ব্রেকিং নিউজ
Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | কর্ণফুলী নদী দখলদারদের দৌরাত্ম্যে অনেকটাই অস্তিত্ব সংকটে

কর্ণফুলী নদী দখলদারদের দৌরাত্ম্যে অনেকটাই অস্তিত্ব সংকটে

66100_Sc

নিউজ ডেক্স : এক সময়ের ভরা যৌবনা বাংলাদেশ-ভারতের আন্তঃসীমান্ত নদী কর্ণফুলী এখন দখলদারদের দৌরাত্ম্যে অনেকটাই অস্তিত্ব সংকটে। কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যে ভয়াবহ দূষণ ও পলি পড়ে ভরাট হয়ে এমনিতেই বিপন্ন প্রাণপ্রবাহ নদী কর্ণফুলী। সেই সঙ্গে চলছে অবৈধ দখলের প্রতিযোগিতা। তীরজুড়ে বিস্তীর্ণ ভূ-সম্পত্তির মালিক চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তাই বন্দরের লাইটারেজ জেটির ঘাট ও জায়গাগুলো প্রতিনিয়ত নদীর বুকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

নাব্যতা ও গতিপথ রক্ষায় নদী শাসন, নিয়মিত ড্রেজিং ও দূষণরোধ জরুরি হলেও দীর্ঘদিন ধরে তা উপেক্ষা করা হচ্ছে। বরং জমির দাম বাড়ার সাথে সাথে চলছে ভরাট ও দখলের প্রতিযোগিতা। বন্দরের মূল্যবান জমি ইজারার আড়ালে হাতছাড়া করা হয়েছে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে। নেপথ্যে বিপুল অঙ্কের অর্থ অবৈধ লেনদেনেরও অভিযোগ রয়েছে।

কর্ণফুলীকে দখল ও দূষণমুক্ত রাখতে তিনদিনব্যাপী সাম্পান খেলা ও চাঁটগাইয়া সংস্কৃতি মেলার শেষদিনে বক্তারা এসব অভিযোগ করেন। তারা কর্ণফুলী নদী রক্ষায় হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নের দাবিও জানান।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক সংস্কৃতি একাডেমির আয়োজনে ও কর্ণফুলী নদী সাম্পান মাঝি কল্যাণ সমিতি ফেডারেশনের সহযোগিতায় ব্যাতিক্রমী এ র‌্যালিতে প্রায় তিন শতাধিক নৌকা অংশগ্রহণ করে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মাসুদ উল হাসান বলেন, কর্ণফুলী নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। এ দেশকে বিশ্ববাসী চিনে নদীমাতৃক দেশ হিসেবে। কর্ণফুলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীটি দখল ও দুষণ মুক্ত করতে আরো সক্রিয় হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে আহবান জানান। এছাড়া কর্ণফুলী দখল-দূষণের নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রতিরোধ করতে সিএমপি পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

কর্ণফুলী নদীর উভয় তীরের ত্রিশটি ঘাটে এবং নদীর তীরস্থ জনবসতি ঘিরে আলোচনা, নাচ, গানের মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীকে স্বচ্ছ রাখতে নদী ব্যবহারকারীদের সচেতন করতেই প্রতি বছরের ন্যায় ৩ দিনের এই অনুষ্ঠান আয়োজন করেন কর্ণফুলী নদী সাম্পান মাঝি কল্যান সমিতি ফেডারেশনের তত্ত্ববধানে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক সংস্কৃতি একাডেমি।

সরেজমিনে কর্নফুলি তীর ঘুরে দেখা যায়, কল কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ও নগরবাসীর বিভিন্ন বর্জ্য খাল ও নর্দমা দিয়ে সরাসরি মিশে যাচ্ছে নদীর পানিতে। এতে পানি ক্রমেই হয়ে উঠছে বিষাক্ত। হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী।

অন্যদিকে সরকারি দলের বিভিন্ন সংগঠনের দাপট দেখিয়ে এবং প্রভাবশালীদের নাম ব্যবহার করে যথেচ্ছভাবে রাতারাতি সারি সারি বাড়ি-ঘর বানিয়ে কর্ণফুলীর তীরভূমি বেদখল করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এর পেছনে তৎপর রয়েছে একটি ভূমিদস্যু চক্র। কথিত সমিতির নামে চলে প্লট বেচাকেনা। প্লটের ব্যবসায় অপরিকল্পিত বালি তোলার কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এদিকে নতুন ব্রিজ সংলগ্ন নতুন ফিশারিঘাট এলাকায় দেখা যায় মাটি ভরাটের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে স্ক্যাবেটর। দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের অন্যতম চলাচলের পথে প্রায় প্রতিদিনই চোখে পড়ে এক দুইটি স্ক্যাবেটর।

এ নিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, এগুলো দিনের বেলায় অচল অবস্থায় পড়ে থাকে, রাতের গভীরে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে বিভিন্ন স্থানের বর্জ্য ও মাটি এনে স্ক্যাবেটরের সাহায্যে নদীর তীর ভরাট করতে ব্যবহৃত হয়।

এছাড়া ওই এলাকায় রাতের আধারে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান আর সমিতির নামেও নদী ভরাটের মহোৎসব চলে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এমনিতেই নদীর তীর দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন ফিশারি ঘাট। তাদের দাবি অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ পুরোপুরি বন্ধ করা না হলে কর্ণফুলীর নাব্যতা হ্রাস রোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক সংস্কৃতি একাডেমি চেয়ারম্যান আলীউর রহমান বলেন, প্রায় দেড় যুগ আগে জাপানের সহায়তায় নির্মিত চট্টগ্রামের মৎস্য বন্দরটি বন্ধ করে একটি কুচক্র মহল তাদের স্বার্থের জন্য নদীর তীর দখল করে নতুন ফিশারিঘাট নির্মিত করেছে।

তিনি দখল ও দুষণমুক্ত রেখে পরিকল্পিত একটি ফিশারিঘাট নির্মাণে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তিনি বলেন, আজ একটি নদী রক্ষার জন্য শত শত সাম্পান মাঝিরা নিজেদের দৈনন্দিন কার্যক্রম বন্ধ করে একত্রিত হয়েছে। কর্ণফুলী সঠিক শাসন করতে বন্দর কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন মনে করেন তিনি।

কর্ণফুলী নদী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বলেন, একটি নদীর প্রতি একটি দেশের এত অবহেলা বিশ্বের আর কোন দেশে আছে কিনা আমার জানা নেই।

আনাড়ি অজ্ঞ একটা কোম্পানিকে ড্রেজিংয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো তারা আরো বেশি ক্ষতি করেছে। কর্ণফুলী নদী আরো ছোট করে তারা পালিয়ে গেছে। এরপরও কর্ণফুলী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে এই শ্লোগান এখন বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠছে।

বন্দর, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টরা একটু আন্তরিক হলেই দখল ও দুষণ মুক্তের হাত থেকে কর্ণফুলী রক্ষা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। তিনি ক্ষুদ্ধ সুরে জেলা প্রশাসন ও বন্দরের কাছে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও কর্ণফুলী নদী দখল মুক্ত হচ্ছে না কেন? তিনি আগামী এক মাসের মধ্যে হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানান নতুবা লাগাতার আন্দোলনে যাবার ঘোষণা দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*