ব্রেকিং নিউজ
Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | কেমন আছে নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে পড়া রোহিঙ্গারা ?

কেমন আছে নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে পড়া রোহিঙ্গারা ?

K H Manik Ukhiya Pic 01-04-2018 (1)

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া : কাঁটাতারে বিভাজিত দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার নিরপেক্ষ সীমানাকেই ডাকা হয় নো-ম্যানস ল্যান্ড নামে। জাতিগত পরিচয় আর জাতিরাষ্ট্রের নাগরিকত্বহীন রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের শিশুদের ক্ষেত্রে এমন স্থানই হয়ে উঠেছে বিনোদনকেন্দ্র। সেখানেই কুঁড়েঘর ও পানির পাম্পের কাছাকাছি ফাঁকা জায়গায় খেলছে রোহিঙ্গা শিশুরা। কেউ দড়ি নিয়ে লাফাচ্ছে, কেউ পাম্প থেকে পানি ছুড়ছে অন্য বন্ধুর দিকে। পাশেই গল্প করছে বড়রা। অস্থায়ী এই বাড়িগুলোর একটু পেছনেই কাঁটাতারের বেড়া। তার পেছনেই অস্ত্র হাতে মিয়ানমারের সীমান্ত পুলিশ। কাঁটাতারে ঘেরা বেড়া দিয়েই অপলক তাকিয়ে থাকেন দিল মোহাম্মদ নামে এক রোহিঙ্গা। নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশকে অতিক্রম করে তার চোখ খুঁজে ফেরে নিজের বসতভিটা। স্বপ্ন জাগে মনে, কোনও একদিন নিজ গ্রামে ফিরতে পারার স্বপ্ন। তবে নির্মম সত্য, মিয়ানমার-লাগোয়া নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করলেও চেকপয়েন্ট পেরিয়ে ভেতরে যাওয়ার সুযোগ নেই তার। দিল মোহাম্মদ একা নন। তার মতো করেই আরও ৬ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন এখানে। রাখাইনের সহিংসতা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে যারা ফিরে যেতে চায়, এরা ছিলেন তাদের প্রথম কাতারে। গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশকরে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেয় তারা। পালিয়ে আসা মানুষদের একটা ছোট অংশ থেকে যায় নো ম্যানস ল্যান্ডে, তমব্র“ চেকপয়েন্ট উখিয়া থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে। নো ম্যানস ল্যান্ড হলেও কার্যত এটি মিয়ানমারের মধ্যে। একটি ছোট খাল দিয়ে অঞ্চলটি বিভক্ত করেছে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সীমান্তকে। চেকপয়েন্টে থাকা মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশ রোহিঙ্গাদের রাখাইনে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তবে বাংলাদেশ সাড়া দিচ্ছে তাদের মানবিক আর্তিতে। খাবার স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সুবিধার জন্য তাদের আসতে হচ্ছে বাংলাদেশে।

এলাকাটি সরেজমিন পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা যায় দিল মোহাম্মদ ও বাকি রোহিঙ্গাদের তাই বাংলাদেশে সীমান্তে এসেই কথা বলতে হয়েছে। দাফতরিকভাবে দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার ওই নিরপেক্ষ অঞ্চলেই বাঁশের খুটি দিয়ে ঘর বানিয়েছে রোহিঙ্গারা। ঘরে প¬া্স্িটকের দেয়াল আর পলিথিনের ছাদ। এমন ঘরেই করতে হচ্ছে রাত্রিযাপন। খাবার পানির পাম্পের পাশ দিয়েই গেছে পয়নিস্কাশনের পাইপ। কাঁটাতারের বেড়া পেরোলেও চোখে পড়বে ছোট একটি পাহাড়। সেখানেই মিয়ানমারের সীমান্ত পুলিশের চেকপোস্ট। বেড়ার ওপাশেই কাদামাটির রাস্তায় এমন অসংখ্য চেকপোস্ট রয়েছে। দিল মোহাম্মদ ও আকতার কামাল বলেন, আমরা অন্যপাশে অনেক পুলিশ দেখি। মাঝে মাঝে পুলিশ বেড়ার ওপরে উঠে মাইকে ঘোষণা করে বলে যেন আমরা বাংলাদেশে চলে যাই।  চলতি মাসের প্রথমেই ওই অঞ্চলে উত্তেজনা তৈরি হয়। নিরাপত্তার অজুহাতে নতুন করে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেয় মিয়ানমার। কোথাও কোথাও কংক্রিটের দেওয়াল নির্মাণের মধ্য দিয়ে সুরক্ষা জোরদারের চেষ্টা করা হয়। কোথাও খোঁড়া বাঙ্কার, কোথাও আবার স্থাপন করা হয় সীমান্ত নিরাপত্তা চৌকি। রোহিঙ্গারা জানান, মিয়ানমার সীমান্তের দিকে তাকালে দেখা যায় ট্রাকে করে আসছে সীমান্তরক্ষীরা। তাদের হাতে তাঁক করা রাইফেল, চোখে সতর্ক অবস্থানের চিহ্ন।

ছমুদা খাতুন নামে এক রোহিঙ্গা নারী বলেন, মিয়ানমারে সেনাবাহিনী তার ও পরিবারের ওপর গুলি চালালে তিনি গ্রাম থেকে পালিয়ে আসেন। কিন্তু এখানেও খুব ভালো নেই তারা। তিনি বলেন, ‘এই আশ্রয়শিবিরে জীবন খুবই কঠিন। খুব গরম, রান্নার জন্য জ্বালানিও পাওয়া যায় না। ইউনিসেফের ডাক্তাররা মাঝে মাঝে আসেন, এছাড়া কোনও চিকিৎসা সুবিধাও পাওয়া যায় না। এর আগে রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও চিকিৎসা সেবা দেওয়া মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির প্রধান ফ্যাব্রিজিও কারবোনি বলেছিলেন, থাকার জন্য স্থানটি মোটেও নিরাপদ নয়। আর বাংলাদেশের দিকে বর্ডার গার্ড পুলিশ ছোট ছোট চেকপোস্টে রাইফেল নিয়ে পাহারা দিচ্ছে। পাঁয়ে হেঁটে অথবা ট্রাকে করে পেট্টল ডিউটি চালিয়ে যাচ্ছে তারা। কিছুদিন পরে আবার সেনা সরিয়ে নিতে থাকে তারা।

সেনা সরিয়ে নেওয়ার আগে মিয়ানমার সরকারের এক মুখপাত্র দাবি করেছিলেন, তাদের কাছে তথ্য আছে যে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির সেনারা সেখানে অবস্থান নিয়েছে। এজন্যই সেখানে সেনা উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছিল।  বাংলাদেশের বিপক্ষে কোনও অবস্থান নেননি তারা। তবে বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রশ্ন তোলে আদৌ কোনও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী সেখানে ছিল কি না। ওই অঞ্চলের বিজিবি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মনজুরুল হাসান খান বলেন, ‘গত ৭ মাসে আমি কোনও সন্ত্রাসী কার্যক্রম দেখিনি। আমি শুধু নিষ্পাপ শিশু ও নারীদেরই দেখেছি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রোহিঙ্গারা রাখাইনে থাকলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। উগ্র বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে সেখানকার সেনাবাহিনী ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে স্থাপন করেছে সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের চিহ্ন। ছড়িয়েছে বিদ্বেষ। ৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনে পরিচয়হীনতার কাল শুরু হয় রোহিঙ্গাদের। এরপর কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনও নিবন্ধনপত্র, কখনও নীলচে সবুজ রঙের রশিদ, কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড, কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের রং-বেরঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে। ধাপে ধাপে মলিন হয়েছে তাদের পরিচয়। ক্রমশ তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন বেনাগরিকে। জানুয়ারিতে সম্পাদিত ঢাকা-নেপিদো প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নেওয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশের পাঠানো প্রথম ৮ হাজার ৩২ জন রোহিঙ্গার তালিকা নিয়েই শুরু হয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এর ফরম্যাট বদল করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় অপরিহার্য শর্ত হিসেবে চাওয়া হয়েছে বৈধ কাগজপত্র। অথচ বেশিরভাগ রোহিঙ্গা পুড়ে যাওয়া সম্বল ফেলে পালিয়ে এসেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডবি¬উ) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রত্যাবাসন চুক্তিকে মিয়ানমারের ধোঁকাবাজি আখ্যা দিয়েছে। অনেকেই মিয়ানমারে ফিরতেই চায় না। বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন বিষয়ক কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, এখনও কিছু কাজ বাকি আছে। যারা ফিরে যাবে, তারা কোথায় যাবে সেই বিষয়টিও এখনও ঠিক হয়নি।

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সামরিক-বৌদ্ধতন্ত্রের প্রচারণায় রাখাইনে ছড়ানো হয়েছে রোহিঙ্গা-বিদ্বেষ। ২০১৬ সালের আগস্টে অভিযান জোরদার করার আগের কয়েক মাসের সেনাপ্রচারণায় সেই বিদ্বেষ জোরালো হয়। এরপর শুরু হওয়া সেনা-নিধনযজ্ঞের অংশ হিসেবে হত্যা-ধর্ষণ ও ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়ার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের মাধ্যমে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য করা হয় লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে। পুড়িয়ে দেওয়া রোহিঙ্গা আবাস বুলডোজারে গুড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করা হয় মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত। এক পর্যায়ে সেনা অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হলেও অব্যাহত থাকে জাতিগত নিধন। এরপর সামরিকায়নকে জোরালো করতে অবশিষ্ট ঘরবাড়িও নিশ্চিহ্ন করা হয়। ঘোষণা দেওয়া হয় জমি অধিগ্রহণের। শুরু হয় অবকাঠামোসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন। কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির উপ-অধিনায়ক মেজর ইকবাল আহমদ জানান, সীমান্তের পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। মিয়ানমারও অতিরিক্ত সৈন্য তাদের দেশের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*