Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে অভিযোগ বাড়ছে : মিলছে পুরস্কারও

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে অভিযোগ বাড়ছে : মিলছে পুরস্কারও

national-consumer-rights-20170722163610

নিউজ ডেক্স : রাজধানী মিরপুরের মধ্য পীরেরবাগের ‘হান্ডি হাউস’ ১৫ টাকা মূল্যের কোমল পানীয় পেপসির এক বোতল দাম ২০ টাকা রাখেন। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে পাঁচ টাকা বেশি রাখায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের অভিযোগ করেন মীর তৌসিফ-উর-জামান।

অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের মালিককে চার হাজার টাকা জরিমানা করে অধিদফতর। আর জরিমানার ২৫ শতাংশ টাকা পান মীর তৌসিফ। শুধু তৌফিক নন ভোক্তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি প্রমাণিত হলে তাকে দেয়া হয় আদায় করা টাকার ২৫ শতাংশ।

বড় মগবাজারের বাসিন্দা রাফায়েত রোমান জাগো নিউজকে বলেন, ভোক্তা অধিদফতরে খুব সহজে অভিযোগ করা যায়। এর সমাধানও খুব দ্রুত হয়। তিনি বলেন, আমি গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের হাতিরপুল বাজারে অবস্থিত ‘চায়না কিচেন থাই অ্যান্ড চাইনিজ রেস্টুরেন্ট’-এ চার বন্ধুসহ খেতে যান। চায়না কিচেন ২৫০ এমএল কোমল পানীয় পেপসির মূল্য ১৫ টাকার পরিবর্তে ৩০ টাকা এবং দেড় লিটার মাম পানি ২৫ টাকার পরিবর্তে ৪০ টাকা দাম রাখে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে অভিযোগ করি। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে পণ্যের দাম বেশি রাখায় রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে  পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আর অভিযোগ করে পুরস্কার হিসেবে পাই এক হাজার ২৫০ টাকা।

দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করে তাহলে সাধারণ মানুষ যেমন উপকৃত হবেন তেমনি প্রতারণাও অনেক কমে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

আব্দুল্লাহ শিবলী সাদিক গ্রামীণফোনের একজন গ্রাহক। সেবা নিতে গিয়ে প্রতারিত হওয়ায় গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিদফতরে অভিযোগ করেন। বিষটি প্রমাণিত হওয়ায় অধিদফতর প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করে আড়াই লাখ টাকা।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে শিবলী জাগো নিউজকে বলেন, গ্রামীণফোনের প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই। প্রতিষ্ঠানটি মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে এবং তথ্য গোপন করে পণ্য বিক্রি করে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তাই জনগণকে সতর্ক করতে ভোক্তা অভিদফতরে অভিযোগ করি।

তিনি বলেন, গ্রামীণফোনের মতো অন্যান্য মোবাইল অপারেটররা দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিশেষ করে গ্রামের সহজ সরল লোকদের বিভিন্নভাবে ঠকাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাস্টমার কেয়ারে অভিযোগ করলেও প্রতিকার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। তাই এক শিক্ষিত সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি প্রতারণার বিষয়ে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে অভিযোগ করি।

অধিদফতর সম্পর্কে তিনি বলেন, পণ্য বা সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে কেউ প্রতারিত হলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে অভিযোগ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তড়িৎ উদ্যোগ নেয় সংস্থাটি। কিন্তু প্রচারের অভাবে সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে তেমন অবগত নন। অধিদফতরের উচিত জনসচেতনামূলক কার্যক্রমে আরও বেশি গুরুত্ব দেয়া।

যেকোনো ভোক্তার চোখে প্রতারণার বিষয় ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করতে পারেন ভোক্তা অধিদফতরে। অভিযোগ করলে যেমন প্রতিকার মিলবে তেমনি মিলবে পুরুস্কারও- বলেন আব্দুল্লাহ শিবলী।

অধিদফতরের প্রতি ভোক্তাদের যে বিশ্বাস ও আস্থা এসেছে তা অক্ষুণ্ন রাখারও পরামর্শ দেন তিনি। কোনো বিশেষ মহলের কারণে এ কার্যক্রম যেন বন্ধ না হয়।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভোক্তাদের অভিযোগ জমা পড়েছে প্রায় চার হাজার ৯৯৬টি। অথচ আজ থেকে ছয় বছর আগে ২০১১ সালে ১২ কোটি ভোক্তার মধ্যে অভিযোগের সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচটি। ছয় বছরে অভিযোগের সংখ্যা বেড়েছে হাজার গুণ।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফত জানায়, ২০১১ সালে অধিদফতরে লিখিত অভিযোগের সংখ্যা ছিল পাঁচটি, ২০১২ সালে ৬৯টি, ২০১৩ সালে ৩২টি, ২০১৪ সালে ৫৩৭টি, ২০১৫ সালে ২২৫টি, ২০১৬ সালে এক হাজার ৬২২টি এবং ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত চার হাজার ৯৯৬টি। এর মধ্যে চার হাজার ৬৬০টি অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে। তদন্তাধীন রয়েছে ৩৩৬টি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের স্বার্থে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন- ২০০৯ প্রণয়ন করে। এরপর থেকে সংস্থাটি ভোক্তাদের অধিকার সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা শুরু করে। প্রচারণার মাধ্যমে ভোক্তারা সচেতন হচ্ছেন। কেউ মানহীন পণ্য দিচ্ছে কি না, প্রতিশ্রুত সেবা পাওয়া না পাওয়া এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় হচ্ছে কি না- এসব বিষয়ে ভোক্তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।

প্রতিনিয়তই সচেতন হচ্ছেন তারা। অনিয়ম দেখলে অধিকার আদায়ে অধিদফতরের শরণাপন্ন হচ্ছেন। অভিযোগ করছেন প্রতারণার বিরুদ্ধে। এসব কারণে দিন দিন অধিদফতরে অভিযোগ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

এ বিষয়ে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম লস্কর জাগো নিউজকে বলেন, ভোক্তাদের অভিযোগের সংখ্যা এ বছর অনেক বেড়েছে। এর মূল কারণ ভোক্তারা অধিদফতরে অভিযোগ করলে দ্রুত প্রতিকার পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, এখন খুব সহজে চিঠির মাধ্যমে বা অনলাইনে অভিযোগ করতে পারছেন সাধারণ ভোক্তারা। তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে অধিদফতরের ১৩টি দক্ষ কমিটি কাজ করছে। অভিযোগ পাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে তা সমাধান করা হচ্ছে। ফলে মানুষ উৎসাহ পাচ্ছেন। এছাড়া অধিদফতরের পক্ষ থেকে ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়াতে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন মতবিনিময়, গণশুনানি করা হচ্ছে। এসব কারণে অভিযোগ বাড়ছে।

অধিদফত সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন করা হয়। এ আইনে ভোক্তা অধিকার ক্ষুণ্ন করছে- এমন কাজের বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে অভিযোগ করা যায়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। এর মধ্যে জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। জরিমানা হলে ভোক্তাকে মোট জরিমানার ২৫ শতাংশ অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে দেয়া হয়।

অপরাধ ও দণ্ড

যদি কোনো প্রতিষ্ঠান ওজন বা পরিমাপে কারচুপি করে, পণ্যের মোড়কে খুচরা বিক্রির মূল্য না লেখে বা নির্ধারিত মূল্যের বেশি মূল্য দাবি করে তাহলে ভোক্তা সংরক্ষণ আইন- ২০০৯ অনুসারে এক বছর কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড প্রদানযোগ্য অপরাধ।

অপরদিকে কোনো পণ্যে জেনে শুনে ক্ষতিকারক দ্রব্য মেশালে বা নকল পণ্য বিক্রি করলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী তিন বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এছাড়া মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করলে আইন অনুযায়ী এক বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।

অভিযোগ দায়েরের পদ্ধতি

ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর ধারা ৭৬ (১) অনুযায়ী, “যেকোনো ব্যক্তি, যিনি, সাধারণভাবে একজন ভোক্তা বা ভোক্তা হইতে পারেন, এ অধ্যাদেশের অধীন ভোক্তা-অধিকারবিরোধী কার্য সম্পর্কে মহাপরিচালক বা এতদুদ্দেশ্যে মহাপরিচালকের নিকট ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অবহিত করিয়া লিখিত অভিযোগ দায়ের করিতে পারিবেন।”

যেখানে অভিযোগ দায়ের করা যাবে

> মহাপরিচালক, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, ১ কারওয়ান বাজার (টিসিবি ভবন-৮ম তলা), ঢাকা, ফোন: +৮৮০২ ৮১৮৯৪২৫
>> জাতীয় ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্র,  টিসিবি ভবন- ৯ম তলা, ১ কারওয়ান বাজার ঢাকা, ফোন: ০১৭৭৭ ৭৫৩৬৬৮, ই-মেইল: nccc@dncrp.gov.bd
>> উপ-পরিচালক, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, টিসিবি ভবন, বন্দরটিলা, চট্টগ্রাম, ফোন: ০৩১-৭৪১২১২
>> উপ -পরিচালক, রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, শ্রীরামপুর, রাজশাহী, ফোন: +৮৮০৭ ২১৭৭২৭৭৪
>> উপ-পরিচালক, খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, টিসিবি ভবন, শিববাড়ী মোড়, খুলনা, ফোন: ০৪১-৭২২৩১১
>> উপ-পরিচালক, বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, মহিলা ক্লাব ভবন, বরিশাল, ফোন: +৮৮০৪ ৩১৬২০৪২
>> উপ-পরিচালক, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, সিলেট ফোন: ০৮২১-৮৪০৮৮৪
>> উপ-পরিচালক, রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিউ ইঞ্জিনিয়ার পাড়া, রংপুর, ফোন: ০৫২১-৫৫৬৯১
>> প্রত্যেক জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।
যেভাবে অভিযোগ দায়ের করতে হবে
>> দায়েরকৃত অভিযোগ অবশ্যই লিখিত হতে হবে।
>> ফ্যাক্স, ই-মেইল, ওয়েব সাইট, ইত্যাদি ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে; বা অন্য কোন উপায়ে-
>> অভিযোগের সঙ্গে পণ্য বা সেবা ক্রয়ের রশিদ সংযুক্ত করতে হবে।
>> অভিযোগকারী তার পূর্ণাঙ্গ নাম, পিতা ও মাতার নাম, ঠিকানা, ফোন, ফ্যাক্স ও ই-মেইল নম্বর (যদি থাকে) এবং পেশা উল্লেখ করবেন।

-জাগো নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*