Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | চমেক হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসায় সুখবর

চমেক হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসায় সুখবর

নিউজ ডেক্স : বিভিন্ন ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের প্রাথমিক পর্যায়ে কেমো থেরাপি দিয়ে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে অপারেশনের (সার্জারি) প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু ক্যান্সার বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়লে কেমো থেরাপি আর কাজ করে না। আর বিভিন্ন জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেরোগীর অপারেশনও করা সম্ভব হয় না। চিকিৎসাবিদ্যায় এ ধরনের রোগীদের প্যালিয়েটিভ কেয়ারের রোগী হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। অর্থাৎ এ ধরনের রোগীদের সুস্থ হওয়ার আশা তেমন একটা থাকে না বললেই চলে।

কেমো কাজ না করা এবং অপারেশন করা সম্ভব নয়, এমন ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োগ করা হচ্ছে মাইক্রো ওয়েভ অ্যাবলেশন থেরাপি। অত্যাধুনিক এই পদ্ধতি বিশেষ করে লিভার, কিডনি ও ফুসফুসে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সুফল দিচ্ছে বলে চিকিৎসকরা দাবি করেছেন। গত রোববার এমনই দুজন লিভার ক্যান্সারের রোগীকে এই মাইক্রো ওয়েভ অ্যাবলেশন থেরাপি দেয়া হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের রেডিওথেরাপি (ক্যান্সার) বিভাগে। সরকারি পর্যায়ে কোন হাসপাতালে এই থেরাপির প্রয়োগ এটি–ই প্রথম বলে চমেক হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি পর্যায়ে দেশের কোন হাসপাতালে এই থেরাপির প্রয়োগ এখনো চালু হয়নি। বেসরকারি পর্যায়েও রাজধানী ঢাকায় হাতে গোনা কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে এই থেরাপি চালু আছে। সে হিসেবে সরকারি পর্যায়ে সারাদেশে একমাত্র চমেক হাসপাতালেই প্রথমবারের মতো এই মাইক্রো ওয়েভ অ্যাবলেশন থেরাপি প্রয়োগ করা হল।

হাসপাতালের ক্যান্সার ওয়ার্ড সূত্রে জানা গেছে, ইন্টারভেনশনাল অনকোলজিস্টরাই (ইন্টারভেনশনাল ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ) এই পদ্ধতিতে থেরাপি প্রয়োগ করে থাকেন। কিন্তু সরকারি–বেসরকারি পর্যায়ে ইন্টারভেনশনাল অনকোলজিস্ট চট্টগ্রামে একজনও নেই। ক্যান্সার বিভাগ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুরোধে ঢাকার এক বেসরকারি হাসপাতালের ইন্টারভেনশনাল অনকোলজিস্ট ডা. আহমেদ সারোয়ার মোর্শেদ ওই দিন (রোববার) চমেক হাসপাতালে আসেন। তার নির্দেশনায় চমেক হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগের একটি টিম এই থেরাপি প্রয়োগ করেন। এসময় চমেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান, ক্যান্সার বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাজ্জাদ মো. ইউসুফ, সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুল আউয়াল, সহকারী অধ্যাপক ডা. আলী আসগর চৌধুরী, ডা. রাকিবুল হাসান, রেজিস্ট্রার ডা. নাসির উদ্দিন শুভ, ডা. ফাহমিদা আলম ও ডা. ফজলে রাব্বি রিয়াদসহ অন্যান্যরা সাথে ছিলেন।

চিকিৎসকরা বলছেন, ক্যান্সারের যেসব রোগীদের কেমো থেরাপিতে আর কাজ করে না এবং অন্যান্য জটিলতার কারণে অপারেশন করে টিউমার অপসারণ করা সম্ভব হয় না, সেসব জটিল রোগীদের এই মাইক্রো ওয়েভ অ্যাবলেশন থেরাপি এবং রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন থেরাপি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এই থেরাপির মাধ্যমে লিভার, কিডনি ও ফুসফুসে থাকা টিউমার বা ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়া কোষ শনাক্ত করে তা পুড়িয়ে দিয়ে ধ্বংস করা হয়ে থাকে। সিটি সিমুলেটর নামে ক্যান্সারের অত্যাধুনিক একটি মেশিনের মাধ্যমে এই থেরাপি প্রয়োগ করা হয়। মেশিনটির দাম ৮ কোটি টাকার কম নয়। ঢাকার বাইরে চমেক হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগে এই সিটি সিমুলেটর মেশিন সচল রয়েছে।

অত্যাধুনিক এই থেরাপি প্রয়োগে সারাদেশে মাত্র তিনজন ইন্টারভেনশনাল অনকোলজিস্ট রয়েছে জানিয়ে ক্যান্সার বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাজ্জাদ মো. ইউসুফ বলেন, তিনজনই বেসরকারি পর্যায়ের। আর তিনজনের মধ্যে ডা. আহমেদ সারোয়ার মোর্শেদ একজন। এই থেরাপি প্রয়োগে আমাদের অত্যাধুনিক সরঞ্জামসহ সব সুবিধা রয়েছে। কিন্তু গাইড দেয়ার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। তাই আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে বিশেষজ্ঞ হিসেবে ডা. আহমেদ সারোয়ার মোর্শেদকে আহবান জানাই। তিনি আমাদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে রোববার ঢাকা থেকে এসেছেন। তার গাইডেন্সেই এদিন দুজন লিভার রোগীকে এই মাইক্রো ওয়েভ অ্যাবলেশন থেরাপি দেয়া হয়েছে। ব্যথা ছাড়াই এটি অত্যাধুনিক একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। এর মাধ্যমে খুবই জটিল পর্যায়ের একজন ক্যান্সার রোগী আরো বেশ কিছুদিন ভালো ভাবে জীবন ধারণের সুযোগ পান।

থেরাপি প্রয়োগের পর ক্যান্সার বিভাগেই ডা. আহমেদ সারোয়ার মোর্শেদের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ডা. আহমেদ সারোয়ার মোর্শেদ বলেন, বিশেষ করে প্যালিয়াটিভ ট্রিটমেন্টের আওতায় জটিল রোগীদের এই থেরাপি দেয়া হয়ে থাকে। যেসব রোগীদের আর তেমন কোন আশা নেই, এমন রোগীদের এই থেরাপি দেয়া হয়। এই থেরাপি ক্যান্সার দূর করে রোগীকে সুস্থ করে, এমন দাবি করা যায় না। তবে থেরাপির পর ওই ক্যান্সার রোগী আরো কিছু দিন মোটামুটি কোয়ালিটি লাইফ লিড করতে পারেন বলা যায়।

এই পদ্ধতিতে (সরকারি পর্যায়ে) খরচও তুলনামূলক কম দাবি করে এই চিকিৎসক বলেন, ঢাকায় বেসরকারি পর্যায়ে আমরা এই থেরাপি দিয়ে থাকি। যেখানে যা খরচ পড়ে সরকারি পর্যায়ে খরচ এর অর্ধেক বলা যায়। কারণ, সরকারি পর্যায়ে শুধু নিডেল বা যন্ত্রাংশটি কেনা বাবদ ফি পরিশোধ করতে হয় রোগীকে। চিকিৎসকদের কোন ফি নেয়া হয়না। তাই সরকারি পর্যায়ে এই থেরাপির খরচও অনেক কম। অনেক ক্ষেত্রে অপারেশনের মাধ্যমে ক্যান্সার রোগীর টিউমার অপসারণ করা হয়ে থাকে। যাতে তিন লাখের বেশি টাকা খরচ পড়ে। কিন্তু মাইক্রো ওয়েভ অ্যাবলেশন থেরাপির খরচ এর তুলনায় কম।

সরকারি পর্যায়ে এখানে এই থেরাপি সেন্টার চালু করা গেলে চট্টগ্রামের রোগীদের আর ঢাকায় যেতে হবে না বলেও জানান ইন্টারভেনশনাল অনকোলজিস্ট ডা. আহমেদ সারোয়ার মোর্শেদ।

সরকারি পর্যায়ে সারা দেশে চমেক হাসপাতালে সর্ব প্রথম এই থেরাপি প্রয়োগ করতে পেরে বেশ উচ্ছ্বসিত চমেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান। তিনি বলেন, এটি চট্টগ্রামের মানুষের জন্য বিশাল এক পাওয়া। লিভার, কিডনি ও ফুসফুস ক্যান্সারের জটিল রোগীরা এখানেই অত্যাধুনিক এই থেরাপি প্রয়োগের সুযোগ পাবেন।

ঢাকা থেকে আনা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে এখানেও বেশ কয়জন চিকিৎসককে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তোলা হবে জানিয়ে হাসপাতাল পরিচালক বলেন, নিজেদের চিকিৎসকরা প্রশিক্ষিত হয়ে দক্ষ হয়ে উঠলে স্থায়ী এবং ধারাবাহিক ভাবে এখানে এই মাইক্রো ওয়েভ এবং রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন থেরাপি চালু রাখা সম্ভব হবে। আমরা সবাইকে নিয়ে সে চেষ্টা করছি। সেটি হলে এ ধরণের জটিল রোগীদের এই থেরাপি নিতে আর ঢাকায় যেতে হবে না। এমন উদ্যোগ গ্রহণে বিভাগের প্রধানসহ রেডিওথেরাপি বিভাগের সংশ্লিষ্ট সকল চিকিৎসকদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান তিনি। -আজাদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*