ব্রেকিং নিউজ
Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | কর্ণফুলীতে তেলচুরির অবাধ রাজত্ব যার

কর্ণফুলীতে তেলচুরির অবাধ রাজত্ব যার

image-88101

নিউজ ডেক্স : দিনের আলো কিংবা রাতের আঁধারে সরকারি পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ বহু কোম্পানির হাজার হাজার লিটার তেল চুরি হচ্ছে অহরহ। আর এই চুরির প্রধান হোতা হিসেবে নাম উঠে আসছে কর্ণফুলী জুলধা ইউনিয়নের ৭ নং পাইপের গোড়া এলাকার আব্দুস শুক্কুরের (৪০), যিনি ‘জলদস্যু’, ‘চোরাকারবারি’ এমন নানা অভিধায় এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর বিভিন্ন ঘাট ও ডিপোতে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব তথ্য। স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বছরের পর বছর লোপাট করা হচ্ছে সরকারি তেল। আর এর মাধ্যমে বিপুল বিত্ত গড়ে তোলেন একসময়ের কপর্দকশূন্য শুক্কুর।

জানা যায়, যুবক বয়সে শুক্কুর মেষ চড়াতেন জুলধার হাশেম মেম্বারের। একসময় তার পরিচয় হয় চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের জলদস্যু আবুল কালামের সঙ্গে। জাহাজের রশি কাটা দিয়ে ডাকাতিতে তার হাতেখড়ি হয় বলে জনশ্রুতি আছে।

স্থানীয় পর্যায়ে প্রচলিত আছে, ২০০৫ সালের আগে সন্দ্বীপ চ্যানেলে ডাকাতি ও কর্ণফুলী নদীতে জলদস্যুতা করে শুক্কুর বনে যান নামকরা ডাকাত। এর পর থেকে তাকে অনেকে চেনে ‘মাদারি শুক্কুর’, ‘ডাকাত শুক্কুর’ ও ‘জলদস্যু ত্রাস শুক্কুর’ নামে। তার নামের পাশে নতুন বিশেষণ ‘চোরাকারবারি তেলচোর শুক্কুর’। এখন কর্ণফুলী নদীতে একচেটিয়া রাজত্ব তার।

১৯৯৬ সালে প্রথম বসতিবাড়িতে ডাকাতির খবর জানা যায় শুক্কুরের বিরুদ্ধে। বড়উঠোন ইউপির শাহমিরপুর গ্রামের পল্লী ডাক্তার রনধীর বড়ুয়ার বাড়িতে ডাকাতি করে শুক্কুর ও তার বাহিনী।

জলদস্যুতা আর ডাকাতি থেকে মোড় পাল্টে শুক্কুর আজ তেল ব্যবসায়ী সেজেছেন। সামান্য ডিজেল, কেরোসিন ব্যবসার গ্রাম্য লাইসেন্স নিয়ে নদীতে থাকা জাহাজ ও ডিপো থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার তেল চুরি করছেন বলে অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।

এমনকি বিভিন্ন মাদক, বিয়ারসহ বিদেশি চোরাই পণ্য খালাস করা তার নিত্যদিনের কারবার বলে জানান অনেক সাম্পান ও ঘাটশ্রমিক। এসব কাজের জন্য গড়ে উঠেছে তার একটি বাহিনী ও সিন্ডিকেট। কোনো সুনির্দিষ্ট বৈধ ব্যবসা না থাকলেও দিনে দিনে বনে যান বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক।

বিভিন্ন মাধ্যমে শুক্কুরের বিপুল সম্পদের খোঁজ জানা গেছে। জুলধা ইউনিয়নের পাইপের গোড়া বাজারে কানু মাঝির পুকুর ভরাট করে তৈরি করেছেন তিনতলা মার্কেট। ওই পুকুরের উত্তর পাশে মাটির নিচে স্থাপন করেছেন একটি চোরাই তেলের ডিপো। পশ্চিম পাশে কানু মাঝির বাড়ির কাছে আরেকটি দ্বিতল আলিশান বাড়ি তার। এর ২০০ গজ উত্তরে ওবায়দুল হাকিমের পুরাতন বসতবাড়িতে বানিয়েছেন পশ্চিমা ধাঁচে দোতলা বাড়ি। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে তার ৬৪০ গন্ডা জমি রয়েছে বলে জানা গেছে।

জুলধা এলাকার আব্দুল জলিল নামের এক ব্যক্তি জানান, শুক্কুরের গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট খুলনার কুখ্যাত এরশাদ সিকদারের চেয়েও ভয়ংকর। তার বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস করেন না। শুক্কুরের এই ক্ষমতার পেছনে স্থানীয় কিছু নেতা ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ করছেন রফিক মাঝিসহ স্থানীয় কয়েকজন অধিবাসী।

কর্ণফুলী নদীর ৯ নং ঘাট দিয়ে এখনো রাতে কিংবা দিনে শুক্কুর তার চোরাকারবারি ব্যবসা চালাচ্ছেন। স্থানীয়রা জানান, শুক্কুরের এসব অবৈধ কারবারের রাজসাক্ষী তার ছেলে মনির আহম্মেদ। তারও রয়েছে নিজস্ব বাহিনী, যেখানে আছে তাহের ও কায়সার নামের কুখ্যাত চোরাকারবারি ও  মাদক ব্যবসায়ীরা।

২০১৪ সালে কর্ণফুলী নদীর ১৪ নং ঘাট দিয়ে শুক্কুরের ইয়াবা ব্যবসা ছিল বলে জানা যায়। এর ৫০ শতাংশ শেয়ার ছিল জাফর আহমেদ নামে আরেক চোরাকারবারির, যিনি পরে র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন। পরে শুক্কুর নিজেই তার ব্যবসা পাতেন। বন্দরের ১৮ নং ঘাটে তার রয়েছে নিজস্ব দুটি স্পিডবোট। এগুলো তেল ও মাদক পাচারের কাজে ব্যবহার করা হয়।

শুক্কুরের চোরাকারবারি চক্রের অন্যতম সদস্য হিসেবে যাদের নাম জানা যায় তাদের মধ্যে রয়েছে মো. ইউনুস, মো. ইলিয়াছ, আলি আহমেদ, সেলিম, জানে আলম, সোর্স মো. জহুর, সোর্স মো. ইউসুফ, মো. জাফর মনির আহমেদ, তাহের, কায়সার ,আব্দুল মন্নান, মো. মুছা, মো. হাসান, মো. ইসমাঈল প্রমুখ। তারা সবাই জুলধা ইউনিয়ন ও কর্ণফুলী এলাকার বাসিন্দা বলে জানা যায়।

শুক্কুরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় রয়েছে বহু মামলা, অভিযোগ ও জিডি। চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চাঁদাবাজি মামলা সিআর ৪৪/১৭, বন্দর থানার জিআর মামলা নং ২১৫৫/৯৬, পটিয়া থানায় ০১/৯৬, কর্ণফুলী থানার জিআর মামলা নং ১০/২০০২, স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল মামলা নং ১২২/আদেশ নং ১৫ ,কর্ণফুলী থানার মামলা নং ০১/২০০৯ ,বন্দর থানা মামলা নং ২২/৯৬।

এ ছাড়া হত্যা ও হুমকির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে ১৮ ডিসেম্বর করা কর্ণফুলি থানায় পিপিআর নং ১৬২৭, জিডি ও অভিযোগ ২২/৯৬, ১৭৮১/১৬, পতেঙ্গা থানার পিপিআর নং ২১৯৩, ২০১৭ সালের ৯ মার্চ পিপিআর নং ৩৬০/১৭। তার আপন ভাইও ২০১৬ সালে শুক্কুরের বিরুদ্ধে জিডি করেন কর্ণফুলী থানায়, পিপিআর নং ১৭৮১।

১৯৯৩ সালে চরলক্ষ্যায় আলিম উদ্দিনের বাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়ে অস্ত্রসহ ধরা পড়েছিলেন শুক্কুর। ওই অস্ত্র ও ডাকাতি মামলায় পরে ১০ বছরের সাজা হয় তার। কিন্তু তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ান পুলিশের নাকের ডগায়।

২০০৫ সালের দিকে জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এক রিকশাচালক খুন হয়। এ ঘটনায় শুক্কুরের নাম আসে। ২০০৮ সালে কর্ণফুলীর ডায়মন্ড সিমেন্ট ফ্যাক্টরির পাশে শুক্কুরের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত সয়াবিন তেল উদ্ধার করে যৌথ বাহিনী। চোরাচালান আইনে শুক্কুরের বিরুদ্ধে মামলা হয় কর্ণফুলী থানায়, যা আদালতে চলমান।

২০০৯ সালে জুলধা ইউনিয়নের মাতব্বরঘাটে আবুল অ্যান্ড সন্স নামের তেলের দোকানে ডাকাতি হয়। দোকানের মালিক আবুল বশর বাদী হয়ে শুক্কুরের বিরুদ্ধে কর্ণফুলী থানায় মামলা করেন যা বর্তমানে বিচারাধীন বলে জানা যায়। এ রকম ডজন খানেক আলোচিত মামলা শুক্কুরের নামে থাকলেও প্রশাসনের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন তিনি।

শুক্কুরের প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে স্থানীয় শ্রমিকদের সংগঠন ‘পতেঙ্গা তেলের ট্যাংকার কর্মচারী পারাপার সাম্পান শ্রমিক ইউনিয়ন (রেজি.-২৩৭৯) ডাঙ্গারচর, জুলধা ইউনিয়নের শতাধিক সদস্য স্থানীয় সাংসদ ভূমি প্রতিমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছিল।

কিছুদিন আগে বেসরকারি টিভি চ্যানেল যমুনা টেলিভিশনের ‘৩৬০ ডিগ্রি’ অনুষ্ঠানে শুক্কুরের অবৈধ ব্যবসা নিয়ে প্রতিবেদন প্রচারিত হয়, যার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যমতে, জুলধা ইউনিয়নের ডাঙ্গারচর ৯ নং ঘাট শুক্কুরের চোরাকারবারের প্রধান আস্তানা। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার তেলের পাইপ ছিদ্র করে প্রতিদিন রাতে বিপুল পরিমাণ তেল সেখানে মজুদ করা হয়। মূলত এসব কোম্পানির নাইট গার্ড ও কতিপয় কর্মচারীর সহায়তায় এ অপকর্ম চলে। এমনকি দেশীয় লাইটারেজ জাহাজ ও বিদেশি তেলের জাহাজ থেকেও টলিযোগে  চোরাই তেল কানু মাঝির পুকুরপাড়ের গোপন তেলের ডিপোতে মজুদ করেন শুক্কুর। পরে তা পটিয়ার শান্তিরহাট, পটিয়া ও কর্ণফুলী এলাকার বিভিন্ন তেলের দোকানে বিক্রি করা হয়।

আমাদের অনুসন্ধানে একটি তথ্য পাওয়া যায়, শুক্কুর বারবার স্থানীয় সাংসদ ভ’মি প্রতিমন্ত্রী জাবেদের সংস্পর্শ পেতে চাইলেও এসব বিতর্কিতদের প্রশ্রয় দেননি তিনি। তবে ২০১৪ সালে ভূমি প্রতিমন্ত্রীকে ভুল তথ্য দেন কর্ণফুলী এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নেতারা। তারা শুক্কুরের পক্ষে সাফাই শুনিয়েছিলেন প্রতিমন্ত্রীকে জুলধা এলাকার ৫০০ জাহাজ শ্রমিকের কাজ একজন প্রভাবশালী নেতা (প্রয়াত) ‘ভাগিয়ে নিচ্ছেন’ অভিযোগ করে। ফলে আবার কর্ণফুলী নদীর রাজত্ব চলে যায় শুক্কুরের হাতে।

তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আবদু শুক্কুর সেসব অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। জায়গা-জমি নিয়ে আমার ভাইদের সাথে মামলা-মোকদ্দমা হওয়ায় তারা আমার বিরুদ্ধে এসব করছে। আমার লাইসেন্স আছে। আমি একজন তেল ব্যবসায়ী।’

কিন্তু শুক্কুরের কোনো বৈধ ব্যবসা নেই বলে দাবি করেন জুলধা এলাকার রফিক মাঝি। তার ভাষ্য, ‘শুক্কুর ঘাটে ঘাটে পয়সা দিয়ে দিনে ১০ লাখ টাকার সরকারি তেল চুরি করে। কিন্তু প্রশাসন দেখেও দেখছে না। আমরা সমিতির পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে লিখিত অভিযোগ করেছি। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীকে জানাব কীভাবে সরকারি তেল চুরি করছে শুক্কুর।’

এ বিষয়ে কর্ণফুলী জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (বন্দর জোন) সৈয়দ মো. আবু সায়েম বলেন, ‘যত বড় মোস্ট ওয়ান্টেড কিংবা প্রভাবশালী হোক সঠিক তথ্য-প্রমাণ পেলে তাদের গ্রেপ্তার করার দায়িত্ব আমাদের।’ কর্ণফুলীতে চলমান অভিযানে দ্রুত মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

সূত্র : ঢাকাটাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*