Home | ব্রেকিং নিউজ | রেললাইনে যেভাবে চলে এলো বন্যহাতি

রেললাইনে যেভাবে চলে এলো বন্যহাতি

এলনিউজ২৪ডটকম: লোহাগাড়ায় চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে ব্যারিয়ার না থাকা অংশ দিয়ে রেললাইনের উপর চলে আসে একটি বন্যহাতি। একই হাতি রেললাইন থেকে নেমে পেছনে গিয়ে ট্রেনের বগিতে ধাক্কা দেয়। ট্রেন চলে যাবার পরে হাতিটি আন্ডারপাসের র‌্যালিং ভেঙে পূর্বপাশে সংরক্ষিত বনের দিকে চলে যায়। এতে কেউ হতাহত না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ট্রেনের বগি। মঙ্গলবার (২২ জুলাই) রাত সাড়ে ১০টার দিকে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের রেঞ্জ কার্যালয়ের পাশে আন্ডারপাস এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

জানা যায়, কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামি সৈকত এক্সপ্রেস ঘটনাস্থলে পৌঁছলে রেললাইনের উপর বন্যহাতি দেখতে পান ট্রেনচালক। জরুরি ব্রেক চেপে ট্রেনটি থামানো হয়। ঘন ঘন হুইসেল দেয়ার পর বন্যহাতিটি রেললাইন থেকে নেমে যায়। এর কিছুক্ষণ পর ট্রেনের মাঝখানে একটি বগিতে গিয়ে একাধিকবার ধাক্কা দেয় বন্যহাতিটি। ট্রেনের লোকোমাষ্টার (ট্রেনচালক) ছিলেন আবদুল আউয়াল ও গার্ড (পরিচালক) সাখাওয়াত হোসেন।

বুধবার (২৩ জুলাই) বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, অভয়ারণ্য রেঞ্জ কার্যালয়ের ৫০০ মিটার উত্তরে রেললাইনের পশ্চিম পাশে ব্যারিয়ার নেই। হাতিটি ওই জায়গা দিয়ে রেললাইনে চলে আসে। হাতিটি রেললাইনের উভয় পাশে বিচরণ করার পায়ের চিহ্ন দেখা গেছে। ট্রেন যাত্রীদের শোরচিৎকারে বন্যহাতিটি রাগান্বিত হয়ে বাগিতে ধাক্কা দেয়। বাগিতে ধাক্কা দেয়ার স্থানের পাশে আন্ডারপাস আর উভয় পাশে ব্যারিয়ার ছিল। ফলে বন্যহাতিটি আন্ডারপাসের র‌্যালিং ভেঙে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তবে ওই স্থান দিয়ে বন্যহাতি পুণরায় বন্যহাতি রেললাইনে আসার আশংকা করা হচ্ছে।

ট্রেনচালক আবদুল আউয়াল গণমাধ্যমকে জানান, রাত ৮টায় সৈকত এক্সপ্রেস কক্সবাজার থেকে ছাড়ার নির্ধারিত সময় ছিল। কিন্তু ৫০ মিনিট বিলম্বে ছাড়া হয়। যাত্রী ছিলেন প্রায় ৫০০ জন। ওই এলাকায় ট্রেনের গতি ছিল ২০ কিলোমিটার। ট্রেন হারবাং-লোহাগাড়া সেকশনের চুনতি অভয়ারণ্য এলাকায় পৌঁছলে রেললাইনের উপর একটি বন্যহাতি চোখে পড়ে। সাথে সাথে ট্রেন থামানোর জন্য ব্রেক চাপতে থাকেন। এক পর্যায়ে জরুরি ব্রেকে চাপলে ট্রেন থেমে যায়। হাতি যেখানে অবস্থান করছিল, তার ঠিক আগে গিয়ে ট্রেন থামে। এরপর ঘন ঘন হুইসেল দিলে হাতি নিচে নেমে যায়। কিছুক্ষণ পর ট্রেনের গার্ড সাখাওয়াত হোসেন ফোনে জানান একটি হাতি ট্রেনের বগিতে ধাক্কা দিচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে ট্রেন চালিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করি। এই রেলপথে আগেও ট্রেনের ধাক্কায় হাতি মারা গিয়েছিল। আবার একই ধরনের ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত কিছু হয়নি। পরবর্তী সময়ে আবার ঘটতে পারে। তাই এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, হাতির ক্ষতি না হয়, সেজন্য পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

ট্রেনের গার্ডের দায়িত্বে থাকা সাখাওয়াত হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, হঠাৎ ট্রেন থেমে যায়। সাথে সাথে ট্রেনচালক ফোন করে জানান রেললাইনের উপর হাতি আছে। তাই সতর্কতা হিসেবে তার (গার্ডের) বগির ডান পাশের দরজা বন্ধ করে দেন। এরপর বাম পাশের দরজায় দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছিলেন। হুট করে একটি হাতি ছুটে এসে বগিতে ধাক্কা দেয়। দ্রুত বাম পাশের দরজা বন্ধ করে দিই। কিন্তু হাতি ক্রমাগত দরজা ও বগিতে আঘাত করতে থাকে। এ সময় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে। ট্রেনচালককে ফোন দিয়ে দ্রুত ট্রেন ছাড়তে বলি। এরপর কোনো রকম পার হয়েছি। অনেক বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছি। বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো। শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি। হাতিও রক্ষা পেয়েছে। মানুষেরও কিছু হয়নি।

রিদওয়ান সাইমুন নামে ওই ট্রেনের এক যাত্রী জানান, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে এলাকায় হঠাৎ ট্রেনটি থেমে যায়। ট্রেন থেমে যাওয়ার পর যাত্রীরা রেললাইনের পশ্চিম পাশে ব্যারিয়ারের ভেতর একটি হাতি দেখতে পান। তখন হাতিটি রেললাইনের নিচে ছিল। যাত্রীদের অনেকে হাতি দেখে আতঙ্কে চিৎকার করতে থাকেন। পরে হাতিটি কাছে এসে ট্রেনের বগিতে ধাক্কা দিতে থাকে।

চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা গাজী বাহার উদ্দিন জানান, অভয়ারণ্য রেঞ্জ কার্যালয়ের উত্তর পাশে রেললাইনের উভয় পাশে থাকা ব্যারিয়ারের ভেতর হাতির পায়ের ছাপ দেখা গেছে। রেঞ্জ কার্যালয়ের ৫০০ মিটার উত্তরে রেললাইনে ব্যারিয়ার নেই। সম্ভবত হাতিটি ওই এলাকা দিয়ে ঢুকে রেললাইনের উভয় পাশে বিচরণ করে। চালক দূর থেকে হাতি দেখতে পেয়ে গতি আরও কমিয়ে দেন। হাতির কাছাকাছি এসে ট্রেন থামাতে সক্ষম হন চালক। পরে রেললাইনের পশ্চিম পাশে নেমে কিছুটা দক্ষিণে চলে আসে। এরপর হাতিটি ট্রেনের বগিতে ধাক্কা দেয়। ট্রেন ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর হাতিটি রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয় লাগোয়া উত্তর পাশে আন্ডারপাসের লোহার রেলিং ভেঙে পূর্ব দিকে চলে যায়।

বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ কর্মকর্তা নুর জাহান জানান, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের ১০ কিলোমিটার অংশজুড়ে রয়েছে রেললাইন। যারমধ্যে মাত্র ৪ কিলোমিটার অংশে রেললাইনের উভয় পাশে ব্যারিয়ার নির্মাণ করা হবে। ব্যারিয়ার নির্মাণ কাজ এখনো চলমান। অভয়ারণ্যের পুরো অংশে উভয় পাশে ব্যারিয়ার নির্মাণ করা না হলে যেকোনো সময় বন্যপ্রাণী রেললাইনের চলে আসতে পারে। এতে প্রতিনিয়ত দূর্ঘটনা ঘটনার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া আন্ডারপাসের লোহার এঙ্গেল ভেঙে বন্যহাতি পার হয়ে চলে যাওয়া অংশে শক্ত বেষ্টনি নির্মাণ করতে হবে। কারণ বন্যহাতি চিনে যাওয়া পথ দিয়ে বার বার চলাফেরা করার চেষ্টা করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!