
নিউজ ডেক্স: রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটের ট্রেনগুলোতে এখনও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) কোচ বা রেক সংযুক্ত করা হয়নি। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ ট্রেন থেকে অবমুক্ত হওয়া আধুনিক রেকটি এই রুটে চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল। কিন্তু বহুল প্রত্যাশিত এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে যাত্রীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ মার্চ বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের (ডিজি) কার্যালয় চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী ‘সৈকত এক্সপ্রেস’ ও ‘প্রবাল এক্সপ্রেস’ ট্রেনে ওই আধুনিক রেকটি সংযুক্ত করার প্রস্তাব অনুমোদন দেয়। এর মাধ্যমে পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে যাত্রীসেবার মান উন্নত করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু অনুমোদনের দুই মাস পরও সেই পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি।

চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটটিকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন করিডোর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশের বিপুল সংখ্যক অভ্যন্তরীণ পর্যটক সারাবছরই কক্সবাজার ভ্রমণ করেন, ফলে এই রুটে সবসময়ই যাত্রীদের প্রবল চাপ থাকে। পর্যটনের পাশাপাশি বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও পর্যটননগরী কক্সবাজারের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ও অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে নিয়মিত যাতায়াতের ক্ষেত্রেও এই রেলরুট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত ফেব্রুয়ারিতে পর্যটনের ভরা মৌসুমেও কক্সবাজারগামী পর্যটকদের উন্নত মানের ট্রেনের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সামনে ঈদুল আজহার ছুটিতেও পর্যটকদের এই রুটে ট্রেনের মান নিয়ে হতাশ হতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন ভ্রমণ-সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, রেলওয়ের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা এই আধুনিক রেকটি চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটে না দিয়ে অন্য কোনো রুটে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তার মতে, এসি রেক সংযোজনে এই রহস্যজনক বিলম্বের পেছনে সেই চেষ্টার যোগসূত্র থাকতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে এই রুটে ব্যবহৃত পুরোনো ও জরাজীর্ণ কোচগুলোর পরিবর্তে মহানগর এক্সপ্রেস থেকে প্রত্যাহার করা রেকটি ব্যবহার করার কথা। মহানগর এক্সপ্রেস সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা নতুন রোলিং স্টক (কোচ ও ইঞ্জিন) পেয়েছে। এর ফলে ২০২০ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে সংগ্রহ করা তাদের পুরোনো রেকটি অবমুক্ত হয়। এই রেকটিতে আধুনিক এসি কেবিন, এসি চেয়ার কার (স্নিগ্ধা) এবং অন্যান্য উন্নত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।
গত বছরের ১ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজার ট্রেন চলাচল শুরু হলেও চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে নিয়মিত লোকাল ট্রেন চলাচল শুরু হয় চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে। বর্তমানে দুই জোড়া আন্তঃনগর ট্রেনের সময়সূচি অনুযায়ী একটি মাত্র রেক ব্যবহার করে প্রতিদিন চারটি ট্রিপ পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, পর্যটননগরীগামী এই ট্রেনের যাত্রীরা এখনও নন-এসি বগিতে অত্যন্ত কষ্টকরভাবে ভ্রমণ করছেন। এই বগিগুলোর অনেকগুলোই অত্যন্ত পুরোনো এবং আন্তঃনগর ট্রেনের ন্যূনতম মানসম্মত সুবিধাবর্জিত।
রেলওয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পরও দীর্ঘ দুই মাসেও আধুনিক কোচ চালু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এই রুটের নিয়মিত যাত্রীরা।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এস্টেট বিভাগের এক কর্মকর্তাও এই ট্রেনের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার আত্মীয়স্বজনরা কক্সবাজারে গেলে ট্রেনে যেতে পছন্দ করেন। কিন্তু এই রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলোর মান এতটাই খারাপ যে, লজ্জায় আমি প্রায়শই তাদের ট্রেনে না গিয়ে সড়কপথে যাতায়াতের পরামর্শ দিই।’
চট্টগ্রামের বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন রাকিব বলেন, ‘প্রতিশ্রুত উন্নয়ন ও আধুনিক সুবিধা বাস্তবায়নে এমন বিলম্ব আমাদের খুবই হতাশ ও অসন্তুষ্ট করেছে। এই ট্রেনগুলো খুবই নিম্নমানের সুবিধা নিয়ে চলাচল করছে, যা যাত্রীদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ। বাংলাদেশ রেলওয়ের উচিত দ্রুত আধুনিক রেকটি সংযুক্ত করে আমাদের এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেওয়া।’
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন বলেন, ফেনী থেকে পরিবার নিয়ে তিনি কক্সবাজারে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। নিয়মিত ট্রেন ভ্রমণকারী এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা নিয়মিত ট্রেনে যাতায়াত করি। কিন্তু কক্সবাজারগামী ট্রেনগুলোর কোচের মান খুবই খারাপ। সড়কপথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এই রুটে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দ্রুত এসি রেক সংযোজন করা হলে পর্যটকদের যাতায়াত অনেক বেশি আরামদায়ক ও নিরাপদ হতো।’
এসি রেক সংযোজনে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীন বলেন, ‘অবমুক্ত হওয়া রেকটিতে কিছু যান্ত্রিক সমস্যা ধরা পড়েছে। বর্তমানে সেগুলো সমাধানের কাজ চলছে। যান্ত্রিক সমস্যা পুরোপুরি দূর হলে রেকটি এই রুটে চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর চালু হওয়া এই রুটটি পর্যটন চাহিদা বাড়ার কারণে দেশের অন্যতম ব্যস্ত রেলপথে পরিণত হয়েছে। শুরুতে ট্রেনগুলো শুধু ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত চলাচল করত। কয়েক মাস পর বাংলাদেশ রেলওয়ে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটে অস্থায়ী বিশেষ ট্রেন সার্ভিস চালু করলেও লোকোমোটিভ ও কোচ সংকটের কারণে তা পরে বন্ধ হয়ে যায়। সরাসরি চট্টগ্রাম সংযোগ না থাকায় সমালোচনা বাড়তে থাকলে, এর প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে আবারও এই রুটে নিয়মিত ট্রেন চলাচল শুরু করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। -ঢাকা পোস্ট
Lohagaranews24 Your Trusted News Partner