
এলনিউজ২৪ডটকম: লোহাগাড়ায় কবিরাজ মো. শাহ নেওয়াজ বৈদ্যের প্রকৃত নাম আবদুল গফুর। ‘শাহ নেওয়াজ বৈদ্য’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তি এক সময় দারিদ্র্যের জীবনযাপন করতেন। তার বাড়ি উপজেলার আধুনগর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম আধুনগর বশির মিস্ত্রি পাড়ায়। দিনমজুর বাবা খুলু মিয়ার সেই পরিবার থেকেই গড়ে উঠেছে রহস্যজনক উত্থানের এক আলোচিত চরিত্র, যাকে ঘিরে এখন নানা প্রতারণা ও অবৈধ অর্থ উপার্জনের অভিযোগ উঠছে।
অভিযোগ রয়েছে, এক ফুঁতেই সব রোগ সারে। এমন অলৌকিক দাবি সামনে রেখে দীর্ঘদিন যাবত মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে প্রতারণা চালিয়ে আসছেন শাহ নেওয়াজ বৈদ্য। প্রকাশ্যে তিনি চিকিৎসার জন্য ২০ টাকা ফি নেন বলে দাবি করলেও বাস্তবে রোগিদের কাছ থেকে দালালদের মাধ্যমে কৌশলে হাজার হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। এমনকি রোগভেদে লাখ পর্যন্ত চুক্তিতে চিকিৎসা দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। এই তথাকথিত বৈদ্যগিরির আড়ালেই অস্বাভাবিকভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে তার সম্পদের পরিমাণ। ইতোমধ্যে তিনি বহু টাকা ব্যয়ে একটি পাকা ভবন নির্মাণ করেছেন। পাশাপাশি রয়েছে গরুর খামার, হালচাষের ট্রাক্টর (পাওয়ার টিলার), একাধিক কৃষিজমি ও ব্যাংকে মোটা অংকের লেনদেন। যার বৈধ উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়রা জানান, শাহ নেওয়াজ বৈদ্য পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন এলাকায় দালাল নিয়োগ করে সব রোগের চিকিৎসার মিথ্যা প্রচারণা করেন। এসব দালাল নিজেরাই নাকি তার কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন, এমন সাজানো গল্প ছড়িয়ে মানুষকে প্রলুব্ধ করেন। এই প্রচারণার ফাঁদে পড়ে লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালীসহ পাশ্ববর্তী কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলা থেকেও প্রতিদিন বহু সহজ-সরল মানুষ তার বাড়িতে ছুঁটে আসছেন। তার কাছে আসা রোগিদের বড় একটি অংশ নারী। পরিস্থিতি ও দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের কাছ থেকে কৌশলে মোটা অংকের টাকা আদায় করা হয়। ২৪ ঘন্টার মধ্যে চিকিৎসার সাফল্যের কথা বলে জিনের বাতাস, ডাইনের বাতাস, জিনের আছর, ডাইনের আছর, দারু টোনা বান কাটা, ছোট সন্তানের ডাকবেতা, হাঁপানী রোগ, ভালবাসার গোপনীয় কাজ হাট বসানোসহ বিভিন্ন রোগের কাজ করেন শাহ নেওয়াজ বৈদ্য।
গত শনিবার (৩ জানুযারি) সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁশের বেড়া ও টিনের ছাউনীযুক্ত একটি রুমে বসে শাহ নেওয়াজ বৈদ্য বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা রোগিদের চিকিৎসা করেন। পাশে তার পাকা বাড়ি। ভবন নির্মাণের সময় কাটা হয়েছে টিলা। পরিচয় গোপন রেখে আমরা কয়েকজন সংবাদকর্মী একটি শিশুকে রোগি সাজিয়ে বৈদ্যের কাছে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়। ২০ টাকা ফি নিয়ে ওই শিশুর সম্পর্কে শাহ নেওয়াজ বৈদ্য নিজের মনগড়া বিভিন্ন কথাবার্তা বলেন। শেষকথা শিশুটিকে জিনে ধরেছে, চিকিৎসা করতে ২১ হাজার টাকা লাগবে। এ সময় বৈদ্যের সহকারী মো. আলম নামে এক ব্যক্তি একটি কাগজে টাকার সাথে কি কি জিনিসপত্র লাগবে সেটাও লিখে দেন। ওই শিশুর চিকিৎসা পরে করাবো বলে আমরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করি।

কবিরাজি চিকিৎসার নামে প্রতারণার শিকার বেশ কয়েকজন জানান, আমরা শাহ নেওয়াজ বৈদ্যের ব্যাপারে নানা কথা শুনেছি। তার দেওয়া ঝাড় ফু, পানি পড়াতে নাকি অনেক জটিল কাজ সমাধান হয়। তাই এসেছিলাম এই ভুয়া কবিরাজের কাছে। কিন্তু আমাদের কোনো কাজই হয়নি। বরং আমাদের অনেক টাকা ক্ষতিসাধন হয়েছে। আমরা এই ভুয়া কবিরাজের উপযুক্ত শাস্তি দাবি করছি।
পরিচয় গোপন রেখে কবিরাজের মূল দালাল হিসেবে পরিচিত মো. আলমের সাথে কথা বললে জানান, গত সাত বছর ধরে এক ‘অজানা শক্তির আশীর্বাদে’ শাহ নেওয়াজ বৈদ্য বাড়িতে বসেই এই ধরনের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। তার দাবি অনুযায়ী, শুধু ‘ফুঁ’ দিয়েই নাকি জটিল ও কঠিন রোগ ভালো করা সম্ভব। কবিরাজ চিকিৎসার জন্য কোনো অর্থ নেন না। রোগিরা স্বেচ্ছায় যা দেন, তাই গ্রহণ করা হয়। তবে চিকিৎসার ব্যাপারে হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত দাবির ব্যাপারে প্রশ্ন করলে কোনো সদোত্তর দিতে পারেননি।
ঘটনাস্থল ত্যাগের পর সংবাদকর্মী পরিচয় দিয়ে মুঠোফোনে শাহ নেওয়াজ বৈদ্যের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার চিকিৎসা নিয়ে একাধিক প্রতারণার অভিযোগসহ বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়। তবে এক পর্যায়ে তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
Lohagaranews24 Your Trusted News Partner