Home | উন্মুক্ত পাতা | আল-কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আত্মশুদ্ধির ত্বরিকত: গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

আল-কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আত্মশুদ্ধির ত্বরিকত: গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

image_printপ্রিন্ট করুন

26677794_1096211767187796_256172735977026273_o
_____ড.মুহাম্মদ ওয়ালী উল্লাহ মঈন_____

রূহ বা আত্মার পরিচয়:
আল-কুরআনে আল্লাহ তাআলা রূহ শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহার করেছেন। আবার نفس ‘নফস’ শব্দটিও বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। একইভাবে قلب ক্বালব শব্দটিও বিভিন্ন ভাবার্থে ব্যবহার করেছেন। তবে সাধারণ প্রচলিত ও বহুল পরিচিত হিসেবে এ শব্দগুলোর অধিক গ্রহণযোগ্য ও সর্বজন পরিচিত অর্থ হলো আত্মা, প্রাণ, অন্তর, ইত্যাদি। আত্মশুদ্ধি অর্থ হলো, নিজের সংশোধন, নিজেকে খাঁটি করা, নাফস বা আত্মাকে পাপমুক্ত করা, আল্লাহ তাআলার স্মরণ, আনুগত্য ও ইবাদত ব্যতীত অন্য সমস্ত কিছু থেকে অন্তরকে পবিত্র রাখাকে আত্মশুদ্ধি বলা হয়।

তাযকিয়াতুন নাফস বা আত্মশুদ্ধির পরিচয় ও গুরত্ব:
আল-কুরআনে আল্লাহ তাআলা বারবার ঘোষণা করেছেন যে, উম্মতের তাযকিয়াই রাসূলুল্লাহ (স:) এর মূল মিশন। হযরত ইবরাহীম (আ:) আল্লাহর কাছে দোয়া করে বলেছিলেন:
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি তাদের মধ্য হতে তাদের নিকট একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যে আপনার আয়াতসমূহ তাদের নিকট তিলাওয়াত করবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে, এবং তাদেরকে পবিত্র করবে, তুমি তো পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। (সূরা বাক্বারা, আয়াত: ১২৯)
লক্ষ্য করা যায় যে, অত্র আয়াতে হযরত ইবরাহীম (আ:) এর দোয়ায় তাযকিয়া বা পবিত্র করা বিষয়ে আয়াতের শেষাংশে উল্লেখ করা হয়েছে। তাযকিয়ার গুরুত্ব বিচারে আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম (আ:) এর দোয়ার প্রতিউত্তরে বলেন:
لَقَدْ مَنَّ اللهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ
আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের নিজেদের মধ্য হতে তাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করেছেন, যে তাঁর আয়াতসমূহ তাদের নিকট তেলাওয়াত করে, তাদের পরিশোধন করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়, যদিও তারা পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্ততেই ছিল। (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত:১৬৪)
আমরা গুরুত্ব সহকারে লক্ষ্য করি যে, অত্র আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাযকিয়াহ বা পরিশোধনের বিষয়টিকে প্রথম দিকে উল্লেখ করেছেন যা হযরত ইবরাহীম (আ:) আয়াতের শেষের দিকে প্রার্থনা করেছিলেন। এ বিষয়টি মানুষের জীবনে অতীব গুরুত্ব্পূর্ণ বিধায় আল্লাহ তাআলা মুকাদ্দাম বা অগ্রভাগে উল্লেখ করেছেন।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন-
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا – وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا
নিশ্চয়ই সেই সফলকাম, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে। (সূরা আশ-শামস, আয়াত: ৯-১০)
মানুষের জন্য আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অনস্বাকার্য। দেহ ও অন্তরের সমন্বয়ে মানুষের সৃষ্টি। এ দুটোর মধ্যে ক্বালব বা অন্তরের ভূমিকাই প্রধান। মানুষের অন্তর বা ক্বালবই মানুষকে পরিচালনা করে। তাই মানুষের পার্থিব জীবনের সকল কাজকর্মের বিশুদ্ধতার জন্য ক্বালবের সংশোধন প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে রাসূল (স:) বলেন,
أَلاَ وَإِنَّ فِي الجَسَدِ مُضْغَةً: إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الجَسَدُ كُلُّهُ، أَلاَ وَهِيَ القَلْبُ
জেনে রেখো; শরীরে মধ্যে একটি গোশতপিন্ড রয়েছে, যদি তা সংশোধিত হয়ে যায় তবে পুরো শরীরই সংশোধিত হয়ে যায়। আর যদি তার কুলষিত হয়, তবে পুরো শরীরই কুলষিত হয়ে যায়, মনে রেখো তা হলো ক্বালব বা অন্তর। (সহীহ বুখারী, ১ম খণ্ড, দারুল ফিকর, বৈরুত, হাদীস নং- ৫২, সহীহ মুসলিম, ৩য় খণ্ড, দারু ইহইয়াইল কুতুবুল আরাবিয়্যাহ কায়রো, হাদীস নয়- ১২১৯)

পরকালীন জীবনে সফলতা এবং মুক্তি আত্মশুদ্ধির উপর নির্ভরশীল, যে ব্যক্তি দুনিয়াতে নিজ আত্মাকে পবিত্র রাখবে পরকালে সে-ই মুক্তি পাবে, আল্লাহ বলেন,
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ – إِلَّا مَنْ أَتَى اللهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
সেদিন সম্পদ কোনো কাজে আসবে না, আর না কাজে আসবে সন্তান-সন্তুতি বরং সেদিন সে ব্যক্তিই মুক্তি পাবে যে আল্লাহর নিকট বিশুদ্ধ অন্ত:করণ নিয়ে আসবে। (সূরা শুআরা, আয়াত: ৮৮-৮৯)
আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন নিষ্পাপ অবস্থায় যার কারণে তার অন্তর বা ক্বালব থাকে সে সময় পবিত্র বা পাপমুক্ত। দুনিয়ার বিভিন্ন অপকর্মে মানুষের আত্মা পূর্বের পবিত্র অবস্থায় থাকে না। বারবার পাপ কাজ করার কারণে মানুষের অন্তর কুলষিত হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন-
كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
কখনোই নয়, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়াছে। (সূরা আল-মুতাফফিফিন, আয়াত: ১৪)
হযরত ইবনু আব্বাস (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) আল্লাহর আনুগত্য, ইখলাস ও নির্ভেজাল তাওহীদের মাধ্যমে মানুষের তাযকিয়া করেন, তাবিয়ী ইবনু জুরাইজ (র:) বলেন, তিনি তাদেরকে শিরক থেকে পবিত্র করেন। (ইমাম তাবারী, তাফসীরে জামিউল বয়ান, দারুল ফিকর ১৯৮৮, বৈরুত, ১ম খণ্ড, পৃ: ৫৫৮)

ত্বারিকাতুত্ তায্কিয়াহ বা পরিশুদ্ধির পথ বা রাস্তা:
পরম করুণাময় মহান আল্লাহর সাথে সম্পর্কের জন্য সার্বক্ষনিক যিকর হচ্ছে একটি মৌলিক প্রয়োজন। আল্লাহর নবী সংসার ত্যাগের ধারণা মিশ্রিত যিকরের পরিবর্তে তাঁর উম্মতকে দিবারাতের প্রত্যেকটি কাজের জন্য অসংখ্যা দুআ ও যিকর শিক্ষা দিয়েছেন । মুখে আল্লাহকে ডাকবে, স্মরণ করবে অথচ বাস্তব জীবনে আল্লাহর বিধানের বিপরীত কাজ করবে এমন যিকর ইসলামে কাম্য নয়। আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রেও ফরয ও নফল, করণীয় ও বর্জনীয় কর্ম রয়েছে। মনকে সকল প্রকার শিরক, কুফর আত্মপ্রেম, কুরআন-সুন্নাহের বিপরীতে নিজের পছন্দকে গুরুত্ব প্রদান হিংসা, অহংকার, লোভ, রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা, ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা ইত্যাদি থেকে হৃদয়কে মুক্ত ও পবিত্র করতে হবে। নিজেকে ধৈর্য্য, কৃতজ্ঞতা, আল্লাহভীতি আল্লাহর রহমতের আশা, আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি, নির্লোভতা, সকলের প্রতি ভালবাসা, কল্যাণ কামনা ইত্যাদি বিষয় দিয়ে পরিপূর্ণ করতে হবে।
পার্থিব শান্তি ও আখিরাতে মুক্তির জন্য একজন মুমিনের উচিত সব সময় আল্লাহর যিকির বা স্মরণের উপর দিনাতিপাত করা। ফরয ও নফল সকল ইবাদত আল্লাহর যিকিরের অন্তর্ভূক্ত। প্রখ্যাত মহিলা হযরত উম্মে দারদা (রা:) বলেন,
فان صليت فهومن ذكر الله وإن صمت فهو ذكر الله وكل خير تعلمة فهو من ذكر الله وكل شر تجتنبه فهو من ذكر الله وافضل ذلك تسبيح الله
তুমি যদি সালাত আদায় কর তাও আল্লাহর যিকির, তুমি যদি সিয়াম পালন কর তবে তাও আল্লাহর যিকির। তুমি যা কিছু ভালো কাজ কর সবই আল্লাহর যিকির। যত প্রকার মন্দ কাজ তুমি পরিত্যাগ করবে সবই আল্লাহ যিকিরের অন্তর্ভূক্ত। তবে সবচেয়ে উত্তম যিকির হচ্ছে আল্লাহর তাসবীহ। (ইমাম তাবারী, প্রাগুত্তখ খন্ড ২০, পৃষ্টা-১৫৭)
এভাবে প্রত্যেক ইবাদতের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর যিকর করবে। যথাযথ পন্থা ও একনিষ্ঠ আত্মা তৈরির কর্মপন্থা সকল মানুষের জানা না থাকাই স্বাভাবিক। এসব পন্থাগুলো জানার জন্য মুমিনের উচিৎ এমন একজন আল্লাহর মক্ববুল বান্দার দ্বারস্থ হওয়া যিনি ইলমে আমলে তার চেয়ে অগ্রগামী। ইবাদত ও যিকরের দ্বারা ক্বালব বা অন্তর পবিত্র করা সকল মুমিনের পক্ষে সমানভাবে সম্ভব নয়। ইবাদতকে আল্লাহর কাছে গ্রহনযোগ্য করার জন্য মুমিনের কর্তব্য হলো নিজেকে পরিশুদ্ধ করে তোলা। যুগে যুগে যে সব আল্লাহর অলীরা কোরআন সুন্নাহর আলোকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার পথ অবলম্বন করেছেন তাকে বলা হয় ত্বরিকত। তারা মানুষকে অন্যায়ের প্রতিবাদ, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ, ইবাদতে একনিষ্ঠতা ও আত্মশুদ্ধির পথ নির্দেশ করেছেন। প্রখ্যাত আল্লাহর অলী মুজাদ্দিদে আলফে সানী শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রা:) এর সংগ্রামী জীবনী একথার উৎকৃষ্ঠ প্রমাণ।
ফরয ইবাদতের পাশাপাশি আল্লাহর যিকর ত্বরিকতের প্রধান সবক। আল্লাহর যিকর ছাড়া মুমিনের ক্বলব পবিত্র হয় না। তাছাড়া যিকর হলো আত্মার খোরাক বাা প্রশান্তির মাধ্যম ।
আল্লাহ বলেন,
أَلَا بِذِكْرِ اللهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
সাবধান। একমাত্র যিকরের মাধ্যমেই অন্তরাত্মাসমূহ প্রশান্তি লাভ করে। (সূরা রাদ- ২৮)
খাদ্য ও পানীয় দ্বারা যেমন শরীর পরিপুষ্ট হয়। তেমনিভাবে আল্লাহর যিকর দ্বারা অন্তরের ক্ষুধা নিবারণ হয়।
আল্লামা রুমী (রা:) বলেন:
قال أطعمنى فانى جائع+ واعتجل فالوقت سيف قاطع
রূহ বলে আমি ক্ষুধার্ত তুমি আমাকে খাদ্য দাও এবং তুমি খুব তাড়াতাড়ি তা কর কারণ সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
এখানে তিনি যিকর দ্বারা অন্তরকে পরিপুষ্ট করার কথাই বলেছেন। আল্লাহর যিকর ছাড়া মানুষের অন্তর পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয় না। মহানবী (স:) বলেছেন:
إِنَّ لِكُلِّ شَيْءٍ سِقَالَةً، وَإِنَّ سِقَالَةَ الْقُلُوبِ ذِكْرُ اللهِ
প্রত্যেক বস্তরই মরিচা তোলার যন্ত্র আছে, আর অন্তরের মরিচা দূর করার যন্ত্র হলো, আল্লাহর যিকর। (বায়হাকী, হাদীস নং ৫১৯)
রাসূল (স:) বলেন,
أَكْثِرُوا ذِكْرَ اللهِ حَتَّى يَقُولُوا: مَجْنُونٌ
তোমরা এতবেশী পরিমাণ আল্লাহর যিকর কর। যেন লোকেরা তোমাদের আল্লাহর পাগল মনে করে। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১১৬৫৩)
আরো বলেন-
لاَ يَزَالُ لِسَانُكَ رَطْبًا مِنْ ذِكْرِ اللهِ
অর্থাৎ তোমার জিহ্বা যেন সর্বক্ষণ আল্লাহর যিকরে সিক্ত থাকে। (তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩৭৫)
রাসূল (স:) আরো বলেন,
لاَ تُكْثِرُوا الكَلاَمَ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللهِ فَإِنَّ كَثْرَةَ الكَلاَمِ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللهِ قَسْوَةٌ لِلْقَلْبِ، وَإِنَّ أَبْعَدَ النَّاسِ مِنَ اللهِ القَلْبُ القَاسِي.
অর্থাৎ আল্লাহর স্মরণ ব্যতীত অত্যাধিক কথা বলো না, কেননা, আল্লাহর স্মরণ ব্যতীত অত্যাধিক কথা বললে, অন্তর কঠিন হয়ে যায়। আর নিশ্চয় কঠিন হৃদয় ব্যক্তি আল্লাহর রহমত হতে অধিকতর দূরে। (তিরমিযী, হাদীস নং- ২৪১১)
সঠিক ও আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য (مقبول) পন্থায় আল্লাহর স্মরণ ও খালিছ তথা একনিষ্ট মনে আল্লাহর ইবাদত সম্পন্ন করার জন্য আল্লাহর অলীগণের অনুসরণে ত্বরিকত ছাড়া সম্ভব নয়।

লেখক- প্রভাষক, চট্টগ্রাম সরকারি মডেল কলেজ, খুলশী, চট্টগ্রাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!