Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | মাতামুহুরী ট্র্যাজেডি : ৫ শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ চকরিয়া

মাতামুহুরী ট্র্যাজেডি : ৫ শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ চকরিয়া

COX-HOME-5

নিউজ ডেক্স : মাতামুহুরী ট্র্যাজেডিতে একসঙ্গে চকরিয়া গ্রামার স্কুলের পাঁচ শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে চকরিয়াসহ পুরো কক্সবাজার জেলা। একসঙ্গে এত সংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান সকল ধর্ম–বর্ণের মানুষ। গত দুইদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এই মাতামুহুরী ট্র্যাজেডি। সকলকে নাড়া দেওয়া এই ট্র্যাজেডির মতো ঘটনায় যেন আর কোন মায়ের বুক খালি না হয় সে জন্য অভিভাবকসহ সকলকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। একই সঙ্গে পৌরশহরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের মাঠকে খেলার উপযোগী করে তুলতে সংশ্লিষ্টদের কাছেও দাবি তুলেছেন সচেতন মহল। মূলত এসব খেলার মাঠ বেদখল, পানি জমে থাকাসহ নানা সমস্যায় পতিত থাকায় দুরন্তপনা কিশোর শিক্ষার্থীরা মাতামুহুরী নদীর তীরে চলে যায় খেলতে। এজন্য বার বার দুর্ঘটনায় প্রাণ যাচ্ছে কোমলমতি শিশুদের। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য খেলার মাঠগুলো সহসা সংস্কার করে খেলার উপযোগী করে তোলা খুবই জরুরি বলেও মনে করছে বিজ্ঞজনেরা।

এদিকে বুকের ধন হারিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এসব শিক্ষার্থীদের বাবা–মাসহ পরিবার সদস্যরা। তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শোকে মুহ্যমান পৌরশহরের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসাইন, চকরিয়া গ্রামার স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম ও সহকারী শিক্ষিকা জলি ভট্টাচার্য্যকে প্রাইভেট হাসপাতালে ভতি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

মাতামুহুরীর তীরে স্মরণকালের জানাজা : গতকাল রবিবার সকাল এগারটার দিকে পাঁচ শিক্ষার্থীর মধ্যে চার শিক্ষার্থীর নামাজে জানাজা একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে মাতামুহুরী নদীর চরে। জানাজায় অংশ নিতে বানের স্রোতের মতো শোকাহত মানুষের ঢল নামে মাতামুহুরী নদীর চরে। ইতোপূর্বে মাতামুহুরীর চরে কারো জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার নজির না থাকলেও একসঙ্গে এসব শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল নদীর চরে। জানাজায় ইমামতি করেন চিরিঙ্গা বাস স্টেশন জামে মসজিদের খতিব মাওলানা কফিল উদ্দিন ফারুকী।

জানাজায় শোকসন্তপ্ত পরিবার সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদন জানিয়ে বক্তব্য দেন এমপি মোহাম্মদ ইলিয়াছ, চকরিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ জাফর আলম, চকরিয়া পৌরসভার মেয়র আলমগীর চৌধুরীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। অপরদিকে তুর্ণ ভট্টাচার্য্যের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় কঙবাজার সদরের সরকারী মহিলা কলেজের কাছে গ্রামের বাড়িতে। সেখানে তুর্ণের শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন হয় কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানে।

চকরিয়া থানার ওসি মো. বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী জানান, নিখোঁজ থাকা পাঁচ শিক্ষার্থীর মধ্যে শনিবার রাত আটটা পর্যন্ত স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় উদ্ধার করা হয় তিনজনের লাশ। বাকী দুইজনের লাশ না পাওয়ায় চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি দল এনে নদীতে ব্যাপকভাবে তল্লাশি চালানো হয়। এদিন রাত এগারটা এবং বারোটার দিকে নিখোঁজ থাকার দুইজনের লাশ উদ্ধার করার পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

চকরিয়া গ্রামার স্কুলে তিনদিনের শোক ঘোষণা এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অঘোষিত ছুটি : চকরিয়া গ্রামার স্কুলের পাঁচ মেধাবী শিক্ষার্থীর একসঙ্গে মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত বিদ্যালয় পরিচালনা পর্যদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকবৃন্দ। এসব শিক্ষার্থীর রুহের মাগফেরাত কামনায় আজ সোমবার বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরদিন মঙ্গলবার থেকে তিনদিনের শোক দিবস ঘোষণা করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এই তিনদিনে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি প্রফেসর মো. রুহুল আমিন এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক হারুণুর রশিদ দৈনিক আজাদীকে জানান, একসঙ্গে পাঁচ মেধাবী শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। এজন্য তিনদিনের শোকদিবস পালন করা হবে বিদ্যালয়ে।

আজ সোমবার বন্ধ থাকবে বিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম। মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সকালে কোরআনখানি ও মিলাদ মাহফিল, কালো ব্যাজ ধারণ, কালো পতাকা উত্তোলন, স্কুলের পতাকা অর্ধনমিতকরণসহ নানা কর্মসূচি রয়েছে তিনদিনের শোকদিবসে।

এছাড়া তিনদিন পর্যন্ত দুটি করে ক্লাস বন্ধ থাকবে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনায়। এছাড়াও পাঁচ শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে গ্রামার স্কুল ছাড়াও চকরিয়া সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় ও চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গতকাল কোন ক্লাস হয়নি।

জেলা প্রশাসকের শোক প্রস্তাব এবং পরিবারের প্রতি সমবেদনা : গতকাল রবিবার জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মাসিক সভায় সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, গত শনিবার চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীতে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একসঙ্গে পাঁচজন মেধাবী শিক্ষার্থীর মৃত্যু খুবই বেদনাদায়ক। এজন্য সকলেরই সাঁতার জানা খুবই জরুরি। এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বণ এবং সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। পরে তিনি নিহতদের স্মরণে সভায় একটি শোক প্রস্তাব করেন এবং নিহতদের আত্মার সদগতি কামনা শেষে তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

চকরিয়া পৌরসভার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ খেলার অনুপযোগী নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান দৈনিক আজাদীকে বলেন, বিভিন্ন বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের কি অবস্থা তা সরজমিন দেখা হবে। এর পর এসব খেলার মাঠকে খেলার উপযোগী করে তুলতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। যাতে আর কোন শিক্ষার্থী মাতামুহুরী নদীর তীরে খেলতে না যায়। একইসঙ্গে অভিভাবকসহ সকলকে এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন হতে হবে। যেন কোন শিশু বা কিশোর মাতামুহুরীর চরে খেলতে না যায় এবং নদীতে স্নান করতে না নামে।’

উল্লেখ্য, গত শনিবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে চকরিয়া গ্রামার স্কুলের পাঁচ শিক্ষার্থী মাতামুহুরী নদীতে গোসল করতে গিয়ে মৃত্যু হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*