ব্রেকিং নিউজ
Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | গ্যাং কালচার নতুন করে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে জনমনে

গ্যাং কালচার নতুন করে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে জনমনে

kisor-696x398

নিউজ ডেক্স : চট্টগ্রামে এতকাল কিশোরদের গ্যাঙের অস্তিত্বের কথা জানা যায়নি। দু দল কিশোরের দ্বন্দ্ব, প্রচণ্ড গতিতে মোটর সাইকেল চালানো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফ্রি ওয়াইফাই জোনে বসে ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি ছাড়া তেমন কোনো উৎপাতের খবর ছিল না আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে।

গত ১৬ জানুয়ারি নগরীর জামালখান এলাকায় কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনান ইসফারের খুনের তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে নতুন তথ্য। জানা যায়, গ্যাং কালচারে অভ্যস্ত কিশোরদের অনেকেই জড়িয়ে পড়েছে খুনোখুনির ঘটনা এবং রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’দের প্রশ্রয়ই তাদের এমন বেপরোয়া করে তুলেছে। এ বড় ভাইয়েরা কখনো ধরা পড়ে না। কোনো ঘটনার পর কিছুদিন বড় ভাইদের নিয়ে শোরগোল শোনা যায়, পরে অন্য কোনো খবরের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। এ সুযোগে বড় ভাইয়েরা নতুন করে আবারো গ্যাং কালচারে টেনে নতুন করে গ্রুপ গঠন করে দেন।

ইতোপূর্বে ঢাকায় এ ধরনের স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের গ্যাং কালচারের খবর জানাজানি হয়েছিল। উত্তরার ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবীর খুন হয়। খবরটি নিয়ে চাঞ্চল্যের ফাঁকেই তেজকুনি পাড়ায় খুন হয় ১৬ বছরের কিশোর আজিজুল হক। আশঙ্কার বিষয় হলো, ঢাকায় গ্যাং কালচারের নেপথ্যে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার বিষয়টি পায়নি পুলিশ। কিন্তু চট্টগ্রামে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গ্যাং কালচার পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে।

চট্টগ্রামে এ গ্যাং কালচারকে অশনি সংকেত বলেই মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. অনুপম সেন। তিনি পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে এর প্রধান কারণ বলে মন্তব্য করেছেন। পাশাপাশি কিশোর মনের কৌতূহলকে পুঁজি করে তাদের অন্ধকার পথে টেনে নিয়ে যাওয়ার নেপথ্যের কারিগর ‘বড় ভাই’দের আইনের হাতে নিয়ে আসতে আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তাগণ বলছেন, এ সংকট মোচনে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়তে হবে। পুলিশকে যেমন শক্ত হাতে মোকাবেলা করতে হবে, একইভাবে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন অটুট রাখার কাজটিও করতে হবে।

গত ১৬ জানুয়ারি আদনান খুনের ঘটনার পর কিশোর গ্যাঙের এই উপস্থিতি নতুন করে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করেছে। কিশোর–তরুণদের জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়া নিয়ে দেশজুড়ে যখন ব্যাপক আলোচনা, তার মধ্যেই গ্যাং কালচার নতুন করে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে জনমনে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ সম্পর্কে ইতোমধ্যেই তাঁর উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে। তিনি বলেছেন, কিশোর অপরাধ রোধে আইন সংস্কার ও নীতিমালা প্রণয়নের কথাও সরকার চিন্তা করছে।

আদনান খুনের ঘটনার পর নগরীতে গ্যাংগুলো সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, গ্যাঙের সদস্যরা মূলত কিশোর। এদের মদ্যে অনেকেই নামী স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থী। মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, পাড়া–মহল্লায় দাপট দেখানো তাদের প্রথম দিককার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এসব থেকে স্বাভাবিকভাবেই মারামারি। প্রথমে ছোটখাটো, তারপর ক্রমান্বয়ে ভয়ংকর। ভয়ংকর পর্যায়ের অশুভ সূচনা আদনানের হত্যার মধ্য দিয়ে হলো বলে মনে করছে আইন–শৃঙ্খলাবাহিনীর কর্মকর্তাগণও।

আদনান খুনের তদন্তকারী টিমের দুজন কর্মকর্তা কাছে নিজেদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তারা জানান, এসব গ্রুপের লিড দেয় এলাকার ‘বড় ভাইয়েরা’। এদের কাজ নিজ এলাকার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আধিপত্য ধরে রাখা। অনেকেরই অভিযোগ, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ১৪ থেকে ১৮ বছরের কিশোররা ভয়ংকর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এসব অপরাধের বলী হয়েছে আদনান। আদনান ইসফার হত্যায় জড়িত আরমান, সাব্বির, মুনতাসির, মহিম ও আবু সাঈদকে গ্রেপ্তারের পর এখন পর্যন্ত গণি বেকারি, চকবাজার, মহসিন কলেজ, চন্দনপুরাকেন্দ্রিক তিনজন বড় ভাইয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে। এরা হলেন জিলহাজ, এনাম ও বোরহান। এদের পেছনে আছে চন্দনপুরার রউফ। একইভাবে নিহত আদনান ও তার বন্ধুরা জামালখান এলাকায় সাব্বির নামে অন্য এক বড় ভাইয়ের ছায়ায় চলাফেরা করত বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। তবে এ দুটি গ্রুপ শুধু নয়, নগরীর ৪১ টি ওয়ার্ডেই অন্তত শতাধিক গ্রুপের সন্ধান আছে পুলিশের কাছে। শুধু নন্দনকানন, জামালখান, আন্দরকিল্লা, চকবাজার, কলেজ রোড, দেওয়ানবাজার, দেওয়ানজী পুকুর পাড় ও চন্দনপুরায় ১২টি গ্রুপের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ, যারা গত এক বছরে অন্তত বিশটি ঘটনা ঘটিয়েছে। সামান্য কথা কাটাকাটিতে একজন অন্যজনকে মোবাইলে ফোন দেয়। মুহূর্তের মধ্যে সদলবলে হাজির হয়। এরপর চলে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, গাড়ি ভাংচুর এমনকি দোকানপাট ভাংচুর। কোনো এক জায়গায় বসা নিয়ে কথিত বড় ভাইদের সঙ্গে ছোট ভাইদের কথা কাটাকাটি থেকেও ঘটে যায় বড় ধরনের সংঘর্ষ। তারা ফুটপাতে রাতে বিকট শব্দে আতশবাজি ফাটিয়ে জন্মদিন উদযাপন করে।

গতকাল শুক্রবার বিকালে জামালখান এলাকায় এ ধরনের একটি গ্রুপের এক সদস্যের সঙ্গে কথা হয়। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরেই তার কাছে আদনান খুনের ঘটনা ও গ্যাং কালচার সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। নগরীর একটি নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া এ শিক্ষার্থী জানায়, লাইফটা এনজয় করি আসলে। হ্যাঁ, ভাইয়ারা ডাকলে মিছিলে যাই। ভাইয়ারাও আদর করে। সাথে রাখে মাঝেমধ্যে।

বাকি খাওয়া বা খেয়ে বিল না দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বলে, অনেকে করে, আমি করি না। কারণ আব্বুর কাছে চাইলেই পাই। টাকার দরকার নাই। আমি উল্টা খাওয়াই।

হঠাৎ চোখ পড়ে তার হাতে থাকা মোবাইল ফোন সেটটির দিকে। ৬৫ হাজার টাকা দাম সেটির। আদনান খুনের ব্যাপারে জানতে চাইলে বলে, টিট ফর ট্যাট। আগে তারা হিট করেছে, এরপর ওরা। ব্যাড লাক, মারা গেছে। গ্রুপের লিডারের নাম জিজ্ঞেস করা মাত্র সে বলে, পরে কথা হবে। এরপর চলে যায়।

সিএমপির অতিরিক্ত উপ–কমিশনার শাহ মোহাম্মদ আবদুর রউফ বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, এসব গ্রুপ গড়ে ওঠার পেছনে শুধু পুলিশকে দায়ী করাটা অবিচার হবে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ক্লাস এইট, নাইন, টেনণ্ডএসময় শিক্ষার্থীরা অতি আবেগী হয়ে ওঠে। কৌতূহলটাও তাদের বেশি থাকে। পাশাপাশি বিদ্রোহী মনোবৃত্তিটাও কাজ করে। পারিবারিকভাবে তাকে গাইড করাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি হয়ে পড়ে। যেমন ওই ৫ জন আদনান খুনের ঘটনায় ধরা পড়েছে। তাদের মধ্যে মইনের বাবা দীর্ঘদিন বিদেশে ছিল। মাঝখানে দেশে ফেরত আসেন। এখন আবার বিদেশে চলে গেছেন। অভিভাবক বলতে তার মা। সাব্বিরের বাবা অসুস্থ। তার বোন তাদের সাথে থাকে। দুলাভাইয়ের টাকায় সংসার চলে। মুনতাসিরের বাবার সাতকানিয়ায় ওয়ার্কশপ আছে। দুই সপ্তাহ পরপর তিনি আসেন। আরমানের বাবার মুদির দোকান আছে। সকালে গিয়ে রাতে বাসায় ফিরেন। অর্থাৎ এই ছেলেগুলোকে গাইড করার কেউ নেই। একইভাবে নিহত আদনান এখানে তা মা ও বোনের সাথে থাকত। তার বাবা খাগড়াছড়িতে কর্মরত। এদের কথাই শুধু বলছি কেন, এই যে ঢাকায় জঙ্গি আস্তানায় চট্টগ্রামের কাজেম আলী স্কুলের ছাত্র নাসিফের লাশ পাওয়া গেল, তার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, পারিবারিক বন্ধন শিথিলতা একটা বড় কারণ। আর এরা যখন পলিটিক্যাল শেল্টার পায়, তখন আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পারিবারিক অনুশাসন বাড়াতেই হবে। সামাজিক অনুশাসনটাও জরুরি।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো একটি ঘটনা ঘটার পর গ্রুপের দুই–একজন ধরা পড়লেও বড় ভাইয়েরা আড়ালে থাকে। রাজনৈতিক তদ্বিরের কারণে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে না। তার সুযোগে তারা নতুন করে গ্রুপ গঠন করে। বড় ভাইয়েরা প্রকাশ্যেই চলাফেরা করে। শুধু তাই নয়, ওই বড় ভাইয়েরা নিজেদের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে নতুন গ্রুপ গঠন করতে প্রয়োজন হবে এমন দুই একজনকেও বাঁচিয়ে নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়ী হারুণ খুন, ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত খুন, বন্ধুর হাতে নৃশংসভাবে ইমন খুন এবং সর্বশেষ আদনান খুনের ঘটনায় বড় ভাইয়েরা আড়ালেই রয়ে গেছে।

পুলিশের বিরুদ্ধে আনীত এ অভিযোগ অস্বীকার করেন এডিসি আবদুর রউফ। তিনি বলেন, হারুন মার্ডারের ১০ আসামি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আছে। তাই চাইলেও তাদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না। সুদীপ্ত মার্ডারে যাদের নাম এসেছে তাদের কেউ কেউ এখনো ধরা পড়েনি। কিন্তু ধরা পড়বে। তবে যে বড় ভাইয়ের কথা বলা হচ্ছে তার সংশ্লিষ্টতা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ইমন মার্ডারে তার বন্ধু অমিত মুহুরীসহ কয়েকজন ধরা পড়েছে। এখানেও বড় ভাই যে, তার ঘটনায় কারো কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। আদনান মার্ডারে বড় ভাই হিসেবে রউফের কথা যদি বলেন, সে অন্য অনেক ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে, মামলাও হতে পারে। কিন্তু এ ঘটনায় যদি তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া না যায়, তবে তো তাকে ধরতে পারি না।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক গ্রুপগুলো একটা চেইন হিসেবে থাকে। যেমন গ্রেপ্তারকৃত মইন, সাইদরা বড় ভাই মানে শাব্বির, বোরহান, হিলহাজকে। তারা মানে মহসিন কলেজের এনামকে। তাদের উপরে আছে রউফ। তার উপরেও থাকতে পারে। এখন ঘটনায় ছোট ভাইদের যারা সাহায্য করতে গিয়ে ঘটনা ঘটিয়েছে সেই পাঁচ বড় ভাই ধরা পড়েছে। তাদের উপরে থাকা জিলহাজকে ধরতে অভিযান চলছে। অস্ত্রদাতা এনামকেও গ্রেপ্তার করা হবে। এখন পর্যন্ত এটুকুই লিংক পাওয়া গেছে। এর পরের জন এ ঘটনায় না থাকলে যতই তাদের শেল্টার দিক, তাকে তো আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। আর রাজনৈতিক চাপ যদি বলেন, আমি আমার কথা বলতে পারি, আদনান খুনের ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব আমার হাতে ছিল। চাপ এলে আমার ওপর আসত। এমন কোনো চাপ আসেনি।

-আজাদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*