ব্রেকিং নিউজ
Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে

CTG520150808135739

হাজারো অনিয়ম আর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এমন কোনো অনিয়ম নেই যা এখানে হয়না। সেবার পরিবর্তে রোগী এবং তাদের অভিভাবকরা শিকার হন নানা হয়রানির।  সেবার আড়ালে এ যেন এক নরককুণ্ড।

রোগীর অভিভাবকের সঙ্গে দুব্যর্বহার করে আবার ডাক্তারাই উল্টো মানববন্ধন করেছে এমন ঘটনাও ঘটেছে সম্প্রতি।  হাসপাতালের অনিয়মের তথ্যচিত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে ইর্ন্টানি ডাক্তারের হাতে শারীরিকভাবে নাজেহাল হয়েছেন বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীও।

হয়রানি, অনিয়ম, দুর্নীতি, নবজাতক চুরি, লাশ চুরি, জখমী সনদ বাণিজ্য,ওষুধ পাচার বাণিজ্য, ওয়ার্ড বয়দের সিট নিয়ে বাণিজ্য, নার্সদের বাজখাই গলায় ধমক ও যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনা এখানে আর অস্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয় না।

হাসপাতালের আয়া বুয়ারাই করে নার্সের কাজ।  একজনের ওষুধ দিয়ে অপারেশন করা হয় অন্য রোগীকে।  রোগীদেরকে দিয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধ ক্রয় করিয়ে তা আবার কৌশলে চুরি করা হয়।

হাসপাতালের প্রথম হয়রানি শুরু হয় জরুরী বিভাগে রোগী ভর্তির সময়।  সৈয়দ নামের এক রোগীর অভিভাবক জানান, টিকেট নিয়ে গুরুতর বা কম গুরুতর রোগী ভর্তির পর শুরু হয় আয়া বুয়াদের দৌরাত্ম্য।  রোগীদের নির্ধারিত ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রলি চাইলে দিতে হয় টাকা। লিফটে রোগীকে উপর তলায় তুলতে হলে লিফটম্যানকে দিতে হয় টাকা।  এছাড়া ওয়ার্ডগুলোর দারোয়ানদেরকে টাকা না দিলে ভিতরে ঢুকতে দেয়না।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে গত চার দিন ধরে ৫৫ নং বেডে পড়ে আছেন আবুল হাসেম।  বাঁশখালীর ছনুয়া থেকে আসা তার অভিভাবক জাকির হোসেন জানান, ভর্তি করানোর পর রোগীর রক্ত পরীক্ষা করতে বলা হয়। হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে চাইলে বলা হয় এখানে নয় বাইরে থেকে করে নিয়ে আসতে। বাইরে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রক্ত পরীক্ষা করতে খরচ হয়েছে ১৭০০ টাকা।

তিনি আরো জানান, রোগীর কি অবস্থা অভিভাবক হিসেবে তা জানতে চাইলে নার্সরা দুর্ব্যবহার করে।  ডাক্তারের পরিবর্তে নার্সরাই রোগীকে দেখাশুনা করেন।

১৬ নং ওয়ার্ডে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন আনোয়ারার খাতিজা বেগম।  ১৫ দিন ধরে হাসপাতালের ২৯ নং বেডে পড়ে থাকলেও তার চিকিৎসার কোনো অগ্রগতি নেই।  তার অভিভাবক ছেলে সাহাব উদ্দিন জানান, টাকা না দেয়ায় দারোয়ান ভিতরে ঢুকতে দিচ্ছেনা। ডাক্তারের সঙ্গে কথাও বলতে পারছিনা। নার্সরা এসে দেখে চলে গেছেন। এ ছাড়া ওয়ার্ডের বাথরুমগুলো নোংরা দুর্গন্ধময় বলেও তিনি জানান।

তিনি আরো জানান, প্রথমে তাদের রোগীকে ১৪ নং ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয়।  সেখানে গেইটে দায়িত্বরত দারোয়ানকে প্রতিবারই ওয়ার্ডে ঢুকতে হলে টাকা দিতে হয়।

রানা নামের ফটিকছড়ি থেকে আসা এক রোগীর আত্মীয় জানান, তার মাকে মেডিসিন বিভাগের ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয়।  চারদিন রাখার পর তারা হাসপাতাল থেকে স্বেচ্ছায় বাসায় নিয়ে যান। এত নোংরা পরিবেশের অবস্থা আর কোথাও দেখেন নি বলে তিনি জানান।

নীচ তলায় অবস্থিত মানসিক ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায় আরো ভূতুড়ে পরিবেশ।  মানসিক রোগীরা যে যার মতো করে ঘুরছেন ফিরছেন আবার একে অপরের সঙ্গে ধস্তাধস্তিও করছেন।  তাদেরকে দেখাশুনা করার জন্য রোগীর অভিভাবকরা ছাড়া কোনো নার্স নেই। কয়েকজন মানসিক রোগী দুজন মানসিক রোগীকে বেডের সঙ্গে বেঁধে রেখেছেন।

ওয়ার্ডটির পরিবেশ খুবই নোংরা।  বাথরুমগুলো খোলা এবং স্যাঁত স্যাঁতে।খোলা বাথরুমেই মহিলারা গোসল করছে আর সেখান দিয়ে পুরুষরা আসছে যাচ্ছে।  নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক রোগীর বাবা জানান, তার ছেলেকে বোয়ালখালী থেকে নিয়ে এসেছেন গত ১৫ দিন আগে। কোনো পরিবর্তন নেই। ডাক্তারও আসেনা নিয়মিত।  দু-তিনদিন পর একবার এসে দেখে চলে যায়।

এক্সরে করার নাম দিয়ে শিক্ষানবিশ ডাক্তারের মাধ্যমে সুন্দরী যুবতীর নগ্নদেহ দেখার ঘটনাও ঘটেছে চমেক হাসপাতালে।

এদিকে হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ যেন অনিয়মের আখড়া।  এখানকার কর্মচারী, আয়া ও নার্সদের টাকা দিলেই মেলে আগে পরীক্ষা করানোর সুযোগ।টাকা না দিলে পড়ে থাকতে হয় পেছনে।

পুরোদিনেও এ অপেক্ষা আর ফুরোয় না।  এছাড়া হাসপাতালের ডাক্তারদের অনুরোধেও অনেক রোগীকে আগে বিভিন্ন পরীক্ষা করানো হয় এখানে।

ডাক্তার দেখানোর পর যখন হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য দৌঁড়ঝাপ শুরু করেন তখন সেই হতাশা পরিণত হয় বিরক্তি ও ক্ষোভে।

সরেজমিনে হাসপাতালের পরমাণু বিভাগে অবস্থিত প্যাথলজি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, রোগ নির্ণয়ে ডাক্তাদের দেয়া বিভিন্ন পরীক্ষা করতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে অপেক্ষা করছে কখন তাদের সিরিয়াল আসবে আর এ যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ পাবে। সবার চোখের সামনেই বিভাগের কর্মচারী ও নার্সরা পেছনের সিরিয়ালের রোগীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের আগে পরীক্ষা কক্ষে ঢুকিয়ে দিচ্ছে।  সামনের সিরিয়ালের রোগীরা এসবের প্রতিবাদ করতে গেলেই তাদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল এবং পরীক্ষা না করানোর হুমকি দেয় ওইসব কর্মচারী ও নার্সরা।

এছাড়া এখানে গ্রাম থেকে আসা রোগীদের কাছ থেকে রক্ত, মূত্র ও বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত টাকার চেয়ে বেশি টাকা নেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্যাথলজিতে পরীক্ষা করাতে আসা কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক রোগীর সিরিয়াল পেছনে থাকলেও টাকার বিনিময়ে সেই সিরিয়াল আগে নিয়ে আসছেন পিয়নরা।এ বিষয়ে কোনো রোগীর স্বজন অভিযোগ করলে ক্ষেপে যান এসব পিয়ন ও আয়ারা।

বোয়ালখালী থেকে আসা এক রোগীর স্বজন রফিকুল আনোয়ার বলেন, আমার সিরিয়াল ছিল ৬৫। কিন্তু পিয়নরা টাকা নিয়ে ৮৮ সিরিয়ালের রোগীকে আমার আগে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আরেক ভুক্তভোগী জমির উদ্দিন বলেন, রোগীদের সেবা দেওয়ার প্রথম শর্ত হলো ভালো ব্যবহার। এই চিত্রটি যেন চমেক হাসপাতালে অনুপস্থিত।

হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ অপরিস্কার-অপরিচ্ছন্ন। নাক-কান-গলার বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে যেতেই দেখা যায় প্রায় সব রোগী ও তাদের স্বজনরা নাকে কাপড় দিয়ে দুর্গন্ধ থেকে রক্ষা পেতে চাইছেন।

সামনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের পাশের বিরাট ডাস্টবিন থেকে এ দুর্গন্ধ আসছে।  যেখানে হাসপাতালের রোগীদের বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়েছে।  নিয়মিত পরিস্কার না করার ফলে ডাস্টবিনটি থেকে উৎকট গন্ধ বের হচ্ছে।

এদিকে গত ৩ জুলাই আকস্মিকভাবে এই হাসপাতাল পরিদর্শনে যান মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান।  তার দৃষ্টিতে খোদ চমেক হাসপাতালই রোগী হিসেবে প্রতিয়মান হয়।

তিনি সাংবাদিকদের মাধ্যমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন রাখেন, মানুষ অসুস্থ হলে হাসপাতালে আসে।  কিন্তু হাসপাতাল নিজেই যদি অসুস্থ হয়ে যায়, তখন তাকে চিকিৎসা সেবা দেবে কে ?

বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাথরুম পরিদর্শন করে তিনি দেখেন যে, সেগুলো দুর্গন্ধ ও আবর্জনায় ভরা। দুর্গন্ধের প্রকোপ এতোই বেশী যে, বাথরুমে ঢোকার সময় তিনি নিজেও নাকে রুমাল চেপে ধরেছিলেন।

অপরদিকে চমেক হাসপাতালের মর্গ যেন দালালদের স্বর্গরাজ্য, লাশ নিয়ে চলে অমানবিক বাণিজ্য, টাকা দিলে পাল্টে যায় পোস্টমর্টেম রিপোর্টও।  সুরতহালের পর লাশ হস্তান্তর ও সুরতহাল করাতে তিন থেকে দশ হাজার টাকা দালাল চক্রকে দিতে হয়।  বহিরাগত, অ্যাম্বুলেন্স চালক-সহকারী, মর্গে কর্মরত কিছু চিকিৎসক, পুলিশ ও হাসপাতালের কর্মচারী এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। কোনো কারণে লাশের ময়নাতদন্ত না করালেও ডোমকে দিতে হয় তাদের দাবিকৃত টাকা।  না হয় লাশ হস্তান্তর করা হয়না।

‘বাচ্চা শিশু চুরির বিষয়টি স্বীকার করে হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জহিরুল ইসলাম বলেন, গত ১৬ জুলাই  বিকেলে বাচ্চা চুরির অপরাধে সুজন দত্ত (৩২) ও রিনা দে (৩০) নামে দুজনকে আটক করা হয়।  তারা সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী এবং দুইজনই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেসরকারি ওয়ার্ড বয় হিসেবে কাজ করে আসছিল ।

র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক এএসপি শাহেদা সুলতানা জানিয়েছেন, শিশু চুরি হওয়া ওয়ার্ডটিতে সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করেই ওই দুইজনকে আটক করা হয়েছিল।

এসব বিষয়ে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খোন্দকার শহিদুল গণির দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, জনবল স্বল্পতার কারণে এসব অনিয়ম সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। তবে তিনি আশ্বাস দিলেন, ভবিষ্যতে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে, মাত্র সাড়ে পাঁচশ রোগীর ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এ হাসপাতালে প্রায় আড়াই হাজার রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে তাদের হিমসিম খেতে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে চমেক হাসপাতাল-২ নির্মাণ করতে হবে। চমেকের মতো আরেকটি হাসপাতাল হলে এসব সমস্যা অনেকাংশেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*