ব্রেকিং নিউজ
Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | দান যখন কেড়ে নেয় প্রাণ

দান যখন কেড়ে নেয় প্রাণ

32349068_103187197229427_2620862651168718848_n

নিউজ ডেক্স : ‘ডান হাতে দান করলে বাম হাতও যেন তা না জানে।’ আলেম–ওলামাগণ প্রায় সময় হাদিসটি’র উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন। বাক্যটি ইসলাম ধর্মের নির্দেশনা হিসেবেই বিবেচ্য। এর মূল শিক্ষা হচ্ছে, কাউকে লোক দেখানো সাহায্য করা অনুচিত।

বাস্তবতা হচ্ছে ধর্মীয় এ শিক্ষার প্রতিফলন সমাজে খুব একটা নেই। বরং আয়োজন করেই সাহায্য করার প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। এক্ষেত্রে দানের মহিমা ছড়িয়ে ‘আত্মপ্রচার’টাই যেন মুখ্য হয়ে ওঠে অনেক সময়। এমনকি আয়োজনগুলোতে থাকে না নিয়ম–শৃঙ্খলাও। বিশৃঙ্খলার কারণে বিভিন্ন সময়ে ঘটে দুর্ঘটনা। আর তার মাশুল দিতে হয় সাহায্য নিতে আসা অসহায় লোকজনকে। কেউ প্রাণ হারান, কেউ হন আহত। গত ৩৮ বাংলাদেশে এ ধরনের আয়োজনগুলোতে ছোট–বড় অনেকগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে দুইশ’রও বেশি লোক নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল সাতকানিয়ায় ইফতার–সামগ্রী নিতে এসে পদদলনে প্রাণ হারান ৯ জন।

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলোর (সাহায্য নিতে এসে প্রাণহানি) বিশ্লেষণ করলে এটায় স্পষ্ট হয়, ‘দরিদ্র লোকগুলোর সাথে যেন এক ধরনের তামাশায় লিপ্ত হন সাহায্যকারীরা।’ অবশ্য গতকাল সাতকানিয়ায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটি ছিল ইফতার সামগ্রী বিতরণের আয়োজনকে ঘিরে। অর্থাৎ এখানেও সহায়তার বিষয়টি জড়িত। এর আগে বাংলাদেশে এ ধরনের যত দুর্ঘটনা ঘটেছে তার বেশিরভাগ ছিল, যাকাতের শাড়ি বা টাকা বিতরণের আয়োজনকে ঘিরে। অর্থাৎ সেখানেও সাহায্যের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। তবে ঘটে যাওয়া বেশিরভাগ দুর্ঘটনায় এক জায়গায় মিল ছিল। এবং সেটা হচ্ছে– অধিকাংশ দুর্ঘটনার পিছনে ছিল আয়োজনের ত্রুটি। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা ছাড়াই দান–খয়রাত, ইফতার বিতরণ বা যাকাত প্রদান করা। এছাড়া ছিল লোক দেখানো মানসিকতা, যদিও ইসলাম সেটা সমর্থন করে না।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্ট্যাডিস বিভাগের প্রফেসর ড. জাফর উল্লাহ বলেন, পবিত্র কোরান মজীদের সূরা বাকারার ২৮১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যদি দান কর, সেটা প্রকাশ করা ভাল। গোপনে করলে অত্যন্ত ভাল।’ এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করার আছে, প্রকাশ্যে দান করার কথা এ জন্য বলা হয়েছে, যাতে সেটা দেখে (প্রকাশ্যে দান) অন্যরা দান করতে উৎসাহিত হন। এখন কথা হচ্ছে, যারা দান করছেন তারা কি উৎসাহিত করতে করছেন নাকি প্রচারের জন্য? ডাক–ঢোল পিঠিয়ে প্রচারের জন্য করলে সেটা অনেকাংশে ‘রিয়া’ হয়ে যাবে। ‘রিয়া’ মানে লোক দেখানে এবাদত। ইসলাম ‘রিয়া’কে কখনোই সমর্থন করে না। আবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা এমনভাবে দান করবে, যেন ডান হাতে করলে সেটা বাম হাত জানতে না পারে।’ এটার মধ্য দিয়ে প্রকাশ্যে দানকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাছাড়া ইসলামের বিধান হচ্ছে-, ‘ফরজ সদকা’ (যাকাত) কিন্তু গরিবের হক (প্রাপ্য)। এখন যার হক তাকে পৌঁছে দিতে হবে। সে (গ্রহীত) হক নিতে আসবে না। লাইনে দাঁড় করিয়ে, কষ্ট দিয়ে তাকে হক দেয়া অনুচিত।’

সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন দুর্ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ আয়োজন দেখে মনে হয় লোক দেখানো। এটা অনুচিত। যেহেতু কোরানে ‘গোপনে করলে অধিক ভাল’ বলেছেন, তাই সেটায় মানা উচিত। তাছাড়া রাসুল (সা.)ও দানের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার কথা বলেছেন। এটা অনুসরণ করলে দুর্ঘটনাগুলো কমে আসবে।

একই প্রসঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক আবুল হায়াত মো. তারেক দৈনিক আজাদীকে বলেন, লাইনে দাঁড় করিয়ে যাকাত দেয়ার কোন নিয়ম নাই। ইসলামও এটা সমর্থন করে না। নিয়ম হচ্ছে, ‘যাকে যাকাত দিবে তার কাছে সেটা পৌঁছে দেয়া। ওরা আসবে না। অর্থাৎ যাকাতদাতা গ্রহীতার কাছে পৌঁছে দিবেন। কারণ, এটা (যাকাত) গরিবের ‘হক’ (প্রাপ্য)। পবিত্র কোরানেও আছে, ‘ধনীদের সম্পদে গরিবের হক আছে।’ এখন যার হক তাকে পৌঁছে দেয়ায় দায়িত্ব। কিন্তু যারা তা না মেনে লাইনে দাঁড় করিয়ে যাকাত দিচ্ছেন তারা ইসলামের সৌন্দর্য বিনষ্ট করেছে। যাকাত দেয়ার প্রকৃত সিস্টেমকে তারা লাঞ্ছিত করেছে। তারা যাকাতের মূল তাৎপর্যকেই কলংকিত করেছে। নিজের প্রচারের জন্য এধরনের কর্মকাণ্ড কোনভাবে কামনা করা যায় না। এটা সমর্থনযোগ্যও নয়। গত ১০ মে মন্ত্রণালয়ে আমাদের মিটিং হয়েছিল। সেখানেও বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এদিকে গতকাল সাতকানিয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘কেএসআরএম’র বিতরণকৃত ইফতার সামগ্রী সংগ্রহ করতে এসে পদদলিত হয়ে প্রাণ হারান ৯ জন। এ সময় আহত মোস্তফা খাতুনকে (৫০) ভর্তি করা হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে। গতকাল হাসপাতালে কথা হয় তার মেয়ে আমেনা বেগমের সাথে। তিনি বলেন, তাদের বাড়ি সাতকানিয়া উপজেলার আমিলাইশ ইউনিয়নে। কামাল মেম্বার বাড়ির বাসিন্দা। তার মা (আহত মোস্তফা খাতুন) বাকপ্রতিবন্ধী। বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত। ইতোমধ্যে ‘স্ট্রোক’ করেছেন। ভাই শহরে চাকরি করেন। একদিন আগে এলাকায় মাইকে ‘পাবলিসিটি করা হয়েছে ইফতার বিতরণের বিষয়ে। তাই তার মা ইফতার সামগ্রী সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন। ইফতার সংগ্রহ করতে আসা লোকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় আহত হন তার মা।

মোস্তফা খাতুনের ছেলে শহীদ বলেন, কখন দুর্ঘটনা ঘটেছে জানি না। খবর পেয়ে সকাল ১০টায় সাতকানিয়া মেডিকেলে যাই। সেখানে চিকিৎসাধীন ছিল আমার মা। পরে সেখান থেকে দুপুর একটায় নিয়ে আসি চট্টগ্রাম মেডিকেলে। পারিবারিকভাবে অস্বচ্ছল হওয়ার কারণেই তার মা ইফতার সংগ্রহে গিয়েছিল বলেও জানান তিনি।

এদিকে গতকাল সাতকানিয়া দুর্ঘটনার পর চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইন বিভিন্ন গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘ইফতার বিতরণের বিষয়ে প্রশাসনের আগে থেকে জানা ছিল না।’ চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অব্যবস্থাপনার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে।’ অবশ্য গতকাল সন্ধ্যায় ‘কেএসআরএম গ্রুপের সিইও মেহেরুন করিম বলেছেন, ‘আমাদের কোনো অব্যবস্থাপনা ছিল না। পুলিশের ১০০ জন সদস্য ও আমাদের সিকিউরিটির ২০০ জন সদস্য ত্রাণ বিতরণের সময় কাজ করেন।

চট্টগ্রামে আগেও ঘটেছিল দুর্ঘটনা :

২০০৫ সালেও সাতকানিয়ায় ‘কেএসআরএম’র এর ইফতার বিতরণের সময় সৃষ্ট দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৮ জন। তবে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৯০ সালের ২৬ এপ্রিল। সেদিন নগরির পাহাড়তলীর আবুল বিড়ি ফ্যাক্টরিতে যাকাত নিতে গিয়ে পদদলনে ৩৫ জন নিহত হয়। আহত হয়েছিলেন প্রায় ২শ জন। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায় ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে যাকাত সংগ্রহে গিয়ে একজন মারা যান।

এদিকে চট্টগ্রামের বাইরে বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালের ১০ জুলাই ময়মনসিংহে যাকাতের কাপড় সংগ্রহ করতে গিয়ে পদদলনে মারা গিয়েছিলেন ২৭ জন। আহত হন ২০ জন। ২০১৪ সালের ২৫ জুলাই বরিশাল নগরির কাঠপট্টি রোডে খান অ্যান্ড সন্স গ্রুপের মালিকের বাসভবনে যাকাতের কাপড় বিতরণের সময় পদদলনে মারা যান ২২ জন। একই বছরের ২৪ জুলাই মানিকগঞ্জে বিতরণকৃত কাপড় নেয়ার সময় ভিড়ের কারণে ও প্রচণ্ড গরমে ১৩ নারী অসুস্থ হন। পরে হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যান ৩ জন।

এছাড়া যাকাতের অর্থ ও যাকাতের নামে কাপড় সংগ্রহ করতে গিয়ে ২০১২ সালের আগস্ট মাসে রাজধানীর মতিঝিলের ফকিরাপুলে ৩ জন, ২০১১ সালের রমজান মাসে রাজধানীর ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কের নারী ও শিশুসহ ৭ জন, ২০০৬ সালে পটুয়াখালীতে ৩ জন, ২০০৫ সালে গাইবান্ধায় ৩৭ জন, ২০০৩ সালে ঈদুল ফিতরের আগে রাজধানীর শাহজাহানপুরে বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের বাসায় নারী ও শিশুসহ ৯ জন, ২০০২ সালের ডিসেম্বরে গাইবান্ধায় ৪২ জন, ১৯৮৯ সালের ৫ মে চাঁদপুরে ১৪ জন, ১৯৮৭ সালের ২৩ রাজধানীর ক্যান্টনমেন্টে ৪ জন, ১৯৮৩ সালের ৯ জুলাই রাজধানীতে ৩ শিশু এবং ১৯৮০ সালের পবিত্র রমযান মাসে রাজধানীর জুরাইনে শিশুসহ ১৩ জন পদদলনে এবং ভিড়ের চাপে মারা যান।

সূত্র : দৈনিক আজাদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*