Home | ব্রেকিং নিউজ | লোহাগাড়ায় মানবসৃষ্ট কারণেই মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় হচ্ছে

লোহাগাড়ায় মানবসৃষ্ট কারণেই মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় হচ্ছে

234

এলনিউজ২৪ডটকম : লোহাগাড়ায় মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে বলে পরিবেশবাদীরা সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে অভিযোগ করেছেন। তারা বলছেন, উপজেলার সর্বত্র ব্যাঙের ছাতার মতো ইটভাটা স্থাপন, পাহাড় কাটা, অবৈধ বালু উত্তোলন ও চাষাবাদযোগ্য জমির টপসয়েল ইটভাটায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবৈধ বসতী স্থাপনই পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। তারা এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবী করেছেন।

জানা যায়, উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নে সর্বমোট ২১টি ইটভাটা রয়েছে। ইউনিয়নটি পার্বত্য বান্দরবান জেলার বনাঞ্চল ঘেঁষে অবস্থিত। এখানে বিপুল পরিমাণ বনভূমি রয়েছে। ভাটার নির্গত ধোঁয়ায় বনাঞ্চলের পশুপাখিরা আবাস হারাচ্ছে। খাদ্য ও আবাস হারিয়ে বন্যহাতিরা লোকালয়ে হানা দিচ্ছে।

কয়েকদিন আগে ইউনিয়নের কালোয়ার পাড়ার উত্তর পার্শ্বে আদর্শ গ্রাম সংলগ্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চল কেটে প্রভাবশালীরা ইটভাটা নির্মাণ করার সময় লোহাগাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদ্মাসন সিংহের নেতৃত্বে গঠিত ভ্রাম্যমান আদালত লক্ষাধিক ইট, ৪টি ডাম্পট্রাক ও ২টি এস্কেভেটর জব্দ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের নির্দেশে এ অভিযান পরিচালিত হয় বলে জানা গেছে।

উপজেলার পদুয়া তেওয়ারীখীল, কলাউজান, পশ্চিম কলাউজান, চরম্বার বিবিবিলা, চুনতি অভয়ারণ্য, বড়হাতিয়া বায়তুশ শরফ, লোহাগাড়া দরবেশহাট সংলগ্ন বোয়ালিয়াকুল, কলাউজান কালীবাড়ি সংলগ্ন স্থানে অর্ধশতাধিক ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটার কোন বৈধ লাইসেন্স নেই বলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু আসলাম জানিয়েছেন। তিনি বলছেন, ভাটার মালিকরা জেলা প্রশাসক বরাবরে দরখাস্ত দিয়ে ভাটার কাজ শুরু করেন।

বর্তমানে এসব ইটভাটায় অসংখ্য বহিরাগত শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের ব্যাপারে তথ্য প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট ভাটা মালিকদের প্রতি আদেশ দিয়েছেন বলে লোহাগাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

পুলিশের ধারণা এসব ভাটায় কর্মরত শ্রমিকরা বেশীরভাগ রোহিঙ্গা কিংবা জঙ্গি তৎপরতার সাথে জড়িত। তারা আগামী নির্বাচনে সহিংসতা চালাতে পারে বলে পুলিশ এ আদেশ জারী করেছেন।

সরেজমিনে জানা যায়, পদুয়া ফরেষ্ট অফিস সংলগ্ন বার আউলিয়া কলেজের সামনে দক্ষিণ পার্শ্বে তেওয়ারীখিল সংলগ্ন স্থানে ধানী জমির উপর স্থাপিত ইটভাটায় ব্যাপকহারে চাষাবাদযোগ্য জমির টপসয়েল ব্যবহৃত হচ্ছে।

লোহাগাড়া টংকাবতী খালের উপর অবস্থিত রাবারড্যাম সংলগ্ন জমিতে কয়েকটি ইটভাটা রয়েছে। ফলে রবি মৌসুমে কিংবা ধান আবাদের সময় ব্যাপকহারে পানি শোষিত হয়। ফলে চাষাবাদে বিপর্যয় ঘটে বলে লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামিম হোসেন জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে তিনি ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

উপজেলার টংকাবতী, হাঙ্গর, ডলু, সরই, হাতিয়া ও পাগলি খালে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে বিরামহীনভাবে। এই অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে এমচরহাট কেয়াজুপাড়া সড়কের হাসনাভিটা এলাকায় সরইখালের ব্রীজ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। টংকাবতী খালের রাজঘাটা এলাকায় আঁড়ি বাঁধ দিয়ে স্রোত পরিবর্তন করে হাজারের অধিক সিএফটি বালু কেটে নিয়েছে প্রভাবশালীরা। ফলে রাজঘাটা এলাকার জনসাধারণ আগামী দিনে ভাঙ্গনের আশংকায় রাতযাপন করছেন।

উপজেলার চুনতি ফরেষ্ট রেঞ্জ অফিসের আওতাধীন সাতগড় বনবিটে পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ বসতি স্থাপন করছেন প্রভাবশালীরা। অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট বনবিট কর্মকর্তা একর প্রতি নির্দিষ্টহারে টাকা আদায় করে অবৈধ বসতী স্থাপনকারীদের অনুমতি দিচ্ছেন। চুনতির সচেতন মহল এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁরা এই ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবী জানিয়েছেন। মৌখিকভাবে বিষয়টি উপজেলা বন রক্ষা কমিটির সভায়ও জানানো হয়েছে বলে তারা জানান। চুনতি রেঞ্জ অফিসের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবৈধ পানবরজ স্থাপন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বহু লেখালেখি হয়েছে। তারপরও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, হচ্ছেনা। এ ব্যাপারে সাতগড় বিট কর্মকর্তা মাসুদ পারভেজ বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

উপজেলার বড়হাতিয়ার জঙ্গল রশিদেরঘোনা, কুমিরাঘোনা, হরিদাঘোনাসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চল বেদখল হয়ে যাচ্ছে বলে এলাকাবাসীরা জানিয়েছেন। তবে রেঞ্জ বন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যমূলক।

লোহাগাড়ার যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়ছে বলে এলাকাবাসীরা উপজেলা প্রকৌশলী বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তবে উপজেলা প্রকৌশলী প্রতিপদ দেওয়ান জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে তার কাছে কোন লিখিত অভিযোগ নেই। অভিযোগে প্রকাশ, এলাকার কাঁচা রাস্তায় ইট, বালু ও কাঠবাহী ভারী যানবাহন চলাচল নিত্যনৈমত্তিক। ভারী গাড়ির চাপে রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

এ সমস্যা দীর্ঘদিন প্রকট আকার ধারণ করায় জনদূর্ভোগও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে তারা বলছেন। পশু-পাখি আবাসস্থল ও বনভূমি রক্ষায় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এমন প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*