ব্রেকিং নিউজ
Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | রোহিঙ্গারা আশ্রয় শিবিরে নয়, নিজ বসতবাড়িতে ফিরতে চায়

রোহিঙ্গারা আশ্রয় শিবিরে নয়, নিজ বসতবাড়িতে ফিরতে চায়

K H Manik Ukhiya Pic 27-12-2017 (3)

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া : মিয়ানমারে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছে রোহিঙ্গারা। তাদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে সামরিক বাহিনী। সেখানে গিয়ে থাকতে হবে সেনাদের তৈরি ক্যাম্পে। সেই ক্যাম্প থেকে বের হওয়া যাবে না। তার ওপর সামরিক বাহিনীর তৈরি তালিকা অনুযায়ী গ্রেফতারের আশঙ্কাও রয়েছে। অনেকটা গৃহবন্দী অবস্থায় প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গাদের দিন কাটাতে হবে। এরকম একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছে। সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপের সময় তাদের অনেকেই এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। তাদের ভয়ের কথা জানিয়েছেন। বুচিডং জেলার কোয়াইচং পাড়া গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক আমান উল্লাহ জানান, বুচিডং জেলার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত কোয়াইচং গ্রামের অধিকাংশ পরিবার বিত্তশালী। গ্রামের মাতবর, সর্দার ও হুক্কট্টাদের (চেয়ারম্যান) সঙ্গে রাখাইন সরকারি কর্মকর্তাদের ছিল ভালো সম্পর্ক। যে কারণে মিয়ানমারের সেনা, বিজিপি ও উগ্রপন্থী রাখাইন জনগোষ্ঠী ইতিপূর্বে কোয়াইচং গ্রামে কোনো প্রকার ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেনি। এক কথায় কোয়াইচং গ্রামের মানুষ সুখেই দিন কাটাচ্ছিল। কিন্তু হঠাত্ সেনাসহ সবার আচরণ বদলে যাওয়ায় আমরা পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি। চলতি মাসের ২ ডিসেম্বর রাখাইন থেকে চলে আসা কোয়াইচং গ্রামের হুক্কট্টা এনায়েত উল্লাহ জানান, ওই রাতে সেনা ক্যাম্প থেকে ফোন করে জানানো হয়, বুচিডংয়ের পুরাতন সেনা ডিভিশন বদলি হয়ে চলে যাচ্ছে, নতুন যারা আসবে তাদের সঙ্গে তোমাদের পরিচয় নেই। তারা তোমাদের ক্ষতি করতে পারে। তাই তোমরা রাতের মধ্যে অন্যত্রে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করো। এর কিছুক্ষণ পরে ২ রাউন্ড ফাঁকা গুলি বর্ষণ করা হয় হুক্কাট্টার বাড়ি লক্ষ্য করে। এ ঘটনায় পুরো কোয়াইচং গ্রামে হৈচৈ পড়ে যায়। যে যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায় বাড়ি-ঘর ত্যাগ করে পালিয়ে যেতে শুরু করে। হুক্কাট্টা জানান, তার বাড়িটি দোতালা। তার বাড়িতে অনেক সময় মিয়ানমার সেনা, বিজিপি সদস্যরা খাওয়া-দাওয়া করেছে। হঠাত্ করে এমন পরিবর্তন কোনোদিন আশা করিনি। জানলে আগে থেকেই মালামাল, টাকা-পয়সা, স্বর্ণালঙ্কার এ দেশে পাঠিয়ে দিতাম। গতকাল বুধবার উখিয়ার মধূরছড়া ক্যাম্পে তার সঙ্গে আলাপ করার সময় তিনি কেঁদে উঠে বলেন, আমার বাড়িতে দৈনিক ১৮/২০ জন শ্রমিক কাজ করেছে। আর আজ আমাকে এখানে একমুঠো খাবারের জন্য ত্রাণের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। রোহিঙ্গা নেতা ডা. আরিফ গত ৪ দিন আগে কোয়াইচং গ্রাম থেকে পরিবারসহ রওয়ানা হয়ে প্রায় ২শ মাইল পথ অতিক্রম করে সীমান্তের আঞ্জুমানাপাড়া দিয়ে কুতুপালংয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি জানান, নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ইচ্ছের ওপর। কিন্তু বাংলাদেশের উদ্বাস্তু শিবিরে বসবাসরত কয়েক লাখ রোহিঙ্গা ভয় পাচ্ছে স্ব দেশে ফিরতে। দেশে ফিরতে ভয় পাওয়ার কারণ কী জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, মিয়ানমার সরকারের ওপর রোহিঙ্গারা আস্থা রাখতে পারছে না। স্থানীয় বৌদ্ধদের বিষয়েও আতঙ্ক কাজ করছে তাদের মধ্যে। অন্য দিকে রোহিঙ্গাদের ওপর যারা গণহত্যা চালিয়েছে, সেই সেনাবাহিনী বলছে, শুধু অল্পসংখ্যক রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয়া হবে। তাই স্বদেশে ফিরে যাওয়া নিয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তির সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৫ আগস্টের পর থেকে শুরু হওয়া সেনাবাহিনীর নিপীড়নের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চল এখন কার্যত জনশূন্য। জাতিসঙ্ঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব সম্প্রদায় ওই ঘটনাকে সরাসরি জাতিগত নিধন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এরপর বিশ্ব সম্প্রদায়ের চাপে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য চুক্তি করলেও বিশেষজ্ঞরা এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। ইতোমধ্যে মিয়ানমারের অনেক কর্মকর্তা বলেছেন, ফিরিয়ে নেয়ার পর রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে রাখা হবে। এ লক্ষ্যে নাকি দু’টি ব্যারাকও নির্মাণ করা হয়েছে। আর এ বিষয়টি নিয়ে শঙ্কায় আছেন রোহিঙ্গারা। তারা তাদের পিতৃভিটায় ফিরতে চান, যেখানে তারা বসবাস করেছেন কয়েক পুরুষ ধরে। ক্যাম্পে বাসিন্দা হয়ে ফিরতে চান না রোহিঙ্গারা। ১৯৯১ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া মোহাম্মদ আলম জানান, সেনা অভিযানের সময় স্থানীয় রাখাইন বৌদ্ধরাও রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনে সহায়তা করেছে। তাই তারা যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চাইবে না, সেটি স্পষ্ট। তাদের অনুমতি সাপেক্ষে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার বিষয়টি সরকারের একটি অজুহাত বলেও ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ফেরত নেয়ার আগে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রমাণও দিতে হবে বলে জানিয়েছে মিয়ানমার সরকার। কিন্তু অনেক বছর ধরেই রোহিঙ্গাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। তাদের” জাতীয় পরিচয়পত্রও কেড়ে নেয়া হয়েছে। তাই নাগরিকত্বের স্বীকৃতি বিষয়ে কোনো প্রমাণ অনেকের কাছেই নেই। উখিয়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ক চুক্তিতে বলা হয়েছে- এই প্রক্রিয়ায় জাতিসঙ্ঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক হাইকমিশনের একটি ভূমিকা থাকবে। কিন্তু এখন দুই দেশের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় তাদের সংযুক্ত করা হচ্ছে না। তাই সব কিছু মিলিয়ে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে মিয়ানমার সরকার কতটা আন্তরিক হবে সেটি নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*