ব্রেকিং নিউজ
Home | উন্মুক্ত পাতা | দায়বদ্ধতা থেকেই রাজনীতিতে এসেছি : রিজিয়া রেজা চৌধুরী

দায়বদ্ধতা থেকেই রাজনীতিতে এসেছি : রিজিয়া রেজা চৌধুরী

223

নিউজ ডেক্স : রিজিয়া রেজা চৌধুরী, মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সাবেক সদস্য মুমিনুল হক চৌধুরীর এই মেয়ে আলোচনায় এসেছেন ক্ষমতাসীন দলের ওই পদটি পাওয়ার পর।

জামায়াত নেতা বাবার পরিচয় ছাপিয়ে রিজিয়া এখন সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আবু রেজা নেজামুদ্দিন নদভীর স্ত্রী।

গত জুলাই মাসে মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মনোনীত হন রিজিয়া রেজা। বাবার পরিচয়ের কারণে তার এই শীর্ষ পদ পাওয়া নিয়ে দলে ও বাইরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

অবশ্য কেন্দ্রীয় নেতা নির্বাচিত হওয়ার আগে রিজিয়া রেজা চৌধুরী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাপক সমালোচনার মুখে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

সম্প্রতি রিজিয়া রেজা মুখোমুখি হয়েছিলেন পরিবর্তন ডটকম’র। কথা বলেন, দলে নতুন আগতদের কাউয়া বা হাইব্রিড বিতর্ক নিয়ে। আলোচনায় উঠে আসে বাবা এবং শ্বশুর পরিবারের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কসহ নানা বিষয়।

আওয়ামী লীগে আসা প্রসঙ্গে রিজিয়া রেজা বলেন, মহিলা আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভানেত্রী সাফিয়া খাতুন আমাদের পার্শ্ববর্তী চকরিয়া থেকে নারী কোটায় সংসদ সদস্য। উনি ওখানে কাজ করেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে ওনাকে সহযোগিতা করছি, আমার স্বামীর নির্বাচনী এলাকায় মহিলাদের আওয়ামী লীগ ও নৌকার পক্ষে সংগঠিত করেছি, এতে করে ওনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয়।

তিনি বলেন, একবার সাফিয়া আপা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় আমাকে নিয়ে যান। সেখানে তিনি আমাকে দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন- উনি এমপির স্ত্রী। আমাদের সঙ্গে কাজ করতে চান, মহিলা আওয়ামী লীগ করতে চান। তখন প্রধানমন্ত্রী ওনাকে বললেন- যেহেতু কাজ করছেন, আর ওনি যেহেতু আওয়ামী লীগ এমপির স্ত্রী। আওয়ামী লীগ এমপির স্ত্রী হয়ে উনি জামায়াত করবেন নাকি, উনাকে একটা পোস্ট দিয়ে দেন। এরপর সাফিয়া আপা একবার চকরিয়া যাওয়ার সময় আমি সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় ১০-১২টি মহিলা পথসভা করেছিলাম, যেখানে সাতকানিয়া লোহাগাড়ায় পুরুষ নেতারাও এত বেশি লোক সমাগম করতে পারে না, সেখানে আমি পেরেছি।

রিজিয়া রেজা বলেন, উনিসহ কেন্দ্রীয় আরও নেত্রীরা এতে অভিভূত হয়েছিলেন, এর ফলশ্রুতিতে আপা আমার কথা নেত্রীকে (প্রধানমন্ত্রী) বলেছিলেন। এরপর চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা মহিলা লীগের সম্মেলনে আমাকে এক নাম্বার সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেখানে আমাকে আরও কাজ করার সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল, সেখানে মুষ্টিমেয় কিছু লোক আমার বিরোধিতা করা শুরু করলেন। অথচ পদ পাওয়ার আগে সবার সঙ্গে কাজ করেছি, তখন কোনো সমস্যা হয়নি। পদ পাওয়ার পর উল্টা-পাল্টা বলা হয়েছে, পেপারে লেখালেখি হয়েছে, যখন সব নেতার সঙ্গে আমি কর্মসূচি পালন করেছি, তখন কেউ কিছু বলেনি, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত এলাকায় নৌকার পক্ষে মহিলাদের সংগঠিত করেছি। মিডিয়ার মাধ্যমে জানলাম আমাকে দক্ষিণ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

রিজিয়া রেজা বলেন, আমাকে নিয়ে অনেক লেখালেখি হলো, পেপারে লিখা হলো ‘মহিলা আওয়ামী লীগ থেকে এমপির স্ত্রী বাদ’। এসব লেখাগুলো নিয়ে আবার নেত্রীর ( প্রধানমন্ত্রীর) সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, ওনাকে বললাম আমি কিছু না হতে পারি, কিন্তু এমপির তো মান সম্মান আছে, ওনার স্ত্রীকে বাদ দিলে এলাকায় নেতাকর্মীদের অনেকের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। নেত্রীকে বললাম এমপির স্ত্রী হিসেবে আমাকে মাঠে থাকতে হচ্ছে, পদ না থাকলে কিভাবে কাজ করব, আমি কাজ করতে চাচ্ছি, তখন নেত্রী সেখানে থাকা চট্টগ্রামের মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী হাসিনা মান্নান আপাকে বললেন- যারা বাদ গেছে তাদের নাম লিখে দিয়ে যান, এরপর আমাকে মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ঘোষণা করা হয়।

জামায়াত নেতার কন্যা হয়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যের স্ত্রী, এখন নিজেই আওয়ামী লীগ নেত্রী, এটা কিভাবে সম্ভব হলো- এমন প্রশ্নের উত্তরে রিজিয়া রেজা বলেন, ১৯৯৩ সালে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার বিয়ে হয়, বাবার পরিবারে থাকার সময় রাজনীতি বুঝার বয়স হয়নি। শ্বশুর বাড়িতে আসার পর এটা ছিল মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, আমার ভাসুরের সঙ্গে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত হওয়ায় আমার শ্বশুর পরিবার অনেক ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের রাজনীতি করতো। আমার স্বামী রাজনীতিতে আসার পর তাকে সহযোগিতা করার জন্য মহিলাদের সংগঠিত করতে থাকি। আমাদের এলাকার মহিলারা ধর্ম পরায়ণ। তাদের বুঝানো হতো আওয়ামী লীগ মানে নাস্তিক। নারীদের মধ্যে দলের ভিত ও স্বামীর সমর্থন জোরালো করার প্রয়োজনে আওয়ামী লীগে সম্পৃক্ত হই। স্বামীর সঙ্গে বিভিন্ন প্রোগ্রামে গিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে দেখি, উনাকে দেখে উনার আদর্শ দেখে রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ হই।

আপনার স্বামীও এক সময় জামায়াত সংশ্লিষ্ট ছিলেন, উনিও দল পাল্টে আওয়ামী লীগে এসেছেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার স্বামী ‘আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশন’ করে সারাদেশে জনসেবা করেছেন, তখন জামায়াতের কয়েকজন নেতার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক হয়। বায়তুশ শরফের সাবেক পীর মাওলানা আবদুল জাব্বার সাহেবের আগ্রহের কারণে চট্টগ্রামে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এটা কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। সেখানেও আমার স্বামীকে ঠকানো হয়েছে। তিনি ২০০০ সালের নির্বাচনে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় জামায়াতের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার চেষ্টা করেছিলেন।

প্রশ্ন রেখে রিজিয়া রেজা বলেন, আমি মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্ম, ১৯৮০ সালে আমার জন্ম, আওয়ামী লীগ অনেক বড় দল, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে, দেশ স্বাধীন করেছে, এর সুফল সবাই ভোগ করছে। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে দলে যোগ দিতে আগ্রহী হলে আওয়ামী লীগ কি ফেলে দিতে পারবে?

তিনি বলেন, আমাদের এলাকার ধর্ম পরায়ণ মহিলাদের বুঝানো হয়েছে, নৌকায় ভোট দিলে ঈমান থাকবে না, মুসলমানিত্ব থাকবে না, আমরা মহিলাদের বলেছি নৌকা রহমতের প্রতীক, নূহ নবী নৌকার সাহায্যে মানুষকে রক্ষা করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী একজন আলেমের ও ভালো মানুষের হাতে নৌকা তুলে দিয়েছেন, নৌকা নিয়ে তিনি কোনো খারাপ কাজ করবেন না, আমাদের এই বুঝানোতে কাজ হচ্ছে, অনেকে এখন জামায়াত-শিবিরের এসব কথা আর বিশ্বাস করেন না।

মহিলা লীগের এই নেত্রী বলেন, রাজনীতি নিয়ে অনেক আগ থেকে আমার বাবার পরিবারের সঙ্গে কিছুটা টানাপড়েন চলছে, এটা স্বাভাবিক। আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের এত দূরত্ব ছিল না, এখন অনেক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। একটা পরিবারে কেউ আওয়ামী লীগ, কেউ বিএনপি, কেউ জামায়াত করতেই পারে। রাজনীতি নিয়ে আমার বাবার সঙ্গে কখনও তেমন কথা হয়নি।

তিনি বলেন, আমার বাবাকেও জামায়াত ঠকিয়েছে, বাবাকে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া থেকে বাঁশখালীতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো, আমরা সাতকানিয়ার মানুষ হওয়া সত্ত্বেও এখানকার জামায়াত নেতারা আমার বাবাকে কোনো প্রোগ্রামে আসতে দিত না, পরে তারা এখান থেকে এমপি হলো, যেটা আমার বাবা হতে পারতেন।

আপনারা আওয়ামী লীগের সুসময়ে দলে এসেছেন, কেউ কেউ আপনাদের হাইব্রিড অথবা কাউয়া বলেন, এগুলো শুনতে কেমন লাগে? এই প্রশ্নের উত্তরে রিজিয়া রেজা বলেন, আওয়ামী লীগ অনেক বড় দল, এখানে অনেক রকম লোক থাকে, প্রতিযোগী থাকে, তারা বিভিন্ন রকম কথা বলবে, এসব শব্দ নিয়ে ভাবি না, আমরা কাজ করে যাচ্ছি, সবার সহযোগিতা পাচ্ছি, তৃণমূল থেকে শুরু করে জেলা এবং কেন্দ্রীয়ভাবেও সবার সহযোগিতা পাচ্ছি। দলের নীতি নির্ধারকরা আমাদের অনুপ্রাণিত করছেন কাজ করার জন্য, না হলে কি কাজ করতে পারতাম?

তিনি বলেন, তৃণমূল থেকে সহযোগিতা না পেলে তো কাজ করার জন্য উদ্ধুদ্ব হতাম না, পদ পাওয়ার পর এখন কথা হচ্ছে। কাজকর্মের মাধ্যমে যদি আমার স্বামী জনপ্রিয়তা না পেতেন তাহলে এসব নিয়ে কথা হতো না।

রিজিয়া রেজা বলেন, শুধুমাত্র কাজ করতে গিয়ে রাজনীতিতে জড়িয়ে গেছি, স্বামীকে সহযোগিতা করতে গিয়ে এখানে চলে এসেছি। নেত্রী আমার স্বামীকে বিশ্বাস করে নৌকা প্রতীক দিয়েছেন, আমাদের প্রতি এক বড় অবদান রেখেছেন, সবচেয়ে সম্মানিত হয়েছি। আমরা লাল পাসপোর্ট পেয়েছি, ভিআইপি মর্যাদা পাচ্ছি, লোকজন আমাদের সম্মান করছে। এসব তো নেত্রীর কারণে, দলের কারণে। মূলতঃ দায়বদ্ধতা থেকেই রাজনীতি এসেছি।

তিনি বলেন, কয়েক হাজার লোক জড়ো করে ওয়াজ মাহফিলে আমার স্বামীর ওপর আক্রমণ করে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। তখন সেখানে আমার ১৪ বছরের সন্তানও ছিল, আল্লাহ রক্ষা করেছেন। এরপর নেত্রীর সঙ্গে সংসদ ভবনে সপরিবারে দেখা করি, তিনি অনেক আন্তরিকতা দিয়ে আমাদের কথা শুনেছেন, আমার সন্তানকে কোলে তুলে নিয়েছেন, এসব কারণে তো ওনার কাছে দায়বদ্ধ হয়ে পড়েছি, কৃতজ্ঞতাবোধ আছে।

তিনি বলেন, আমরা এখন মানুষকে বুঝাচ্ছি স্বাধীনতার বিষয়গুলো, বঙ্গবন্ধুর বিষয়গুলো। অনেকে বুঝতেছেন, আগে যারা আওয়ামী লীগের প্রতি বিদ্বেষ মনোভাব পোষণ করতেন তারাও এখন আওয়ামী লীগের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন, আমরা ফল পাচ্ছি, মানুষ বুঝতেছে।

তিনি আরও বলেন, আগে যা থাকুক না কেন, এখন আমি আওয়ামী লীগের লোক। জামায়াত-শিবিরের প্রতি আমার দলের যে মনোভাব, আমারও একই মনোভাব।

রিজিয়া রেজা ব্যক্তিগত জীবনে দুই কন্যা ও এক ছেলে সন্তানের জননী। স্বামীর প্রতিষ্ঠিত আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

এছাড়া আল হেলাল আদর্শ ডিগ্রি কলেজ ও লোহাগাড়ার পুটিবিলা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন রিজিয়া রেজা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*