ব্রেকিং নিউজ
Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | চমেকে ২০ শয্যার বিপরীতে অর্ধশতাধিক রোগী

চমেকে ২০ শয্যার বিপরীতে অর্ধশতাধিক রোগী

cd1a7390c4afc928bd32eb751c02bcfc-59a4f0d24eb63

নিউজ ডেক্স : নানা সংকটে জর্জরিত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগ। ওয়ার্ডে প্রায় সময় নির্দিষ্ট শয্যার তুলনায় রোগী থাকে পাঁচ গুণ বেশি। অপরদিকে বিপুল সংখ্যক রোগীর জন্য চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র তিনজন। চিকিৎসকরা বলছেন, এই বিভাগে পুরুষ রোগীর জন্য নির্ধারিত শয্যা রয়েছে ১৫টি। এছাড়া মহিলা রোগীর জন্য রয়েছে ৫টি শয্যা। বিপরীতে প্রায় সময় ৬০–৮০ জন রোগী ভর্তি থাকে। ফলে প্রায় এসব রোগীকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয় চিকিৎসকদের।

সংশ্লিষ্টদের অভিমত, বিশ্বজুড়ে মানসিক রোগের চিকিৎসা এগিয়ে গেলেও চমেক হাসপাতাল এখনো সেই পুরনো বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ওয়ার্ডে রোগীদের ওষুধ দেয়ার পাশাপাশি ডিপ্রেশন এবং অ্যাংজাইটি ডিসর্ডারে ভোগা রোগীদের সাইকোথেরাপি ছাড়াও অনেক রোগীকে অকোপেশননাল থেরাপি দিতে হয়। হাসপাতালে অকোপেশনাল থেরাপিস্ট ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের কোনো পদ নেই। এছাড়া সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার এবং প্রশিক্ষিত নার্সও নেই। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ড হওয়া সত্ত্বেও মানসিক রোগ বিভাগের রোগীরা অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করছেন। অপরদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে এই বিভাগে উচ্চ শিক্ষার কোনো কোর্স চালু নেই। তাই তৈরি হচ্ছে না নতুন চিকিৎসক। চিকিৎসকদের দাবি, মানুষ যতই আধুনিক হচ্ছে, মানুষের মধ্যে ডিপ্রেশন, রাগ–ক্রোধ এসব বাড়ছে। সঠিক সময়ে চিকিৎসার অভাবে অনেকেই আত্মহত্যা করছেন আবার অনেকই বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অপরাধের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছেন। তবে কোর্স চালু করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে জানান মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ।

চমেক হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগে সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে গাদাগাদি করে রোগীরা শুয়ে আছেন। কেউবা চিৎকার করছেন আবার কেউ গলা ছেড়ে গান গাইছেন। রোগীর স্বজনরা জানান, রাতের বেলায় অনেক সময় রোগীরা চিৎকার চেঁচামেচি করে। কিন্তু ওই সময় ওয়ার্ডে কোনো ডাক্তার থাকে না। এতে প্রায় সময় অন্য রোগীদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। ফলে তারাও ওয়ার্ডে হট্টগোল করে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, রাতের বেলা কল দেয়ার পর ডাক্তার আসার কথা থাকলেও বেশির ভাগ সময় ডাক্তার আসেন না। এছাড়া ওয়ার্ডে বাথরুমগুলোর অবস্থা চরম শোচনীয়। দুর্গন্ধের জন্য ব্যবহার করা যায় না।

চমেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, মানসিক রোগ বিভাগের সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত এখানে নেই কোনো অধ্যাপকের পদ। এছাড়া গত ৫ বছর ধরে সহকারী অধ্যাপকের একমাত্রটি পদটিও খালি পড়ে আছে। বর্তমানে একজন সহযোগী অধ্যাপক, একজন মেডিকেল অফিসার এবং একজন সহকারী রেজিস্ট্রার দিয়েই চলছে বিভাগের কার্যক্রম। চিকিৎসকদের দাবি, দিনদিন বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। সেই তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা একেবারে অপ্রতুল। আবার মানসিক রোগীদের চিকিৎসা পদ্ধতিও অন্যরোগীদের চেয়ে আলাদা। তাদের ম্যানেজ করা খুবই কঠিন। বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা পদ্ধতির আধুনিকায়ন হলেও হাসপাতালের চিকিৎসা পদ্ধতি এখনো সনাতন যুগে রয়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে শনাক্ত মানসিক রোগীদের মধ্যে যারা অবসেশন, অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারে ভুগছেন তাদেরকে সাইকোথেরাপি দিলেই অনেক সময় ভালো উপকার পাওয়া যায়। একজন লোকের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে এর প্রভাবে সমাজ ও পরিবারে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় নানা ধরনের কুসংস্কার ও গোঁড়ামি আচরণ বিদ্যমান। মানসিক রোগীকে জিন–ভূতের আচর লেগেছে মনে করে অনেকেই কবিরাজ, বৈদ্যসহ বিভিন্ন হুজুর–ফকিরদের দ্বারস্থ হন। তাদের কাছে গিয়ে যথেষ্ট সময়ক্ষেপণ করার পরে শেষ মুহূর্তে ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসেন। অন্যদিকে আবার মানসিক রোগীকে সমাজে পাগল বলে আখ্যায়িত করা হয়। তাই অনেকেই সমাজে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে ভেবে ডাক্তারের কাছে যেতে চান না। অথচ প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসকের শরনাপন্ন হলে প্রতিটি রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবী জুড়ে প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছে। জনস্বাস্থ্য বলতে জনসাধারণের কেবল মাত্র শারীরিক স্বাস্থ্যকেই বোঝায় না, বরং শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সমান গুরুত্ব বহন করে। মানসিক রোগের চিকিৎসা করার পাশাপাশি মানসিক রোগ যাতে সৃষ্টি না হয় সেজন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থ গ্রহণ করতে হবে। আর এজন্য বর্তমানের শক্তিশালী প্রচার মাধ্যমগুলোর দ্বারা ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। স্কুল, কলেজ, এমনকি উচ্চ শিক্ষিত লোকেদের মধ্যেও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টিতে কাজ করতে হবে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, একজন মানসিক রোগীকে হাসপাতালের চিকিৎসা ছাড়াও সাইকোথেরাপি দিতে হয়। এজন্য হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মানিসক স্বাস্থ্য কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে যুগ যতই আধুনিক হচ্ছে মানুষের মধ্যে বিষণ্নতা ও বিভিন্ন অ্যাংজাইটি ভর করছে। তাই এখন থেকে আমাদের এসব বিষয় মাথায় রাখা উচিত।

চমেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, আত্মমর্যাদাবান, অন্যের প্রতি আস্থাবোধ, দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি, গভীর অনুভুতি, অন্যকে ক্ষমা করে দেওয়ার শক্তিসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্যের বৈশিষ্ট্য। অপরদিকে চরিত্রে এসব বৈশিষ্ট্যের অনুপস্থিতিতে একজন মানুষের ভিতের ধীরে ধীরে মানসিক সমস্যা তৈরি করে। অন্যদিকে বর্তমানে শিশু–কিশোরদের মধ্যেও মানসিক রোগ তৈরির ক্ষেত্র বেড়েছে বহুগুণ। ইন্টারনেন্ট ভিত্তিক বিভিন্ন গেমস, শারীরিক পুষ্টিজনিত অভাব এবং বংশগত কারণেও শিশু–কিশোররাট মানসিক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। অপরদিকে ইন্টারনেটের এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার এর কারণে তৈরি মানসিক অবসাদ থেকে রূপ নিতে পারে মারাত্মক মানসিক ব্যধিকে। এতে তারা আংশিক ও সম্পূর্ণ মানসিক রোগীতে পরিণত হতে পারে। এছাড়া প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন কারণে মানসিক রোগী তৈরি হতে পারে। নারীদের গর্ভাবস্থা ও প্রসবের পর নারীদের হরমোন সংক্রান্ত কারণসহ বিভিন্ন কারণে অনেক সময় মানসিক সংকট দেখা দেয়। তা থেকে জন্ম নেয় মানসিক রোগ। অপরদিকে মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি উচ্চবিত্ত পরিবারের লোক হলে তাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখা হয়। এছাড়া মধ্যবিত্ত–নিম্নবিত্ত পরিবারের কেউ মানিসক রোগে আক্রান্ত হলে তাকে কবিরাজ–বৈদ্য ও হুজুরের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে চলে ঝাঁড়–ফুঁকের চিকিৎসা। অথচ বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি গ্রহণ করে যদি তারা প্রথমদিকেই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতেন অনেক রোগী করুণ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতেন।

জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মহীউদ্দিন এ. সিকদার দৈনিক আজাদীকে বলেন, মানসিক রোগীদের নিয়ে সমাজে বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার রয়েছে। অথচ বর্তমানে চিকিৎসা ব্যবসা আগের চেয়ে অনেক আধুনিক হয়েছে। কিন্তু সমাজে একজন মানসিক রোগীকে শুরুতেই ‘পাগল’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এছাড়া এই রোগীর উপর জ্বিন–ভুতের নজর লেগেছে বলে প্রথমদিকে তারা হুজুর ও কবিরাজের কাছে ছুটে যান। একদম শেষ মুহূর্তে রোগীর অবস্থার খারাপের দিকে যাওয়ার আগে একটা সময় মেডিকেলে আসেন রোগীর স্বজনরা। ওয়ার্ডের সমস্যা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুরুষ–মহিলার জন্য ওয়ার্ডে সিট রয়েছে মাত্র ২০টি। অথচ প্রায় সময় ৬০–৮০ জন রোগী ভর্তি থাকে। এই বিশাল সংখ্যক রোগীর জন্য চিকিৎসক আছেন মাত্র তিনজন। আবার এসব রোগীকে ম্যানেজ করাটাও অনেক কষ্টসাধ্য। বিভাগে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট নাই। অকোপেশনাল থেরাপিস্টও দরকার। তবে সম্প্রতি একটি এনজিও সংস্থার থেকে খণ্ডকালীন একজন থেরাপিস্ট কাজ করছেন। এছাড়া সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার এবং সাইকিয়াট্রিক স্পেশাল নার্সের প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে আমরা ১২ জন রোগীকে সপ্তাহে দুইবার করে ইলেক্ট্রোকনভালসিভ থেরাপি (ইটিসি) দিয়ে থাকি। এই থেরাপি এখানে অনেক সাশ্রয় মূল্যে দেয়া হয়। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, বর্তমানে পুরো দেশে মনরোগ বিশেষজ্ঞের সংকট রয়েছে। মানসিক রোগের ডাক্তারদের আয় উপার্জনও কম। তাই এ বিভাগ থেকে উচ্চ শিক্ষা নিতে চান না অনেক চিকিৎসক। আবার সমাজে মানসিক রোগের ডাক্তাদের পাগলের ডাক্তারও বলা হয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্য অধ্যাপক ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, মানসিক রোগ বিভাগে শুরু থেকেই অধ্যাপকের পদ ছিলো না। এছাড়া সহকারী অধ্যাপকের পদটিও শুণ্য। বর্তমানে পুরো দেশেই মানসিক রোগের চিকিৎক সংকট রয়েছে। এছাড়া আমাদের মেডিকেলে সাইকিয়াট্রিতে উচ্চ শিক্ষার কোনো সুযোগ নেই। তাই এখান থেকে চিকিৎসকও তৈরি হচ্ছে না। তবে এখানে উচ্চ শিক্ষার কোর্স চালু করতে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।

জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জালাল উদ্দিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, মানসিক রোগ বিভাগের সকল সমস্যার ব্যাপারে আমি অবগত আছি। আসলে পুরো হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে জনবল সংকট রয়েছে। তবে আমি মানসিক রোগ বিভাগে জন্য আলাদাভাবে স্টাডি করেছি। এখানে চিকিৎসক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজিস্ট এবং প্রশিক্ষিত নার্সের সংকট সমাধানে আমি কাজ করছি। ইতোমধ্যে আমি ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করেছি। এতো বিশাল হাসপাতালে চতুর্থ শ্রেণির মধ্যে কর্মচারীর সংখ্যা অপ্রতুল। অনেকদিন ধরে সরকারীভাবে কর্মচারী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। ঠিকাদারদের মাধ্যমে যারা কাজ করছেন তারা আবার কাজের প্রতি আন্তরিক নয়। তাই অনেক সময় ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালের বাথরুমসহ অনন্য আঙিনা রোগীদের প্রত্যাশামাফিক পরিষ্কার রাখতে পারছি না। –আজাদী প্রতিবেদন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*