Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | চট্টগ্রাম এলএ শাখায় অর্ধশত দালাল, অধরা রাঘব বোয়ালরা

চট্টগ্রাম এলএ শাখায় অর্ধশত দালাল, অধরা রাঘব বোয়ালরা

image_printপ্রিন্ট করুন

নিউজ ডেক্স : কক্সবাজারে উন্নয়ন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণে সমালোচনার মাঝেও চট্টগ্রাম এলএ শাখায় মিলেছে অর্ধশত দালালের খোঁজ। নগদ টাকাসহ কক্সবাজার এলএ শাখার সার্ভেয়ারের গ্রেপ্তারের পর দুদকের মামলায় একে একে রথি-মহারথিদের নাম বের হলেও চট্টগ্রামে দুদকের হাতে নগদ সাড়ে ৭ লাখ টাকা এবং সাড়ে ৯১ লাখ টাকার ১০টি এলএ চেকসহ গ্রেপ্তার হওয়া চেইনম্যান নজরুলের মামলায় ১০ মাসের বেশি সময় ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে রাঘব বোয়ালরা।

চট্টগ্রামে বর্তমানে ডজনখানেক সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। এসব প্রকল্পে ক্ষতিপূরণ প্রদান প্রক্রিয়ায় যুক্ত দালালের তালিকায় রয়েছে আইনজীবী, সাংবাদিক, ব্যাংক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী থেকে শুরু করে এলএ শাখার অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম।

দুদক সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি র‌্যাবের অভিযানে ঘুষের ৯৩ লাখ ৬০ হাজার ১৫০ টাকাসহ গ্রেপ্তার হন কক্সবাজার এলএ শাখার সার্ভেয়ার ওয়াশিম খান। ওই ঘটনায় দুদকের মামলায় তিনজন দালালকে গ্রেপ্তার করেন তদন্ত কর্মকর্তা। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া চারজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন।

দুদক সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তি দেওয়া দুদকের কয়েক বছরের ইতিহাসে রেকর্ড। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে কক্সবাজারের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ রাঘব বোয়ালের নাম। এতে করে কক্সবাজার এলএ শাখা নিয়ে দুদকের তদন্তে সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ইতোমধ্যে কক্সবাজার পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান, কাউন্সিলর জাবেদ কায়সার নোবেল, একজন আইনজীবীর ব্যাংক ও ডাকবিভাগে গচ্ছিত কয়েকটি কোটি টাকা, অসংখ্য জমির দলিল, বেশ কয়েকটি অভিজাত ফ্ল্যাট জব্দ ও মামলায় সম্পৃক্ত করেছে দুদক।

এদিকে, ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর নগরীর শপিং কমপ্লেক্স থেকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার চেইনম্যান নজরুল ইসলামকে নগদ সাড়ে ৭ লাখ টাকা এবং সাড়ে ৯১ লাখ টাকার ১০টি চেকসহ গ্রেপ্তার করে দুদক। এরপর নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা হলে তার বেশ কয়েকটি ব্যাংক হিসাব ও একটি ফ্ল্যাট জব্দ করেন দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা। পরে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা হয় নজরুল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে। বর্তমানে নজরুল কারাগারে থাকলেও তার স্ত্রী পলাতক বলে জানিয়েছে দুদক। তবে ৯১ লাখ টাকার এলএ চেক নিয়ে চট্টগ্রাম এলএ শাখার চেইনম্যান গ্রেপ্তার হলেও এসব এলএ চেক কীভাবে নজরুলের হাতে গেছে তার উত্তর এখনো মেলেনি। যে কারণে অধরা রয়ে যাচ্ছে অনেক রাঘব বোয়াল।

সূত্রে জানা যায়, বিগত প্রায় ৫ বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম নির্মাণাধীন প্রায় ১২টির মতো প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ পরবর্তী ক্ষতিপূরণ প্রদানের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মীরসরাই অর্থনৈতিক জোন প্রকল্প, আনোয়ারায় চায়না অর্থনৈতিক জোন প্রকল্প, বিদ্যুৎ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীন গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লি. (জিটিসিএল) এর মহেশখালী-আনোয়ারা গ্যাস ট্রান্সমিশন পাইপলাইন নির্মাণ, মহেশখালী- আনোয়ারা প্যারালাল (সমান্তরাল) পাইপলাইন নির্মাণ, আনোয়ারা- ফৌজদারহাট এলএনজি পাইপলাইন নির্মাণ, চিটাগাং ফেনী বাখরাবাদ প্যারালাল পাইপলাইন প্রকল্প, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি. (কেজিডিসিএল) এর মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ ও কেজিডিসিএল গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ক আপগ্রেডেশন প্রকল্প, সড়ক ও জনপথ বিভাগের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়া বাইপাস প্রকল্প, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল প্রকল্প, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাথে টানেল সংযোগ প্রকল্প, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন ওয়াসার ভান্ডালজুরি পানি সরবরাহ প্রকল্প, কর্ণফুলী উপজেলার অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হচ্ছে।

এর মধ্যে গ্যাসলাইন প্রকল্পগুলোকে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা, অর্থনৈতিক জোন ও টানেল প্রকল্পে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। এসব প্রকল্পের ক্ষতিপূরণ পেতে হয়রানির যেমন অভিযোগ রয়েছে, তেমনি ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দিতে গড়ে উঠেছে প্রভাবশালী দালাল সিন্ডিকেট। এলএ শাখার কর্মকর্তাদের ইন্ধনে এসব দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে ১০ থেকে ১২ শতাংশ কমিশনে ছাড় হয় এলএ চেক। জমির স্বত্ব্ব নিয়ে জটিলতা থাকলে ২০-৩০ শতাংশ কমিশন গুণতে হয় ভূমি মালিকদের। এলএ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মচারী ও কিছু ব্যাংক কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। অনুসন্ধানে মিলেছে অনেক দালালের খোঁজ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মীরসরাইয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে অর্থনৈতিক জোন প্রকল্প। জিটিসিএলের এলএনজি পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে বাঁশখালী, আনোয়ারা, বন্দর, পতেঙ্গা, হালিশহর, সীতাকুণ্ড ও মীরসরাই উপজেলায়। একইভাবে মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য কেজিডিসিএলের গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ হচ্ছে সীতাকুণ্ড ও মীরসরাইয়ে। পটিয়া উপজেলায় রয়েছে পটিয়া বাইপাস প্রকল্প, বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারায় বাস্তবায়ন হচ্ছে ওয়াসার ভান্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্প, আনোয়ারায় বাস্তবায়ন হচ্ছে চায়না অর্থনৈতিক জোন প্রকল্প, নগর প্রান্তের পতেঙ্গা এবং আনোয়ারায় বাস্তবায়ন হচ্ছে টানেল ও টানেল সংযোগ সড়ক প্রকল্প। এসব প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ প্রদানের সাথে কাজ করছে অর্ধ শতাধিক দালাল। আবার একেক দালালের পেছনে কয়েকজন সহকারীও রয়েছে। কিছু দালাল প্রায় সব প্রকল্পের দালালি করলেও কিছু রয়েছে নিজ এলাকাকেন্দ্রিক। এর মধ্যে মামুনুল, মোশারফ, ক্যাজুয়াল কর্মচারী বোরহান, তৌফিক, পিয়ন আনোয়ার, ট্রেজারি অফিসের সাবের (সাবের প্রত্যেক চেকে প্রতি লাখে ৫শ টাকা করে কমিশন নেন); সীতাকুণ্ডে এলএনজি প্রকল্পে কাজ করেন ছোটন, জুয়েল, মিজান, নিজামুল; অর্থনৈতিক জোন প্রকল্পে একজন জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বে রয়েছেন বাবুল, জাফর, তাজউদ্দিন, সুজায়েত, আরিফ, দুলাল ও রাশেদ। বাঁশখালী প্রকল্পে রিফাত, সোলাইমান, রিদুয়ান, সরোয়ার, বাবুল ও আশেক। পটিয়া বাইপাস প্রকল্পে রাশেদ, রিফাত ও দুদকের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া নজরুলের এক কম্পিউটার অপারেটর। কর্ণফুলী উপজেলা প্রকল্পে আইয়ুব, সালাম, লোকমান ও শাহজাহান। আনোয়ারায় টানেল, চায়না অর্থনৈতিক জোন ও এলএনজি পাইপলাইন প্রকল্পে ফরিদ, বাচ্চু, আশিক, বাবুল, হারুন, নবী হোসেন, জুয়েল, মান্নান, ইউসুফ, মনির, শাহজাহান, সিরাজ ও সবুর। এর মধ্যে মিজান, জুয়েল এলএ শাখার ঘনিষ্ঠ হিসেবে কাজ করেন। কয়েক কর্মকর্তার বাসার বাজারও করেন তারা। যে কারণে অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে ৭ শতাংশ দিয়ে কমিশনে কাজ করেন তারা। এতে বেশি পরিমাণে লাভবান হন তারা। দালালদের মাধ্যমে এলএ শাখার বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী কমিশন বাণিজ্যে যুক্ত রয়েছেন বলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে। ইতোমধ্যে অতিরিক্ত কমিশনে একজনের ক্ষতিপূরণের টাকা অন্যজনকে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে এলএ শাখার বিরুদ্ধে।

চট্টগ্রামে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে দালালের উৎপাতের বিষয়টি স্বীকার করেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. আবু হাসান সিদ্দিক। গতকাল তিনি আজাদীকে বলেন, মানুষকে সেবা দিতে আমরা চেষ্টা করছি। তবে দালালের বিষয়টি অস্বীকার করার জো নেই। এটা সত্য যে, অনেকে আবেদনও করেনি, কিন্তু এদিক-সেদিক ঘুরছে। এরকম অনেক সেবাগ্রহীতাকে আমি হাতে হাতে চেক (এলএ চেক) দিয়েছি।

তিনি বলেন, মীরসরাইয়ে বেজার প্রকল্পে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে সরাসরি এলএ আবেদন নেওয়ার কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। ইতোমধ্যে ৩-৪ কোটি টাকা প্রকল্প স্থানে সরাসরি সেবাগ্রহীদের হাতে হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রকল্পটির এ পর্যায়ে দক্ষিণ মঘাদিয়া মৌজায় প্রায় সাড়ে চারশ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে। আগামী তিন দিন এলএ কর্মকর্তাদের দিয়ে প্রকল্প স্থানে ক্যাম্প পরিচালনা করা হবে। আমরা অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকদের বলেছি, কোনো মিডলম্যানের (দালাল) হাতে আবেদন দেবেন না। এই তিন দিন আমাদের এলএ কর্মকর্তাদের হাতে হাতে আবেদন জমা দেবেন। ইতোমধ্যে যেসব চেক অনুমোদন হয়েছে, আগামী মঙ্গলবার উপজেলা সদরে সরাসরি সেবাগ্রহীতাদের হাতে হাতে চেক প্রদান করব।

ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বড় বড় প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে অধিগ্রহণের বড় বড় পেমেন্টগুলো দেওয়া হয়ে থাকে। এখানে এলএ শাখার আন্তরিকতার অভাব নেই।

চট্টগ্রাম এলএ শাখার চেইনম্যানকে এলএ চেকসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করার মামলায় দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২ এর উপ-পরিচালক মাহবুবুল আলম বলেন, এলএ শাখার চেইনম্যান গ্রেপ্তারের মামলাটি আমরা তদন্ত করছি। করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে কিছুদিন তদন্তে স্থবিরতা আসলেও এলএ অফিসের বাইরে এলএ চেক পাওয়ার ঘটনায় কারা কারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। ক্ষতিপূরণ প্রদানে যেসব দালাল চক্র জড়িত তাদেরকেও চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। দৈনিক আজাদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!