Home | উন্মুক্ত পাতা | ইতিহাসের স্মারক আশুরা: আত্মসমীক্ষা ও আত্মপুনর্গঠনের আহবান

ইতিহাসের স্মারক আশুরা: আত্মসমীক্ষা ও আত্মপুনর্গঠনের আহবান

আবু বকর মুহাম্মদ হানযালা: ইসলামিক হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস ‘মুহাররামুল হারাম’ তথা মুহাররম। এটি কেবল নতুন বছরের সূচনাই নয়, বরং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ একটি মাস। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদিসে এই মাসটিকে ‘শাহরুল্লাহ আল-মুহাররাম’ বা ‘আল্লাহর মাস মুহাররম’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। পুরো বছরের যে কয়েকটি মাসকে মহান আল্লাহ তাআলা বিশেষ গুরুত্ব ও মহিমায় অনন্য করেছেন, মুহাররম তার মধ্যে অন্যতম। ​

পবিত্র কুরআন মাজীদে বছরের মাসগুলোর গণনা এবং এই মাসের বিশেষ মর্যাদার কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। সূরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে—​“আসমান ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধান অনুযায়ী মাসের সংখ্যা বারোটি। এর মধ্যে চারটি মাস বিশেষ সম্মানের অধিকারী। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত ও চিরন্তন দ্বীন।

অতএব, তোমরা এই মাসগুলোতে (পাপাচারে লিপ্ত হয়ে) নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।” রাসুল (সা.) মিনার খুতবায় ঘোষণা করেন আল্লাহ আসমান‑জমিন সৃষ্টি করার দিন থেকে বছরের মাস সংখ্যা বারোটি, তার মধ্যে চারটি মাস পবিত্র: “যুল‑ক্বিদাহ, যুল‑হিজ্জাহ, মুহররম ও রজব।কুরআন ও হাদিসের এই বর্ণনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মুহাররমের এই পবিত্র দিনগুলো অন্যায়, জুলুম এবং পাপাচার বর্জন করে আত্মশুদ্ধি অর্জন এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে।

বিশেষভাবে এই মুহাররম মাসের ১০তারিখ মুসলিম উম্মাহর মাঝে এক অনন্য তাৎপর্য বহন করে,যা পবিত্র আশুরা হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসের দর্পণে পবিত্র আশুরা নবীদের মুক্তি ও সত্যের বিজয়ের এক ঐতিহাসিক স্মারক।এ দিনেই মহান আল্লাহ তাআলা লোহিত সাগর দ্বিখণ্ডিত করে হজরত মুসা (আ.) ও বনী ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং অহঙ্কারী ফেরাউনকে সলিলসমাধি করেছিলেন। এছাড়া মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর তওবা কবুল, মহাপ্লাবনের ভয়াবহতা অতিক্রম করে হজরত নুহ (আ.)-এর কিশতি(নৌকা) জুদি পর্বতে নিরাপদে অবতরণ, জালিম নমরুদের প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ড থেকে আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্য শীতল দান ও নিরাপদে অলৌকিক মুক্তি,দীর্ঘ পরীক্ষা শেষে সাগরে মাছের উদর থেকে হজরত ইউনুস (আ.) মুক্তি লাভ এবং আঠারো বছরের কঠিন রোগভোগের পর হজরত আইয়ুব (আ.) সুস্থতা লাভের ঘটনাও এই দিনের সাথে জড়িয়ে আছে।

একইভাবে, আল্লাহর অনুগ্রহে হজরত দাউদ (আ.) জালুতের শক্তিশালী বাহিনীকে পরাজিত করেন এবং হজরত ঈসা (আ.) শত্রুদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা পেয়ে সশরীরে আসমানে উত্তোলিত হন। পবিত্র আশুরার দিন রোজা রাখার ব্যাপারে রাসুল (সা.) বিশেষভাবে উৎসাহ প্রদান করেছেন। আশুরার রোজা নবী-রাসুলদের সুন্নত এবং মহানবী (সা.) মক্কা ও মদিনা উভয় সময়েই তা পালন করেছেন। মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ (সা.) জানতে পারলেন, এদিনে মুসা (আ.) সিনাই পর্বতে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওরাত লাভ করেন।

এদিনেই তিনি বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের কয়েদখানা থেকে উদ্ধার করেন এবং এদিনেই তিনি বনি ইসরাইলদের নিয়ে লোহিত সাগর অতিক্রম করেন। আর ফেরাউন সেই সাগরে ডুবে মারা যায়। তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য ইহুদিরা এদিন রোজা রাখে। মহানবী (সা.) বললেন, মুসা (আ.)–এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তাদের চেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ। তাই তিনি ইহুদিদের থেকে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে মহররমের ৯-১০ অথবা ১০-১১ তারিখে দুটি রোজা রাখার নির্দেশনা দেন। দ্বিতীয় হিজরিতে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোজা নফল হয়ে যায়, তবে রমজানের পর এটি সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ নফল রোজা এবং এ মাসের নফল ইবাদতের মর্যাদাও বিশেষভাবে উচ্চ। উম্মুল মুমিনিন হজরত হাফসা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) চারটি আমল কখনো ত্যাগ করেননি: আশুরার রোজা, জিলহজের প্রথম দশ দিনের রোজা, প্রতি মাসের আইয়ামে বীদ-এর রোজা এবং ফজরের ফরজের আগে দুই রাকাত সুন্নত। (সুনানে নাসাঈ, মুসনাদে আহমাদ)।

তাছাড়া পরিবারের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তম খাবারের ব্যবস্থা করার গুরুত্ব অত্যাধিক। মুহাররমকে কেন্দ্র করে সমাজে নানা কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। এ মাসে বিয়ে না করা, নতুন ঘর নির্মাণ বা কোনো শুভ কাজের সূচনা থেকে বিরত থাকা, গোশত বা পান না খাওয়া, নতুন পোশাক পরিহার করা কিংবা সাদা বা কালো শোকের পোশাককে বাধ্যতামূলক মনে করা—এসবের কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই। ইসলামে মুহাররম মাস ইবাদত, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মাস; অমূলক কুসংস্কারের নয়। কুরআন-হাদিসের আলোকে পবিত্র মুহাররম মাসে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় বিষয় সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়:১. সিয়ামের মাধ্যমে ইবাদতে নিমগ্ন হওয়া।২. ইসলামী স্বাতন্ত্র্য ও মুসলিম পরিচয় বজায় রাখা।৩. তাওবা ও ইস্তিগফারে অধিক মনোনিবেশ করা।৪. সকল প্রকার পাপাচার থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকা।৫. আত্মসমীক্ষা ও আত্মপুনর্গঠনের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।

ইতিহাসের ধারায় এই আশুরার দিনটির সাথে কারবালার প্রান্তরের হৃদয়বিদারক ঘটনাও গভীরভাবে স্মরণীয়। ৬৮০ খ্রি. মোতাবেক ৬১ হিজরির এই দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর সাথীদের আত্মত্যাগ অন্যায়, জুলুম ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের অবিচল অবস্থানের এক চিরন্তন প্রতীক। কারবালার এই চেতনা মুসলিম উম্মাহকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান গ্রহণ, ধৈর্য ধারণ এবং নৈতিক দৃঢ়তার শিক্ষা প্রদান করে।

অতএব,হিজরি নববর্ষের সূচনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সময়ের প্রতিটি অধ্যায় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একেকটি আমানত। পবিত্র মুহাররম সেই আমানতের সূচনালগ্ন, যা ইবাদত, তাওবা, আত্মসমালোচনা ও নেক আমলের মাধ্যমে নতুন করে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার আহ্বান জানায়। তাই আসুন, আনুষ্ঠানিকতা ও কুসংস্কারের গণ্ডি পেরিয়ে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত আমলে নিজেদের সমৃদ্ধ করি, পাপ থেকে ফিরে আসি এবং নতুন হিজরি বর্ষকে ঈমান, তাকওয়া ও সৎকর্মে সমৃদ্ধ এক জীবনের সূচনা হিসেবে গ্রহণ করি।

লেখক : শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। মোবাইল : 01701657137

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!