনিক মোবাইল, ল্যাপটপ ইত্যাদি। স্ত্রীর গায়ে হীরে জহরতের গহনা ও মাসে একবার বিদেশ ভ্রমন, সমূদ্র সৈকতে সানবাথ, বিদেশে সেকেন্ড হোম। এ যেনো স্বর্গীয় সুখ এই ধরায়।

তাতে দেখা যাচ্ছে, এরা দেশের সব অর্থ লোনের নামে ঋণ খেলাপির অাওতায়। তারপরেো তারা দেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক বনে অাছেন। তাই দেখে না বুঝেই মধ্যবিত্তরা বিশাল সাগরে মুক্তো খোঁজার অাশায় ঝাপিয়ে পড়ে হাবুডুবু খেয়ে উল্টো বিষম খাচ্ছে। অার অাজ পরিণতি কি?

সেকেন্ড হোমেও করোনা ভাইরাস ! সমূদ্র ভ্রমনে নিষেধাজ্ঞা! পিজ্জার বাজার, কে এফ সি সহ নামকরা রেস্টুরেন্ট অাজ লকডাউনের অাওতায়। রূপচর্চা জৌলুশ দেখানোর পার্লার? যেখানে হাজার হাজার টাকা খরচ করে ফেসিয়াল, মেকঅাপ, পেডিকিউর, মেনিকিউর অারো কতো কী? এসব কিন্তু ; এখন না হলেও চলে যায় অনায়াসে।

উচ্চবিত্তদের এই লাইফস্টাইলের ছায়া পড়েছে সেই।সাদামাটা গাঁও গ্রামেও। অাজ সেখানের অর্ধশিক্ষিত সহজ সরল মানুষগুলোও অাজ পা ফেলেছে বিলাসি জীবনের অাশায়। তারা এখন বিভিন্ন এনজিও দ্বারা প্রলুব্ধ হয়ে ক্রমান্বয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পরছে। তারা যাও সঞ্চয় করে তাও সুদসহ চলে যায় সেই এনজিও নামক প্রতিষ্ঠানের কাছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে এখন কেউ আর ঘরের বিলাসবহুল ড্রইংরুমে আড্ডা দেয়না। বারবিকিউ খেতে ছাদে বন্ধুদের নিয়ে গল্পগুজব বা অাড্ডা হয় না। মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হলে দুহাজার টাকার টিকেট কিনে মুভি দেখা হয়না। শখের সব খেলনাই অাজ অযত্নে পড়ে অাছে ধূলোবালি মাখা অবস্থায়। অাজ কোথায় বর্ষবরণ? কোথায় থার্টিফার্স্ট নাইট ? ভ্যালেন্টাইন ডে? ইত্যাদি?

অাজ মানুষ মসজিদে যেতে পারছেনা ! বাবা মায়ের কবরের কাছে সন্তানের অনুপস্থিতি! ঈদ, কোরবানি, পূঁজা পার্বণ সব বন্ধ। পবিত্র ক্বাবাঘরে তাওয়াফ বন্ধ, মুসলিমদের পাঁচটি স্তম্বের একটি হজ্জ্ব অাজ বন্ধ! মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা কোথাও নেই জন মানবের চিহ্ণ! এসবের জন্য কি করোনা দায়ি? না-কি অামাদের বিলাসি জীবনযাপন দায়ি?

পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকেই মহামারী দুর্যোগ অভাব, দুর্ভিক্ষ এসেছে। সে সব এই মানুষকেই মোকাবিলা করতে হয়েছে। অাজকের করোনা ভাইরাস হয়তো পূর্বের সব ভাইরাস থেকে শক্তিশালী অার সেজন্যই সাবধানতা ও সচেতনতার সাথে নিজেদের কেই নিজ ব্যবস্থাপনায় অাবদ্ধ রাখা উচিৎ প্রতিটি নাগরিকের। এখন প্রশ্ন? সরকার লকডাউন দিয়েছে। জনগণ খাবে কি? বাড়ি ভাড়া দেবে কী দিয়ে? ইত্যাদি, ইত্যাদি !

এবার অাসুন একটু হিসেব করে দেখি! ( যদিও অামি অংকে ভীষন অপরিপক্ব ) একটা কথা অাছে, ছোটবেলা থেকেই শিখে এসেছি তাহলো, ” অায় বুঝে ব্যয় করো!” একজন শ্রমজীবী মানুষের মাসিক অায় থেকে যদি প্রতি মাসে মাত্র চার হাজার টাকা সঞ্চয় করা হতো( যা অামরা পার্লারে অথবা অতিরিক্ত দুইটা শাড়ি কিনে অযথা অালমারীতে তুলে রাখি ) সেই সঞ্চিত অর্থ বছরে ৪৮,০০০ হাজার টাকা জমে যায়। এ রকম দশ বছরে জমে প্রায় ৫,০০০০০লক্ষ টাকা জমে যায় শুধু একজন প্রকৃত নারীর হাতেই। যিনি একাধারে সুগৃহিনী, সন্তানের কল্যাণে মা,স্বামীর বিপদে প্রেয়সী, দেশের সঙ্কটে দেশপ্রেমী। অাজকের এই বিপর্যয়ে যদি কেউ না খেয়ে থাকেন সে জন্য করোনা ভাইরাস বা কোনো রাস্ট্রের সরকার দায়ি নয়। দায়ি অামাদের অমিতাচার।

অামাদের বেহিসেবি জীবনযাপন। এখন হঠাৎ করে নেমে অাসা বিপদে পগে অামরা হাবুডুবু খাচ্ছি। নিজকে অসহায় মনে করছি। তাছাড়া একটু রোজগার করতে পারলেই অামরা একান্নবর্তী পরিবারকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছি। একতাবদ্ধ পরিবারেরর মর্ম কি অামরা ভুলে গিয়েছি। বাপ দাদার ভিটে, শেকড় ভুলে গিয়েছি অহঙ্কারের সাথে। অামরা বুঝতে চাইনি, কখনো উপলব্ধি করতে চাইনি গাঁয়ের বাড়ি থেকে নারিকেল, কিছু পোলাওয়ের চাল বস্তাভরা মুড়ি বা সিজনে গাছের অাম কাঠাল, মিষ্টি কুমরার কী অাশির্বাদ? বরং নাক সিটকানি ও অবহেলায় গাঁ থেকে বয়ে নিয়ে অাসা সেই স্বজনকেও উপযুক্ত মূল্যায়ন করতে চাইনি। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! অাজ মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে, গাঁয়ের সেইসব স্বজনদের অান্তরিকতার কথা।

ঢাকা শহরে প্রায় বিশ বছরের বসবাস। করোনা ভাইরাস অাসার অাগ পর্যন্ত বিশেষ করে লকডাউন হওয়ার অাগে মধ্যবিত্ত নামে কোনো পরিবার দেখিনি। সবাই চাল চলনে, বলনে, প্রকাশে একই বনেদিআনা দেখে এসেছি। অামরা পণ্যের দাস হয়ে অাজ নিরাপত্তা হীনতায় অাক্রান্ত। এখন এমন অবস্থার মু্খোমুখি, মাত্র তিন- ছয় মাসের নিরাপদ ভবিষ্যতের কথাও নিজ নিজ সঞ্চয়ের ঝুলি থেকে পরিচালন করার কথা ভাবতেও শিউরে উঠতে হয়।

যা অত্যন্ত দুঃখজনক! তবে নিম্ন পর্যায়ের দৈনিক খেটে খাওয়া মানুষের কথা অামাদের নৈতিক বিবেচনায় নিতে হবে। তাদের জন্য যদি সম্ভব হয় সাধ্যমতো করতে হবে এবং তাই উচিৎ। ভেবে দেখবেন, এই দিন দিন নয়, অারো সামনে দিন রয়েছে,তা কতোখানি নিরাপদ বা সুদিন অামরা কেউ জানি না। কারণ, ভবিষ্যৎ সর্বদাই অন্ধকারে নিমজ্জিত !

biman-ad

কথাগুলো সার্বজনীন, অামার চারপাশ দেখে দেখে মনে হলো,তাই বললাম। ভুল কিছু বললে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টতে দেখে বুঝিয়ে বলুন। জানিনা অাপনাদের সাথে অার কথা বা দেখা হবে কি না? সকলের অফুরাণ দোয়া চাই !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!