
নিউজ ডেক্স: রাজধানীর পল্লবী এলাকায় একটি বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা ফিরোজা খানম জোছনার (৬৮) রক্তাক্ত লাশ উদ্ধারের পর হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা হাতুড়ি, ওড়না আগেই আলামত হিসেবে সংগ্রহ করা হয়েছে।তবে নিহতের হাতে মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় চুল পাওয়ার ঘটনায় হত্যাকাণ্ডটি ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।
গত শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) দুপুরে পল্লবী থানাধীন ডি-ব্লকের ৮ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর ভবনের বাসা থেকে জোছনার লাশটি উদ্ধার করা হয়।


সাবলেট ভাড়াটিয়া মুন্সি রাজু আহমেদ জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি মাগুরা সদরের বেরোইল ইউনিয়নের বেরোইল পলিতায়। গত বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে গ্রামে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি পরিবারসহ গাবতলী যান। সেখানে বাস না পেয়ে কল্যাণপুর থেকে হানিফ পরিবহনের একটি বাসে চড়ে সকাল পৌনে সাতটার দিকে মাগুরার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। গত শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টায় তারা ঢাকায় ফেরেন।
মুন্সি রাজু আরও জানান, তিনি ঢাকা ফেরার পথে জোছনা হত্যাকাণ্ডের খবর পান। তাকে তার পাশের বাসার একজন ফোন করে খবরটি জানান। তিনি বলেন, আমি প্রথমে বিশ্বাস করতে পারি নাই যে জোছনা আপা মারা গেছে। পরে বাসায় গিয়া দেখি পুলিশ। কে বা কারা এই খুন করলো, কেন খুন করলো কিছুই বুঝতে পারতেসি না।
তিনি আরও বলেন, আমি মুদি দোকান করি। জোছনা আপা কখনও আমার কাছ থেকে বাকি খান নাই। সকালে কিছু নিলে বিকালে টাকা পরিশোধ কইরা দিছেন। নিজেই নিজের রান্না কইরা খাইতেন।
তদন্তের স্বার্থে পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আল আমিন তার মাগুরা যাতায়াতের টিকিট নিয়ে গেছে বলেও বাংলানিউজকে জানিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া, জোছনা কোন স্কুলে পড়াতেন, কোথায় কোথায় টিউশনি করতেন জানতে চাইলে মুন্সি রাজু ‘জানেন না’ বলে জানান।
ওই ভবনের দারোয়ান আব্দুল মান্নান জানান, তিনি ২০১০ সাল থেকে সেখানে কাজ করছেন। গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে তিনি জোছনাকে ঘরে ফিরতে দেখেন। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত তার কক্ষের দরজা বন্ধ ছিল। পরে দরজা খোলা অবস্থায় পাওয়া গেলে ভেতরে গিয়ে তিনি মেঝেতে জোছনার রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান এবং পুলিশকে খবর দেন।
আব্দুল মান্নান বলেন, শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত জোছনা ম্যাডাম নিজের ঘর থেইকা বাইর হন নাই। উনি উনার ফ্ল্যাটে নতুন সাবলেট দেওয়ার জন্য ভাড়ার নোটিশ দিসিলেন। একজন ভাড়াটিয়া আইসা ঘর দেখার লাইগা উনার নম্বরে বারবার কল দিতাসিলেন। কিন্তু জোছনা ম্যাডাম কল ধরতাসিলেন না। পরে বিষয়টা দেখার জন্য যায়া দেখি ফ্ল্যাটের দরজা খোলা। তারপর উনার রুমে গিয়া দেখি লাশ পইড়া আছে। এরপর পুলিশরে খবর দেওয়া হইসে।
জানা গেছে, ২০২০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত হলি ক্রিসেন্ট আইডিয়াল স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন জোছনা। এরপর তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। স্কুলটির প্রধান শিক্ষক মো. জাবেদ আলীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বাংলানিউজকে বলেন, চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর উনার সঙ্গে কখনও দেখা হলে বলতেন মিরপুর এক নম্বরের একটি কলেজে শিক্ষকতা করেন। আবার কখনও বলতেন কোচিংয়ে পড়াতেন। মিরপুর-১১ ও সাগুফতা এলাকায় তাদের বাড়ি আছে। উনার স্বামী একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ছিলেন ও তার ছেলে-মেয়ে ক্যাডেটে পড়ে বলে জানতাম। যদিও তাদের কখনও দেখিনি, বাড়ির ঠিকানাও জানতাম না।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী পুলিশ সদস্য ও তদন্ত সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে এটি একটি হত্যাকাণ্ড বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। জোছনাকে পাশবিক কায়দায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হাতুড়ি দিয়ে তার মাথার বাঁ পাশ ও মাঝে আঘাত করে থেঁতলে ফেলা হয়েছে। মুখে ও থুতনিতেও একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মরদেহের পাশে রক্তমাখা হাতুড়ি, ওড়না এবং গলায় চিকন রশির মতো একটি ফিতা দেখা গেছে যেটি রক্তে ভিজে গাঢ় হয়ে গিয়েছিল। এগুলো আলামত হিসেবে সংগ্রহ করা হয়েছে।
তারা আরও জানান, প্রাথমিক তদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে বিকেলে ফিরোজা খানমের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তের সময় নিহতের হাতের মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় কিছু চুল পাওয়া যায়, যা নিয়ে তদন্তে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। চুলগুলো ঘাতকের কিনা, সেটি নিশ্চিত হতে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভবনের কয়েকজন বাসিন্দা ও সাবলেট ভাড়াটিয়ার চুলের নমুনাও সংগ্রহ করেছে সিআইডির ফরেনসিক টিম ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া, আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ ও আশপাশের লোকজনের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
নিহত জোছনার ভাই মো. ফিরোজ আলম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়ের করেছেন। এজাহারে তিনি উল্লেখে করেছেন, শুক্রবার সকালে বাসার দারোয়ান আব্দুল মান্নান জোছনার মোবাইল নম্বর থেকে তার ছোটভাই সামসুল আলমকে ফোন করে ঘটনাটি জানান। পরে তারা পরিবারের লোকজন নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন।
ফিরোজ আলম জানান, জোছনার সঙ্গে বিগত ৪০ বছর ধরে যোগাযোগ ছিল না। কে বা কারা তার শত্রু ছিল জানা নেই। এলাকায় ভালো মানুষ হিসেবে তার সুনাম ছিল। সবাই তাকে ভালো জানতো।
পল্লবী থানা পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি। তবে নিহতের হাতে পাওয়া চুল নিয়ে এখনো তদন্ত চলছে। সব আলামত ফরেনসিক পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে। থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), সিআইডি ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে।
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার বলেন, ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। এই ঘটনায় বিভিন্ন বিষয় সামনে আসছে। সেগুলো আমলে নিয়ে তদন্ত করতে দেখছি। বিশেষ করে চুলের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ঘটনাটির পেছনে কারা জড়িত তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে এখন পর্যন্ত কাউকে সনাক্ত করা যায়নি। সব ধরনের সম্ভাবনা বিবেচনায় তদন্ত চলছে। -বাংলানিউজ
Lohagaranews24 Your Trusted News Partner