Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | গৃহকরের উত্তাপ চবি ক্যাম্পাসে!

গৃহকরের উত্তাপ চবি ক্যাম্পাসে!

image_printপ্রিন্ট করুন

P-1-4-1

নিউজ ডেক্স : গৃহকরের উত্তাপ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। শিক্ষককে হুমকির প্রতিবাদ ও অপসারণের দাবিতে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে ছাত্রলীগের দুটি পক্ষ। এর মধ্যে ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম শেষে আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী সভাপতি টিপু গ্রুপ শিক্ষক আমির উদ্দীনের অপসারণ দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনিক ভবনে ব্যাপক ভাংচুর ও মূল ফটক অবরোধ করে অবস্থান নেয়। এছাড়া শাটল ট্রেনের হোস পাইপ কেটে দেয়। এসময় কর্তব্যরত এক সাংবাদিককেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।

অন্যদিকে ভাঙচুর ও শিক্ষককে লাঞ্ছিতের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী সাধারণ সম্পাদক সুজন গ্রুপ। এসময় তারা প্রশাসনিক ভবনে ভাঙচুর ও শিক্ষক লাঞ্ছিতে জড়িতদের বিচার দাবি করে প্রশাসনকে ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেয়। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর দেড়টা ও বিকেলে সাড়ে তিনটায় দুটি পক্ষই পাল্টাপাল্টি এসব কর্মসূচি পালন করে। দু’পক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

নাছির গ্রুপের আল্টিমেটাম পরবর্তী ভাংচুর ও অবরোধ:

গতকাল দুপর দেড়টার দিকে ঘটনার সূত্রপাত। ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটামে শিক্ষক আমির উদ্দীনকে অপসারণ না করায় মাঠে নামে নাছির গ্রুপ। শুরুতে স্থগিত কমিটির সভাপতি আলমগীর টিপুর নেতৃত্বে মিছিল নিয়ে কয়েকজন নেতাকর্মী উপাচার্যের সাথে দেখা করতে যায়। অন্যদিকে বাকী নেতা–কর্মীরা প্রশাসনিক ভবনের নিচে অবস্থান করে। নেতাকর্মীরা উপাচার্যের ক থেকে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বের হলেই শুরু হয় তাণ্ডব–ভাংচুর। এসময় উপাচার্য ও রেজিস্ট্রার অফিসের বেশ কয়েকটি জানালার কাঁচ, বেশ কয়েকটি ফুলের টব এবং ভবনের নিচে থাকা দুটি প্রাইভেটকার ও তিনটি মোটরসাইকেল ভাংচুর করা হয়। টানা ১০ মিনিট ধরে চলে এসব ভাংচুর। পরে আবার মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত অবরোধ করে অবস্থান নেয় তারা। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরিয়াল বডির প থেকে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাসের ভিত্তিতে তারা অবরোধ তুলে নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়।

অবরোধের বিষয়ে জানতে চাইলে স্থগিত কমিটির সভাপতি আলমগীর টিপু আজাদীকে বলেন, আমরা শি কের অপসারণ চেয়ে আল্টিমেটাম দিয়েছিলাম। সে জন্য আজ ভিসি স্যারের সাথে দেখা করতে যাই। কিন্তু তিনি আমাদেরকে সন্তোষজনক কোন উত্তর দিতে পারেননি। সে জন্য আমরা আমাদের গতানুগতিক আন্দোলনে যাই। পরে আগামী ২২ তারিখের মধ্যে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এমন আশ্বাসে আমরা আন্দোলন তুলে নিই। প্রশাসনিক ভবনে ভাংচুরের বিষয়ে তিনি বলেন, ভাংচুরের সাথে আমাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই। যারা ওই শি কের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে তারা এমন কিছু ঘটাতে পারে। আপনারা তো ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা ছিলাম ঠিক, কিন্তু আমাদের কেউ এমন ঘটনার সাথে জড়িত নয়।

অবরোধকারীর পক্ষের আরেক নেতা স্থগিত কমিটির উপ–গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ইকবাল টিপু আজাদীকে বলেন, সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বিরোধীতা করায় শিক্ষক আমির উদ্দিনের অপসারণ চেয়ে আমরা আন্দোলন করেছি। তদন্ত শেষে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আমরা আবার আন্দোলনে যাব।

শাটল ট্রেন অবরোধ, শিক্ষার্থীদের আতঙ্ক–দুর্ভোগ:

এদিকে ছাত্রলীগে বিক্ষুব্ধ কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে অবস্থান করা শহরগামী দুপুর দেড়টার শাটল ট্রেনের হোস পাইপ কেটে অবরুদ্ধ করে রাখে। এছাড়া জিরো পয়েন্টে শহরগামী শিক্ষক–কর্মকর্তাদের বেশ কয়েকটি বাস আটকা পড়ে। ফলে দুর্ভোগে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। পরে প্রায় দেড় ঘন্টা পর বিকেল ৩টার দিকে শাটল ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ বিষয়ে শাটল ট্রেনের লোক মাস্টার সাইফুল ইসলাম আজাদীকে বলেন, ছাত্রলীগ পরিচয়ে একদল যুবক এসে আমাদের ট্রেন চালাতে নিষেধ করে। পরে দেখি ট্রেনের একটি হোস পাইপ কেটে দেওয়া হয়।

পাল্টা অবস্থানে গিয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারিদের বিক্ষোভ–সমাবেশ:

এদিকে নাছির গ্রুপের আন্দোলন প্রত্যাহারের পরপরই বিকেল সাড়ে ৩টায় বি োভ মিছিল বের করে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারি পক্ষ। প্রশাসনিক ভবনে ভাংচুর ও শিক্ষককে লাঞ্ছনার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় সোহরাওয়ার্দী হল থেকে শাখা ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী সুজনের নেতৃত্বে মিছিলটি বের করা হয়। পরে মিছিলটি নিয়ে তারা জিরো পয়েন্ট এলাকা ঘুরে প্রশানিক ভবনের সামনে এসে অবস্থান নেয়। অবস্থান পরবর্তী তারা একটি সমাবেশের আয়োজন করে। এসময় ভাংচুর ও শিক্ষক লাঞ্ছনায় জড়িতদের বিচার দাবি করে ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটামও দেয় তারা। অন্যথায় লাগাতার আন্দোলন করবে বলেও হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।

সমাবেশে শাখা ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী সুজন বলেন, ৪৮ ঘন্টা পার হলেও শিক্ষক লাঞ্ছনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শিক্ষক সমিতি নীরব রয়েছে। সন্ত্রসীরা প্রশাসনিক ভবনে তাণ্ডব চালিয়ে ক্যাম্পাসে নৈরাজ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়নি। ২৪ ঘন্টার মধ্যে দোষীদের ছাত্রত্ব বাতিল পূর্বক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ছাত্র সমাজকে নিয়ে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য:

এসকল বিষয়ে চবি উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী আজাদীকে বলেন, দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি শিক্ষককে হুমকির বিষয়ে এবং অন্যটি অপসারণের দাবি খতিয়ে দেখার বিষয়ে। তদন্ত কমিটির ফলফলের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রশাসনিক ভবনে ভাংচুরের বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা আমার সাথে দেখা করতে আসে। তারা আমার সাথে ভালো আচরণ করেছে। কিন্তু নিচে গিয়ে কিছু ভাংচুর করে। ব্যবস্থা নিতে আমি মিটিংয়ে বসেছি।

এছাড়া ঘটনার সামগ্রিক বিষয়ে চবি প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, আগেই তারা জানিয়েছে যে, তারা মিছিল করবে এবং শিক্ষকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছে সে বিষয়টি নিয়ে উপাচার্যকে জানাবে। পরে উপাচার্যের সাথে দেখা করে আসার পথে তারা অফিসে এবং নিচে থাকা কিছু গাড়ি ভাংচুর করে। আমরা মনে করেছিলাম তারা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের প্রতিবাদ জানাবে, তবে কেন তারা ভাংচুর চালালো তা আমাদের জানা নেই।

পদক্ষেপ ও নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এছাড়া ক্যাম্পাসে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। অতীতে সকল ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা সমস্ত ব্যবস্থাই গ্রহণ করেছি। তবে আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীনিকে ব্যবহার করি না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে রকম পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। আমরা প্রথমে সবার সাথে কথা বলে সমঝোতার চেষ্টা করি, তারপর পদক্ষেপ নিই। অতীতেও এমনই করেছি। তিনি আরো বলেন, বিষয়টি নিয়ে শহরে একটি মুভমেন্ট হচ্ছে। তাই আমরা মনে করি নাই যে তাদের সাথে জবরদস্তিমূলকভাবে এমন কিছু করব। যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে সে বিষয়ে তাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা যে অভিযোগ দায়ের করেছে সে বিষয়ে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। এ আশ্বাসের ভিত্তিতে তারা তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

তদন্ত কমিটি গঠন:

এদিকে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে শিক্ষককে হুমকি ও ছাত্রলীগের এক পক্ষের অপসারণের দাবির বিষয় খতিয়ে দেখতে আলদা দুইটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর মধ্যে হুমকির বিষয়ে তদন্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয় ফলিত ও পরিবেশ রসায়ন বিভাগের প্রফেসর ড. হেলাল উদ্দিনকে প্রধান ও সহকারী প্রক্টর নিয়াজ মোর্শেদ রিপনকে সদস্য সচিব করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রলীগের অপসারণ চেয়ে দেয়া স্মারকলিপি ও অন্যান্য অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. এ.এফ.এম আওরঙ্গজেবকে প্রধান করে ৪ সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, আইন অনুষদের ডিন প্রফেসর এবিএম আবু নোমান ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার (শিক্ষক নিয়োগ শাখা) হাসান মিয়া। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দুটি কমিটিকে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে অপসারণ নিয়ে গঠন করা কমিটির প্রধান ও ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. এ.এফ.এম আওরঙ্গজেব আজাদীকে বলেন, যত দ্রুত সম্ভব আমাদেরকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি। নির্দিষ্ট সময়ের বিষয়ে তিনি বলেন, এরকম কোনো সময়সীমা বেধে দেয়া হয়নি।

সাংবাদিককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত, মোবাইল ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা:

এদিকে এসকল ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে কর্তব্যরত সাংবাদিক মো. শাহজাহান খানকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী। তবে তাদের কাউকেই প্রাথমিকভাবে সনাক্ত করা যায়নি। ভুক্তভোগী শাহজাহান বিশ্ববিদ্যালয় যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ও বাংলাভিশন টেলিভিশনের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি।

শাহাজাহান আজাদীকে বলেন, ছাত্রলীগের অবরোধ চলাকালে ক্যামেরায় ভিডিও ধারণের সময় আমাকে মারধর করে ৫–৬ জন ছাত্রলীগ কর্মী। এসময় আমার মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া চেষ্টা করে তারা। আমি প্রক্টরের মাধ্যমে উপাচার্য বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।

শিক্ষক লাঞ্ছনার ৪৮ ঘন্টায়ও নিরব শিক্ষক সমিতি:

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক আমির উদ্দীনের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে হুমকির অভিযোগ ওঠার ৪৮ ঘন্টার পার হলেও নীরব ভূমিকায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। এ বিষয়ে এখনো কোন ধরণের বিবৃতিও পাওয়া যায়নি। জানতে চাইলে চবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. মিহির কুমার রায় আজাদীকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা এই মাত্র (গতকাল রাতে) জরুরি সভায় বসেছি। কি ধরণের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে। পদক্ষেপের বিষয়টি পরে জানানো হবে। -আজাদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!