ব্রেকিং নিউজ
Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | চট্টগ্রামের অধিকাংশ মামলার তদন্ত সন্দেহ ও ধারণায় বন্দী

চট্টগ্রামের অধিকাংশ মামলার তদন্ত সন্দেহ ও ধারণায় বন্দী

4594587b73f928bced60f7c44c2ef3d8-5aeb77b5abec5

নিউজ ডেক্স : চট্টগ্রামে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলাগুলোর অধিকাংশেরই তদন্ত ‘সন্দেহ’ আর ‘ধারণা’তে বন্দী। প্রযুক্তিগত সুবিধার ওপর অতি মাত্রায় নির্ভরশীলতা, অনভিজ্ঞতা, সোর্স সংকট, নানা কাজে ব্যস্ততা, সর্বোপরি জবাবদিহিতার প্রশ্নে শিথিলতার অভিযোগ আছে পুলিশের বিরুদ্ধে। চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলাগুলো যেমন ঝুলে আছে বছরের পর বছর ধরে, তেমনি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে পুলিশ। অনেক সময় অভিযোগ আসে, বিবাদী পক্ষ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে পুলিশ এ কাজ করে। এ প্রসঙ্গে সিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মাসুদ উল হাসান বলেন, পুলিশের পক্ষে কখনোই বাদী–বিবাদী উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। তদন্ত রিপোর্ট যাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী হয় না, তারা তখন পুলিশের নানা খুঁত ধরার চেষ্টা করে।

চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর প্রতিটির তদন্ত চলছে ঠিকই, তবে অগ্রগতি নেই। সর্বশেষ গত ১ মে স্কুলছাত্রী তাসফিয়ার মৃত্যু সম্পর্কেও এ কথা প্রযোজ্য। পুলিশের মধ্যেও তার মৃত্যু নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা। সিএমপির সিনিয়র একজন কর্মকর্তা গত সোমবার রাতে তাসফিয়ার মৃত্যু প্রসঙ্গে আজাদীকে বলেন, যতই রহস্য উন্মোচনের দ্বারপ্রান্তে বলা হোক না কেন, ব্যাপারটা এত সহজ নয়। এ মামলাটি পুলিশকে খুব ভোগাবে। কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তাগণ ময়না তদন্ত রিপোর্ট হাতে আসার আগে থেকে যে যার মতো মিডিয়ার কাছে তাসফিয়ার মৃত্যু নিয়ে মন্তব্য করছেন।

তাসফিয়ার মৃত্যুর কারণ জানতে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে ভিসেরা। এ প্রসঙ্গে তদন্তকারী টিমের অন্যতম সিএমপির সহকারী কমিশনার (এসি–কর্ণফুলী) মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, ঢাকার ল্যাবরেটরিতে পাঠানো ভিসেরায় তিন বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে কী কারণে তাসফিয়ার মৃত্যু হয়েছে, ধর্ষণ করা হয়েছে কি না এবং বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে কি না। ভিসেরা রিপোর্ট না এলে আমরা কনক্লুশনে পৌঁছাতে পারছি না।

সুনির্দিষ্ট ক্লু না পাওয়ায় সন্দেহের মধ্যে বন্দী আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর বেশ কিছু মামলার তদন্ত। কিছু ঘটনায় মাস, বছর পার হয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া গড়িয়েছে অর্ধ যুগ পর্যন্ত। একাধিক দফায় পাল্টানো হয় তদন্ত কর্মকর্তা, পরিবর্তন হয় তদন্ত সংস্থাও; তবু মামলার তদন্ত আলোর মুখ দেখে না। অনেক মামলায় আদালতের নির্দেশে তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন করেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে তদন্তের ‘সাফল্য’ বলতে সন্দেহভাজন হিসেবে আসামি গ্রেপ্তার। এমন বাস্তবতায় হতাশ ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। জীবদ্দশায় জড়িতদের সাজা দেখে যেতে পারবেন কি না এমন সংশয়ে অনেকের স্বজন।

অন্যদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি হত্যা মামলার তদন্ত এক দিনে শেষ হয় না। প্রকৃত অপরাধীদের ধরতে দীর্ঘ তদন্তের প্রয়োজন হয়। এতে সময় লাগে। কিন্তু এরই মধ্যে নতুন চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটে। তখন সেটির পেছনে ছুটতে হয়। মানুষ তখন সেটির দিকেই নজর রাখে। এভাবেই আগের হত্যাকণ্ডের তদন্ত কাজ চাপা পড়ে যায়।

২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি নগরীর পাঁচলাইশের তেলিপট্টির বাসার গলির মুখে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের শিক্ষক অঞ্জলি রানী দেবীকে। এ ঘটনার তিন বছর পার হলেও নেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। গ্রেপ্তার করতে পারেনি হোতাদের। এমনকি এ খুনের ক্লু পর্যন্ত উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার পর অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা করেন অঞ্জলির স্বামী রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী।

২০১৬ সালের ২৯ মার্চ প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন অনুষদে খুন হন শিক্ষার্থী নাসিম আহমেদ সোহেল। এ ঘটনার পর ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে ঘটনার পর দিন সোহেলের বাবা আবু তাহের মামলা করেন। এ মামলার পর দুই বছর পার হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত মাত্র একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

২০১৬ সালের ৫ জুন নগরীর জিইসির মোড় এলাকায় ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন সাবেক এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। এ ঘটনার পর বাবুল আক্তার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা করেন। খুনের এক মাসের মধ্যেই এ খুনে সরাসরি অংশগ্রহণকারী এবং অস্ত্র সরবরাহকারীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন খুনে সরাসরি অংশগ্রহণকারী রাশেদ ও নবী। এরপর থেকেই এক প্রকার থমকে যায় এ খুনের তদন্ত।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা শাখার ডিসি মো. কামরুজ্জামান মামলার অগ্রগতি প্রসঙ্গে বলেন, চলছে; আমরা থেমে নেই। মুছা এবং কালুকে গ্রেপ্তার করা গেলে এ খুনের রহস্যের জট খুলবে। তাই মুছাকে হন্যে হয়ে খোঁজা হচ্ছে। অথচ অনেক আগে থেকেই মুছার স্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেছিলেন, ওসি মহিউদ্দিন সেলিম ও ওসি নেজামের নেতৃত্বে মুছাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ডিবি জানে আমার স্বামী কোথায় আছে।

২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকায় বাসা থেকে ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রথম ময়নাতদন্তে এটাকে আত্মহত্যা বলা হলেও দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে হত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় দিয়াজের মা বাদী হয়ে আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও বাকিরা প্রকাশ্যে ঘুরছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর সদরঘাট থানা এলাকায় পিটিয়ে হত্যা করা হয় মহানগর ছাত্রলীগের সহ–সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে। এ ঘটনায় তার বাবা বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। এ ঘটনার সাত মাস পার হয়ে গেলেও এখনো গ্রেপ্তার হয়নি ঘটনার মূল হোতারা।

২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর কদমতলী এলাকায় গুলি করে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয় পরিবহন ব্যবসায়ী ও যুবদল নেতা হারুনুর রশিদকে। এ ঘটনায় ১০ জনের নাম উলেহ্মখসহ সদরঘাট থানায় মামলা করা হয়। আলোচিত এ মামলার এখনো অনেক আসামিই রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

চলতি বছর ১৬ জানুয়ারি ছুরিকাঘাতে আদনান ইসফার (১৫) নামে এক স্কুলছাত্র খুন হয়েছে। নগরীর জামালখান ডা. খাস্তগীর স্কুলের সামনে এ ঘটনা ঘটে। নিহত আদনান কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল। খুনের ঘটনায় জড়িত পাঁচ কিশোর ধরা পড়লেও কথিত বড় ভাই ঠিকই অধরা।

গত ২৬ মার্চ স্কুল ক ে ঢুকে পৈশাচিক স্টাইলে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে মহিউদ্দিন নামে এক যুবলীগ কর্মীকে খুন করে হাজী ইকবাল ও তার সহযোগীরা। মূলত হাজী ইকবালের সাথে বিরোধের জের ধরেই এ হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয। হাজী ইকবালকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে পুলিশ দাবি করলেও পুলিশের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, হাজী ইকবাল সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে গেছে।

সাংবাদিক পত্নী মনিকা রাধা নিখোঁজের ঘটনাটিও একইভাবে ঝুলছে তদন্তনাধীন অবস্থায়। তার সন্ধান পায়নি পুলিশ। মনিকার পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীদের দাবি, এটির তদন্তভার পিবিআইয়ে দেওয়া হলে কিছুটা হলেও আলোর দিশা মিলত। ‘চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজ’–এর ব্যানারে প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন থেকেও একই দাবি করা হয়।

গত ৬ মে পূর্ব বিরোধের জের ধরে নগরীর বাকলিয়া থানাধীন তক্তারপুল এলাকায় প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে এক যুবক খুন হয়েছেন। নিহত ওই যুবকের নাম সাইফুল আলম রাকিব। সোমবার গভীর রাতে এ ঘটনা ঘটে। বাকলিয়া থানার ওসি প্রণব চৌধুরী বলেন, পূর্ব শত্রুতার জেরে এ খুনের ঘটনা ঘটেছে। কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারীরা এক সময় নিহতের সহপাঠী ছিল। এ ঘটনায় একজন ধরা পড়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।

জানা গেছে, নগরী ও জেলায় চাঞ্চল্যকর মামলাগুলো চিহ্নিত করতে একটি মনিটরিং কমিটি রয়েছে। পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসক এ কমিটির প্রধান। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ৩০ মে এ কমিটির সভা হয়। এতে পটিয়া উপজেলার এক প্রতিবন্ধী কিশোরীকে গণধর্ষণের অভিযোগে করা বিচারাধীন মামলাটি চাঞ্চল্যকর হিসেবে অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করা হয়। এরপর কমিটির আর সভা হয়নি। চিহ্নিত হয়নি চাঞ্চল্যকর কোনো মামলা। ২০১৩ সাল থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এই একটিমাত্র মামলা চাঞ্চল্যকর হিসেবে চিহ্নিত করেছে মনিটরিং কমিটি।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, আমরা বিভাগীয় আইন–শৃঙ্খলা কমিটির সভায় আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার পর চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করি। কোনো মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের অন্তর্ভুক্তির জন্য পুলিশ যদি আবেদন করে তবে যাচাই বাছাই করে চূড়ান্ত করা হয় কোন মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে যাবে। দীর্ঘদিন ধরে চাঞ্চল্যকর বেশ কয়েকটি মামলা ঝুলে আছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জেলা প্রশাসক বলেন, তা ঠিক, বছরের পর বছর ঝুলে আছে এমন মামলাও রয়েছে। আমি আসার পর এ সংক্রান্ত সভা হয়নি। দেখি শীঘ্রই এ কমিটি নিয়ে একটি সভা করব।

সূত্র : দৈনিক আজাদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*