Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | ডিসির দরজা সবার জন্য খোলা রেখেছি : ইলিয়াস হোসেন

ডিসির দরজা সবার জন্য খোলা রেখেছি : ইলিয়াস হোসেন

image_printপ্রিন্ট করুন

নিউজ ডেক্স : সবার জন্য সব সময় সেবার দরজা খোলা রেখে দায়িত্ব পালন করার কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রামের বিদায়ী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন।  দুই বছর দশ মাস চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বাংলানিউজের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি এসব কথা জানান।

মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, দায়িত্ব নিয়েই সংশ্লিষ্টদের ডেকে বলেছিলাম- ডিসির দরজা যেন সবার জন্য খোলা থাকে। একজন ভিক্ষুকও যেন আমার সঙ্গে দেখা করতে পারে। আমি যতই ব্যস্ত থাকি- কাউকে যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে না হয়।

কেউ বলতে পারবেন না, আমার কাছে এসে সেবা না নিয়ে ফিরে গেছেন। দাফতরিক ফাইল দেখার পাশাপাশি আমি সবার কথা শুনেছি। নিয়মের মধ্যে প্রতিকার দেওয়ার চেষ্টা করেছি। জনসেবায় জনপ্রশাসন- এই নীতি মেনে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে সবাইকে সেবা দিয়েছি।

তিনি বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, লাল ফিতার দৌরাত্ম- এসব বন্ধ করতে নানান উদ্যোগ নিয়েছি। স্মার্ট আর্মস লাইসেন্স, স্মার্ট ডিলিং লাইসেন্স চালু করেছি। ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পাওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল করেছি। ফাইল আটকে রাখার দিনকে বিদায় দিয়েছি।

দিনরাত কাজ করেছি, মানুষের পাশে থেকেছি 

মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, করোনার শুরুতে মানুষ ঘরবন্দি থাকায় নিম্ন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত এবং দিনমজুররা কষ্টে পড়ে যান। চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের অভাব দেখা দেয়। করোনার কারণে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। সংক্রমণ ঠেকাতে আমরা সবার ঘরে ঘরে ত্রাণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিই। প্রায় ১ লাখ পরিবারকে বাড়িতেই ত্রাণ দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, অনেকে ত্রাণের জন্য রাত ১২টায় ফোন দিয়েছেন। কেউ পরিচয় গোপন রেখে ত্রাণ সহায়তা চেয়েছেন। কাউকে ফিরিয়ে দিইনি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম চালু করেছি। সারাদিন সেখানে ত্রাণ চেয়ে যত ফোন আসতো- রাতে আমাদের কর্মকর্তারা ফোনে দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী সেখানে ত্রাণ দিয়ে আসতেন।

মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, প্রবাসীদের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা, আক্রান্তদের ঘরে রাখা কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। ইউএনও, এসিল্যান্ড, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে সবার সহায়তায় সেটি নিশ্চিত করে।  

তিনি বলেন, করোনাকালে কাজ করতে গিয়ে নিজে আক্রান্ত হয়েছি। আমাদের অনেক সহকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। তবে আমরা সরকারি দায়িত্ব পালনে পিছ পা হইনি। এক সেকেন্ডের জন্য জেলা প্রশাসনের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। দিনরাত কাজ করেছি। মানুষের পাশে থেকেছি। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।

হ-য-ব-র-ল স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফিরেছে

মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর চট্টগ্রামে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা, আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা, আইসোলেশন সেন্টার স্থাপন, স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফেরানো নিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়। তবে সবার সহযোগিতায় আমরা করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছি।

তিনি বলেন, করোনা সংক্রমণ শুরুর পর বেসরকারি হাসপাতালে রোগী ভর্তি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই হাসপাতাল থেকে ওই হাসপাতালে ছুটেও রোগী ভর্তি করানো যায়নি। স্বাস্থ্যখাতে হ-য-ব-র-ল দেখা দেয়। তবে প্রশাসনের শক্ত অবস্থানের কারণে সেখানে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। বেসরকারি হাসপাতালে রোগী ভর্তি শুরু হয়। সব তথ্য নিয়ে আমরা ‘হসপিটাল ফাইন্ডার’ চালু করি।

মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, আমরা উদ্যোগ নিয়ে রাজনীতিক, শিল্পপতি থেকে শুরু করে সবার সহযোগিতায় করোনা রোগীদের জন্য আইসোলেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা, হাই ফ্লো নেজাল ক্যানোলা সংগ্রহ, পর্যাপ্ত অক্সিজিন সিলিন্ডার সরবরাহের ব্যবস্থা করেছি। শুরুর দিকে যেখানে ১টি হাই ফ্লো নেজাল ক্যানোলার জন্য হাহাকার ছিলো- সেখানে এখন ৩০০টির বেশি ক্যানোলা আছে চট্টগ্রামে।  

তিনি বলেন, জরুরি ওষুধ এবং অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম নিয়ে যে নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়ে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সেটি নিয়ন্ত্রণে এনেছি আমরা। চট্টগ্রামে এখন কোথাও ওষুধ আর অক্সিজেন সরবরাহে ঘাটতি নেই। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

পাহাড় ধস হয়েছে, মানুষ মারা যায়নি

মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, পাহাড় আর সাগরে ঘেরা চট্টগ্রামে প্রতিবছর পাহাড়ধসে প্রাণহানীর ঘটনা ঘটত। দায়িত্ব নেওয়ার পর সেদিকে বিশেষ নজর দিই। সব পাহাড়ে একযোগে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিছু পাহাড় ব্যক্তি মালিকানার হওয়ায় সেখানে ফের বসতি গড়ে উঠলেও বর্ষায় তাদের সরিয়ে দিই আমরা।

তিনি বলেন, বৃষ্টি হলেই পাহাড়ে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাঠিয়ে লোকজনকে সরিয়ে নিয়েছি। তাদের জন্য সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র চালু করেছি। তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। এতে মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে পেরেছে। ফলে বর্ষায় বৃষ্টিতে পাহাড় ধস হলেও গত কয়েকবছরে কেউ মারা যায়নি।  

হত্যার হুমকি পেয়েছি, অভিযান বন্ধ করিনি

মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় একটা কমিটমেন্ট ছিলো। কর্ণফুলী নদী রক্ষায় দুই তীরে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা। এ কাজে বরাদ্দ চেয়ে কয়েকবার চিঠি দিয়েও সাড়া পাইনি। দখলদারদের কাছ থেকে হত্যার হুমকি পেয়েছি। তবে কমিটমেন্ট থেকে সরে আসিনি। কর্ণফুলীর দুই তীরে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে প্রায় ১০ একর জায়গা দখলমুক্ত করেছি।

তিনি বলেন, বন্দর আইন অনুযায়ী কর্ণফুলী নদীর দায়িত্ব চট্টগ্রাম বন্দরের। উচ্চ আদালতের নির্দেশে বাকি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ বন্দর কর্তৃপক্ষ করবে। আমরা সাহস নিয়ে শুরু করেছি। আশা করি- তারা এর শেষ করবে। কর্ণফুলীর সব অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে কর্ণফুলীকে দখলমুক্ত করবে।

প্রাথমিকে সুবিধা বেড়েছে শিক্ষার্থীদের 

মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, শিশুরা আগামীর কর্ণধার। তাদের সুশিক্ষিত করার বিকল্প নেই। এ জন্য জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন শুরু করি। শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে নিজে ক্লাস নিয়েছি। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ তৈরি করে দিয়েছি। শিক্ষা উপকরণ দিয়েছি। মিড ডে মিলের ব্যবস্থা করেছি। এখন প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের সুবিধা বেড়েছে। অভিভাবকরা সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে উৎসাহী হচ্ছেন।

হালদা নদী এখন বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ

মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, দেশের অন্যসব নদীর চেয়ে হালদা আলাদা। তাই হালদার মা মাছ রক্ষায় আমরা নানা উদ্যোগ নিই। হালদা থেকে ১৮টি বালুমহাল উচ্ছেদ করা হয়।  সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হালদায় এ বছর রেকর্ড মা মাছের ডিম পাওয়া গেছে। হালদাকে বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ ঘোষণা করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে হালদা মা মাছের স্বর্গরাজ্য হবে।  

বদলে যাবে চট্টগ্রাম, ভালো লাগবে দেখে

মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামকে দুই হাত ভরে দিয়েছেন। এখানে বঙ্গবন্ধু টানেল হচ্ছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হচ্ছে। সিটি আউটার রিং রোড় হচ্ছে। লিংক রোড় হচ্ছে। বে-টার্মিনাল হচ্ছে। ৬ লেনের সড়ক হচ্ছে। মিরসরাইয়ে দেশের সবচেয়ে বড় ইকোনমিক জোন হচ্ছে। এসব প্রকল্পে বদলে যাবে চট্টগ্রাম।

তিনি বলেন, কয়েক বছর পর আকাশপথে চট্টগ্রাম এলে বিমানবন্দর থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ২০ মিনিটে সার্কিট হাউজে আসতে পারবো। সড়ক পথে শহরের যানজট মাড়িয়ে সিটি আউটার রিং রোড় দিয়ে সাগর পাড়ে গাড়ি ড্রাইভ করে টানেল দিয়ে দ্রুত কক্সবাজারে যেতে পারবো।  

তখন চট্টগ্রামের বদলে যাওয়া এই দৃশ্য দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হবো আমি। প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে ভূমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে নানান কাজে সম্পৃক্ত থেকে এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করতে পারায় আমার ভালো লাগার পরিমাণটা বেশি থাকবে। অন্যরকম সুখ পাবো।

চ্যালেঞ্জ ছিলো, মোকাবিলা করেছি

মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, চট্টগ্রামে একটি মহানগরের পাশাপাশি ১৫টি উপজেলা আছে। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের সবচেয়ে বড় বন্দর। চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেক সমৃদ্ধ। সরকারের একাধিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চলছে এখানে। তাই স্বাভাবিকভাবেই চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করা চ্যালেঞ্জের ছিলো।

তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকের রুটিন কাজের বাইরে গত কয়েক বছরে অনেক সেনসিটিভ বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কমাতে কাজ করতে হয়েছে। সব কাজ করেছি। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি। বাংলানিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!