Home | শীর্ষ সংবাদ | কারাগার

কারাগার

image_printপ্রিন্ট করুন

ডাঃ ফরিদা ইয়াসমিন সুমি : অনুর শরীরটা সিমেন্টের ঠাণ্ডা মেঝেতে পড়ে আছে। বেশ পুরনো মেঝে। স্থানে-স্থানে বিশ্রীভাবে ইট বেরিয়ে আছে। কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু। অসমান। দুই-চারজন বিক্ষিপ্তভাবে এদিক-ওদিক বসে আছে। কারও মধ্যে নড়াচড়ার কোনো লক্ষণ নেই। যেন অখণ্ড অবসরে সবাই। ইতোমধ্যে ডোমটির নামও জানা হয়ে গেছে অনুর। নেপাল ডোম। চেহারাটা গারোদের মতো। ঘরটা উত্তর-দক্ষিণমুখী। দরজার কাছে বসে নেপাল ডোম একের পর এক বিড়ি টেনে যাচ্ছে। গাঁজা খাওয়ার কারণে চোখদুটো লাল আর নেশাতুর।

নেপালডোমের আট বছর বয়সী ছেলেটা আশেপাশে ঘুরঘুর করছে। প্যান্ট কোমরের কাছটাতে ঢিলে হয়ে পড়ায় একহাতে খামচে ধরেছে। এখন থেকেই বাবাকে সাহায্য করে সে। টুকিটাকি ফাইফরমাশ খাটে। মুখের আদলটা ভারি মিষ্টি!

ছাত্রছাত্রীদের চোখেমুখে কিছুটা অস্বস্তিভাব লক্ষ করলো অনু। নগ্নতা একইসঙ্গে সুন্দর ও অস্বস্তিকর। অবস্থা ও সময়ভেদে।

অনুর ইচ্ছে করছে, খুব আয়েশ করে একটা হাই তুলতে। ধুর! এসব কী ভাবছে সে! মৃত মানুষ কি হাই তুলতে পারে? কিন্তু সত্যি সত্যিই এমন একটা অনুভূতি হতে লাগলো। মনে হচ্ছে খুব ক্লান্ত। অনেক ঘুম জমে আছে। এবার ঘুমোবে। পোস্টমর্টেমের পর ছেঁড়াখোঁড়া শরীর নিয়ে ঘুমুতে পারবে কি না, এ নিয়ে খানিক চিন্তায় পড়লো। যাই হোক, যেমনই হোক, এবার ঘুমানো থেকে কেউ তাকে আটকাতে পারবে না। কিন্তু এরা এত দেরি করছে কেন? তাড়াতাড়ি যা করার করে ল্যাটা চুকিয়ে দিলেই হতো।

অনেকক্ষণ একলা একটা পাখি ডেকে চলেছে। নাম না জানা পাখি। সম্ভবত সঙ্গীকে খুঁজছে। কণ্ঠে আকুলতা। অস্থিরভাবে শিশুগাছটির এ-ডাল থেকে ও-ডালে উড়ছে। কাঠবাদাম গাছটির পাতাগুলো সুন্দরভাবে ছাতার মতো মেলানো। দখিনা-বাতাস দিচ্ছে খুব। পাতাগুলো ভাঁজ হচ্ছে, আবার খুলে যাচ্ছে। ছায়া পেতে ক্লান্ত পথচারীরা প্রায়ই এর নিচে বসে।

দশ, বারোজন ছেলেমেয়ের একটা গ্রুপ এসেছে। সাদা অ্যাপ্রন পরা। দেরি করার কারণ এবার বুঝেছে অনু। মেডিক্যাল স্টুডেন্টদের অটোপসি ক্লাস। সে আজ গিনিপিগ। মোড়ানো চাটাইয়ের ভাঁজ খোলা হলো। নগ্নদেহটা প্রকাশিত হয়ে পড়লো। ছাত্রছাত্রীদের চোখেমুখে কিছুটা অস্বস্তিভাব লক্ষ করলো অনু। নগ্নতা একইসঙ্গে সুন্দর ও অস্বস্তিকর। অবস্থা ও সময়ভেদে।

গোটা মানুষটার বসবাস এই শরীরে। অথচ পুরো জীবদ্দশায় শরীরটাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চায় মানুষ। অস্বীকার করতে চায়। ব্যাপারটা অদ্ভুত। অসুখবিসুখ আর গর্ভাবস্থা ছাড়া শরীর সম্পর্কিত কোনো কথা সাধারণত বলে না কেউ। অথচ শরীরটা একটা বিশাল অধ্যায়। মনের বসবাসও এই শরীরেই। শরীরটাকে ভালোও বাসে মানুষ। কিন্তু প্রকাশে যেন বা সর্বনাশ হয়ে যাবে! রোজকার নিয়মমাফিক প্রশ্ন ‘কেমন আছেন’ বলতে যদিও শরীরের কথাই জিজ্ঞেস করা হয়, তবু শরীর নিয়ে কথা বলতেই মানুষ সবচে’ বেশি অস্বস্তিবোধ করে। শরীরের চাহিদার কথা তো আরও দূরের কথা! এই একটি জায়গাতে মানুষ বড় বেশি অবদমনের মধ্যে থাকে। পাপ-পুণ্যবোধের ধারণাও গড়ে তোলা হয় শরীরকে ঘিরে।

একলা পাখিটি সম্ভবত তার সঙ্গীকে খুঁজে পেয়েছে। আকুলস্বরে ডাকাডাকিটা কমেছে। মাটিতে ঝরেপড়া কাঠবাদামগুলো ঠুকরে খাচ্ছে কাক। নেপাল ডোমের ছেলেটি এক হাতে প্যান্টটি ধরেই আরেক হাতে কাক তাড়ালো। বাদামগুলো ভাঙতে আশেপাশে ইট খুঁজতে লাগলো।

এই মুহূর্তে মর্গের মেঝেতে চাটাইয়ের ওপর শুয়ে আছে। মৃত। এই মেয়ে যে এত জঘন্য একটি কাণ্ড করে বসবে, কে জানতো?

এরা কতক্ষণে কাটাছেঁড়া শেষ করবে কে জানে! ভীষণ ঘুম পাচ্ছে অনুর। মরে গিয়ে একদিক থেকে ভালোই লাগছে। যেখানে খুশি চলে যেতে পারছে মনে মনে। জীবিত অবস্থায় মানুষের মুক্তি নেই। কারাগারে বন্দি থাকে। হোক তা নিজের বা পরের তৈরি। পায়েপায়ে থাকে শেকল। অদৃশ্য শেকল। হাতুড়ি-বাটাল হাতে নেপাল ডোমকে এগিয়ে আসতে দেখলো। এখানে এখনো প্রাচীন পদ্ধতিতে অটোপসি করা হয়।

ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীরা বেশি অস্বস্তিবোধ করছিল। অনুর শরীরটা খুব সুন্দর। সুগঠিত ও সুডৌল। পাকা গমের মতো গায়ের রঙ। মাথাভর্তি ঘনকালো চুল। নাভির নিচের পেটটা একটু ফোলা। হালকা মেদ আছে। তাতে যেন সৌন্দর্য আরও বেড়েছে। লোমহীন, নিপাট, নিটোল বাহু আর ঊরু। নেপাল ডোম মুঠিতে চুল ধরে হ্যাঁচকা টানে একটা কাঠের টুকরো ঘাড়ের নিচে রাখে। আগে বোধহয় খুলিটা ভাঙবে। কোরবানি ইদের সময় এরকম কাঠের টুকরোর ব্যবহার দেখেছে অনু।

অনুর ইচ্ছে হলো, তলপেটটিতে হাত বোলায়। মনে মনে ক্ষমা চায় আবারও। অপারগতার জন্য। পেটে থাকা ওইটুকু বাচ্চা কি এসব বুঝতে পারে? যে শরীরকে মানুষ এত উপেক্ষা করে, সেই শরীরে প্রাণের অস্তিত্বে কৈফিয়তের অন্ত থাকে না। এমনকি ভালোবাসা বা প্রেম থেকে এলেও না। সৃষ্টি হতে হবে সামাজিক নিয়মের বেড়াজালে। প্রথাগতভাবে। প্রেম, ভালোবাসা থেকে সৃষ্ট কোনো প্রাণের ঠাঁই হবে না এখানে।

অনুর মৃত্যুর পরেও বেশ কয়েক ঘণ্টা বেঁচে ছিল বাবুটা। একটু একটু নড়াচড়া টের পেতে শুরু করেছিল কেবল। ঠিক এই সময়েই…।

অনু। অনুরাধা। একুশ বছরের এক উচ্ছল তরুণী। স্বপ্ন ছিল দু’চোখে। সাহসও। এই মুহূর্তে মর্গের মেঝেতে চাটাইয়ের ওপর শুয়ে আছে। মৃত। এই মেয়ে যে এত জঘন্য একটি কাণ্ড করে বসবে, কে জানতো? মা তো বলেছেই, এই ঘটনা জানার আগে কেন মরা মুখ দেখলো না ওর! মায়েরা এমনই, এ রকম কথা বলবে ঠিকই। আবার কষ্টও পাবে সবচে বেশি।

ছোটবেলা থেকেই দেখেছে মায়ের প্রকাশ খুব কম। বড় কোনো ঘটনাতেও অভিব্যক্তির কোনো পরিবর্তন হতো না। চোখেমুখে কাঠিন্য। হাসতে বা কাঁদতেও দেখেনি খুব একটা। কিন্তু অনুর পড়ালেখাসহ সমস্ত সৃষ্টিশীল কাজে ছিল মায়ের নীরব সহযোগিতা ও সমর্থন। মা চাইতো ও বড় কিছু হোক। এইটে পড়া অবস্থায় অনু একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে মা খুব বিচলিত হয়ে পড়ে। জ্বরের ঘোরে অনু উল্টোপাল্টা বকছিল। সেবারই মাকে প্রথম কাঁদতে দেখেছিল। জায়নামাজে বসে নিজের জীবনের বিনিময়ে অনুর জীবন ভিক্ষা চাইছিল বারবার। দিন-রাত সেবা শুশ্রূষা করে ভালো করে তুলেছিল অনুকে। অনু জানে, মা তাকে ভীষণ ভালোবাসে।

ছেলেটি নির্লিপ্ত চোখে সেদিকে চেয়ে বাদামের শাঁস মুখে পুরলো। এরকমটা নতুন কিছু নয়।

মহিমকেও সত্যি সত্যি অন্তর থেকে ভালোবেসেছিল অনু। আচ্ছা, মিথ্যে মিথ্যি কি ভালোবাসা যায়? অনু তো চায়নি বাবা-মাকে কষ্ট দিতে। মহিমকে যে মানাতে পারেনি অনু! জীবনে কি এই ব্যাপারটিই সব? তবে কেন মানুষ এ নিয়ে এত বেশি প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে? প্রেম, ভালোবাসা, শারীরিক মিলন, সন্তান ধারণ; এগুলো তো জীবনের অল্প কিছু অংশমাত্র! আরও অনেক কিছুই তো আছে। আরও অনেক কিছুই তো থেকে যায়। এরকম একটি ঘটনা ঘটলে কেন মানুষের অন্য সব সম্ভাবনাকে শূন্য করে দেখতে হবে? নিগৃহীত, নিপীড়িত হতে হবে? সমাজ, দেশ, পৃথিবীকে দেওয়ার মতো আরও অনেক কিছুই তো থাকে, মানুষের। এই একটি ব্যাপার দিয়েই কেন সামগ্রিক মানুষটিকে বিবেচনা করা হয়! কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। আর কোনো অপরাধে এতটা ঘৃণার সম্মুখীন হতে হয় বলে জানা নেই অনুর। সত্যিই অদ্ভুত। ব্যাপারটি নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে।

অনুর বুক মাঝ বরাবর চিরে ফেলা হয়েছে। বুকের, পেটের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আলাদা করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। জরায়ু কেটে ফিটাস পাওয়া গেলে স্টুডেন্টদের চোখেমুখে বিস্ময়! সবার মুখেই ব্যথার অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো। হঠাৎ একটি মেয়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে বেরিয়ে গেল। নার্ভাস হয়ে পড়েছে সম্ভবত।

অনু দেখলো। প্রাণভরে দেখলো, তার মেয়েশিশুটিকে। এই পরিণতি যদি না হতো, শিশুটিও বড়ো হতো। হাসতো, খেলতো। একসময় ভালোবাসতো। গর্ভবতী হয়ে পড়তো। সবাই বলতো, এর চেয়ে মেয়েটির মৃত্যু হওয়া ভালো ছিল। কিন্তু মেয়েটি তেমনটা ভাবতো না। সে ভাবতো, তার ও তার সন্তানের বাঁচার অধিকার আছে। যেমনটা অনু ভেবেছিল!

অ্যাপ্রন পরা মাঝবয়সী শিক্ষকটি স্টুডেন্টদের পড়াচ্ছেন, গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করলে কী কী চিহ্ন পাওয়া যাবে, ইত্যাদি, ইত্যাদি! একটু আগে বেরিয়ে যাওয়া মেয়েটি রুমে ঢুকলো। ঘাবড়ে গেছে সে। চোখমুখ শুকনো দেখাচ্ছে।

হঠাৎ উত্তেজনাপূর্ণ শোরগোলে পড়ানো বন্ধ করতে হলো। দ্রুত বাইরে বেরুলেন স্যার।মহিমের পরিবারের লোকজন স্যারকে ঘিরে ফেলেছে।

নেপাল ডোমের ছেলেটি নির্লিপ্ত চোখে সেদিকে চেয়ে বাদামের শাঁস মুখে পুরলো। এরকমটা নতুন কিছু নয়। এই দৃশ্য তার খুব চেনা। মৃত্যুতেও আসলে কারাগার ঘোচে না মানুষের! লেখক : সহকারী অধ্যাপক, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!