
আবু বকর মুহাম্মদ হানযালা: পবিত্র রমদানুল মোবারকের আগমনী বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে সমাগত হয় মহিমান্বিত মাস শাবান। আর এই শাবান মাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি হলো ‘শবে বরাত’। মহিমান্বিত রজনি। ভাগ্য নির্ধারণের রাত। রবের দরবারে আত্মসমর্পনের এক মহা সুযোগ। প্রত্যাশা,প্রাপ্তির এক সুবর্ণ মাহেন্দ্রক্ষণ। শবে বরাতের বিশ্লেষণে এসব বিষয়-ই ইঙ্গিত বহন করে।
ফারসি শব্দ ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ ভাগ্য বা মুক্তি। পারিভাষিক অর্থে এটি হলো মুক্তির রজনী। পবিত্র কুরআনে এই রাতকে “লাইলাতুম মোবারকা”(বরকতময় রাত) ও হাদিস শরিফে ‘লাইলাতুন মিন নিসফি শা’বান”( অর্ধ-শাবানের রাত’) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এছাড়াও শবে বরাতের আরো কয়েকটি নাম রয়েছে, যথাক্রমে, “লাইলাতুল বারা’আহ্”( মুক্তি বা দায়মুক্তির রাত),”লাইলাতুদ দুআ’'(দোয়া ও প্রার্থনার রাত),”লাইলাতুল ইজাবাহ্”(দোয়া কবুল হওয়ার রাত)
“লাইলাতুর রহমাহ্”( রহমতের রাত)
“লাইলাতুত তাকফীর”(গুনাহ মোচনের রাত)
“লাইলাতুল ‘ইত্কি মিনান নার” (জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার রাত),”লাইলাতুস সাক্ক” (ফায়সালা বা বরাদ্দের রাত)। মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও আধ্যাত্মিক আবহে এই রাতটি পালিত হয়। মূলত এটি রবের দরবারে আত্মসমর্পণের এবং অতীতের ভুলত্রুটি সংশোধন করে নতুন করে পথ চলার এক সুবর্ণ সুযোগ। শবে বরাতের মহিমা ও তাৎপর্য অসংখ্য নির্ভরযোগ্য হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের বর্ণনায় সুপ্রতিষ্ঠিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতকে ক্ষমার এক বিশেষ বসন্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) ও হজরত আবু সালাবা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, এই রাতে মহান আল্লাহ তাঁর মাখলুকাতের প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক, হিংসুক ও নিরপরাধ মানুষকে হত্যাকারী ছাড়া বাকি সকল বান্দাকে নিঃশর্ত ক্ষমা করে দেন। (মুসনাদে আহমদ, শুআবুল ইমান)।হজরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনায় রাসুল (সা.)-এর একটি দীর্ঘ সিজদার ঘটনা পাওয়া যায়, যা এই রাতের ইবাদতের গভীরতা প্রকাশ করে।
হজরত আয়িশা (রা.) বলেন, “একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ সিজদা করলেন যে আমার ধারণা হলো তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন; আমি তখন উঠে তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম, তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল; তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করে আমার উদ্দেশে বললেন, হে আয়িশা! তোমার কী আশঙ্কা হয়েছে? আমি উত্তরে বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.)! আপনার দীর্ঘ সিজদা থেকে আমার আশঙ্কা হয়েছিল আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি না? নবীজি বললেন, তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলই ভালো জানেন।
তখন নবীজি (সা.) বললেন, এটা হলো অর্ধ শাবানের রাত; এ রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন; ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করে দেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন। (শুআবুল ইমান)। শবে বরাতের মূল চেতনা হলো আত্মশুদ্ধি। এটি কেবল প্রচলিত কোনো উৎসব নয়, বরং নিভৃতে ইবাদত ও রোনাজারির মাধ্যমে মহান স্রষ্টার নৈকট্য লাভের সময়। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “অর্ধ শাবানের রাতে আল্লাহ তা’আলা প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং বনু কালব গোত্রের ছাগলের পালের পশমের সংখ্যার চেয়েও বেশি মানুষকে ক্ষমা করে দেন”(তিরমিজি, হাদিস: ৭৩৯)।
এ রাতে নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, তওবা-ইস্তিগফার এবং নিজের ও মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা জরুরি। দিনের বেলায় নফল রোজা রাখা এই রাতে ইবাদতের পূর্ণতা দান করে।কেননা, এ দিনে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং আহ্বান করেন: কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছো কি? আমি ক্ষমা করব; কোনো রিজিকপ্রার্থী আছো কি? আমি রিজিক দেব; আছো কি কোনো বিপদগ্রস্ত? আমি উদ্ধার করব। এভাবে ভোর পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে আহ্বান করতে থাকেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৮৪)। হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যখন শাবান মাসের মধ্যরাত্রি (১৪ শাবান দিবাগত রাত) আসে, তখন তোমরা রাতে ইবাদত করো এবং দিনের বেলা রোজা রাখো”(ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৮৮)। তাছাড়া,শবে বরাতের এই পবিত্র লগ্নে কবরবাসী মাতা-পিতা ও প্রয়াত আত্মীয়দের কবর জিয়ারত করে তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করা সুন্নাহ ও পরম সৌভাগ্যের কাজ।
হজরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে: নবীজি (সা.) এ রাতে মদিনার কবরস্থান ‘জান্নাতুল বাকি’তে এসে মৃতদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করতেন। মহান আল্লাহ তায়ালা অতি দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি সর্বদা স্বীয় বান্দাকে মাগফিরাতের চাদর দিয়ে ঢেকে রাখতে চান। তা সত্ত্বেও এমন কিছু জঘন্য পাপ আছে, যেগুলোতে লিপ্ত ব্যক্তিদের আল্লাহ তায়ালা এই বিশেষ রাতেও ক্ষমা করেন না। আসুন আমরা সেই পাপগুলো জেনে নিই, যেন আমাদের মধ্যে তা থাকলে আমরা তাওবা করার প্রয়াস পাই।১)মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী, ২)অহংকারবশত টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী,৩)অহংকারী ও উদ্ধত ব্যক্তি,৪)নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি, ৫)পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান,৬)দায়ূছ(যে ব্যক্তি তার পরিবারে অশ্লীলতা বা বেপর্দার সুযোগ দেয় এবং তাতে বাধা দেয় না।),৭)ব্যভিচারী নারী ও পুরুষ। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সমাজে এই বরকতময় রাতকে কেন্দ্র করে কিছু অনৈসলামিক প্রথা ঢুকে পড়েছে। তাই,শবে বরাতের বর্জনীয় বিষয় হিসেবে যেসব বিষয় থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে ; (১) আতশবাজি, পটকা ফোটানো, (২) ইবাদত-বন্দেগি বাদ দিয়ে খামোখা ঘোরাঘুরি করা, (৩) অযাচিত আনন্দ-উল্লাস করা, (৪) বেহুদা কথাবার্তা ও বেপরোয়া আচরণ করা, (৫) অন্য কারও ইবাদতের বা ঘুমের বিঘ্ন না ঘটানো।
এছাড়া অনেকে এই রাতকে কেবল হালুয়া-রুটি বা ভোজের উৎসবে পরিণত করেন। ভালো খাবার খাওয়া ও খাওয়ানোতে দোষ নেই, কিন্তু একে শবে বরাতের অপরিহার্য আমল মনে করা ঠিক নয়। মনে রাখতে হবে, এটি ভোজনের রাত নয় বরং ভজনের রাত। আবার কিছু ক্ষেত্রে কট্টরপন্থাও দেখা যায়—অনেকেই এই রাতের ফজিলতকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে চান। এটিও অনুচিত। হাদিস ও সালাফদের আমল দ্বারা এই রাতের বিশেষ মর্যাদা প্রমাণিত।ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মতে, সালাফে সালেহীন বা ইসলামের পূর্ববর্তী মনিষীরা এই রাতে নফল নামাজ ও দীর্ঘ তিলাওয়াতের মাধ্যমে সময় অতিবাহিত করতেন। বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি উভয়টি পরিহার করে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করাই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। সুতরাং শবে বরাত আমাদের জন্য এক আধ্যাত্মিক বসন্ত। ব্যক্তিগত ইবাদত ও নিভৃত কান্নাকাটির মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য। মহান আল্লাহ আমাদের সঠিক পন্থায় আমল করার তৌফিক দান করুন-আমীন।
লেখক: শিক্ষার্থী : আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। মুঠোফোন : 01829910500
Lohagaranews24 Your Trusted News Partner