Home | শীর্ষ সংবাদ | যেভাবে এলাম লেখালেখির জগতে

যেভাবে এলাম লেখালেখির জগতে

image_printপ্রিন্ট করুন

ফিরোজা সামাদ : বড়োদের মুখে শুনেছি, ছোট্টবেলা থেকেই নাকি কথায় কথায় ছন্দ মিলাতাম বলে অামায় নিয়ে হাসতো সবাই। তবে সংসার সমরাঙ্গনে পা দিয়ে নিয়মিত দৈনন্দিন ডায়রী লেখার অভ্যাস ছিলো, এখনো অাছে।

লেখার অভ্যাসটি উত্তরাধিকার সূত্রে অামার মরহুমা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। সেখানে অার্থিক হিসাব নিকাষ সহ দুঃখ-কষ্ট, হাসি-বেদনা, ও কথোপকথন ঠাঁই পেতো। অামিও মায়ের পথ অনুসরণ করে দৈনন্দিন হিসেবের খেরোখাতায় হৃদয়ের টুকিটাকি কিছু অনুভূতি লিখে রাখতাম। যা এখনো অামার সঞ্চয়ের ঢালিতে স্বযত্নে রক্ষিত রয়েছে, এখনো।

প্রকাশ্যে অল্প স্বল্প লেখালেখি শুরু ১৯৯৮ সাল থেকে। তখন অামি বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার অফিসে চাকুরিরত। বরিশাল বিভাগীয় প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে একটি বাৎসরিক স্মরনিকা বের করা হয়। সেখানে যাদের লেখা প্রকাশিত হবে, তাদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিলো। ওই তালিকায় কিভাবে, কে যে অামার নামটি অন্তর্ভুক্ত করেছিলো? অাজো তা জানা হয়নি। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছিলো, বাধ্যতামূলক লেখা দিতেই হবে । অগত্যা দিলাম একটি কবিতা লিখে। সেই শুরু লেখা প্রকাশের। শুরু হাতে খড়ি । তারপর থেকে ছোট ছোট টুকটাক লেখা অনুভূতি ডায়রীর পাতায় সীমাবদ্ধ ছিলো। এরপর পেড়িয়ে গেছে দের দেরটি যুগ। খাকদোন নদীর উজান বেয়ে কির্ত্তনখোলার জোয়ারে ভাসতে ভাসতে অবশেষে একদিন নোঙর করলাম অামি বুড়িগঙ্গার ঘাটিতে, সেই ২০০৪ সালে। ঢাকায় বসতি না গড়লে হয়তো সাহিত্য জগতে অামার পা রাখা হতো না কখনোই। স্থান-কাল-পাত্র তিনটির অবস্থান ছিলো হয়তো ইতিবাচক। শনির দশা শেষ হয়ে বৃহস্পতি তখন তুঙ্গে অবস্থান করছে।

সে যাই হোক, যে জন্য অাজকের এই লেখা। অাজকের ভার্চুয়াল জগত শুরু হয়েছে কবে? সে অামার জানা ছিলো না। এই জগতের প্রতি অামার কোনো অাগ্রহও ছিলোনা কোনোদিন। চাকুরি -স্বামী সংসার নিয়ে দিনগুলো বেশ ভালোই কেটে যাচ্ছে নিজের অজান্তেই। বেশ কিছুদিন পর একদিন অামার সামাদ পরিবারের জেষ্ঠা রাজকন্যা বড়ো নাতনি সীমন্তি বললো, দাদি তুমি এতো সুন্দর কবিতা, ছড়া ও গান লেখো তা তো ফেসবুকে দিতে পারো। তখন তোমার সব বন্ধুরা দেখবে, লাইক, কমেন্টস করবে, তোমার তখনভীষণ ভালো লাগবে । কথাগুলো শুনে অামারও তখন খুব ভালো লাগলো, অাগ্রহি হলাম।

কিন্তু; ফেসবুক খুলবো কিভাবে? ২০১৪ সনে কোনো একদিন অামার সেই নাতনিই এসে ফেসবুক খুলে অামায় অপারেট করা শিখিয়ে দিয়ে গেলো। শুরু হলো অামার কবিতা প্রকাশের দ্বার উম্মোচন। তারপরে দেখলাম ফেসবুকে তো কবিদের ছড়াছড়ি। অামি অার কি করি ? অামিও অামার ফেসবুকে কবিতা ছড়িয়ে দিতে থাকি । পাশের ফ্ল্যাটে অামার কন্যা সমতুল্য একজন, নাম জেসমিন অামার কবিতার নিয়মিত পাঠক শ্রোতা হয়ে উঠলো। কোনদিন কোন কবিতা লিখলাম ও সকাল বিকাল এসেই শুনতে চাইতো। অামারও অসম বয়সি ওই মেয়ের সাথে অদ্ভুত এক বন্ধুত্ব হয়ে গেলো কখন? বুঝতে পারলাম না। তখন অামি অামার বনানীর ফ্ল্যাটে বসবাস করতাম।

২০১৫ তে বনানীর ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে নিজের বাড়ি নিকেতন, গুলশান-১ চলে এলাম। এখানেও পাশের বাসার নীলা ভাবী হয়ে উঠলো অামার ফ্যান। তিনি প্রতিদিন অাসতো কী লিখছি তা জানতে? কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের কোনো চিন্তা অামার মাথায় অাসেনি।তবে, এরই মধ্যে অামার তিনির (সাহেব) পরিচিতির সূত্র ধরেই বেশ কয়েকটি কবিতা দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক সংবাদ, নয়া দিগন্ত সহ দু-একটি অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত হতো মাঝে মাঝে। তাতেই এই মন অামার ভরপুর ছিলো। নীলা ভাবীই সর্বপ্রথম অামায় অনুপ্রাণিত করতে থাকে কবিতাগুলো কাব্যগ্রন্থাকারে প্রকাশের জন্য। তাদের যে একটি প্রকাশনা রয়েছে তা অামি জানতামনা। নীলা ভাবী তার বর নাসিম ভাইকে স্বপ্রনোদিত হয়ে বিষয়টি বলতেই তিনিও অাগ্রহী হলেন। কী অার করা ? নিজের লেখা কবিতা মলাটবদ্ধ হবে! জাতীয় গ্রন্থ মেলায় যাবে? বিষয়টি অামার মনে স্বপ্নের মতোই ঘুরপাক খেতে থাকে।

কয়েক মাস প্রতিক্ষার পর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! ২০১৬ ‘য়র জাতীয় গ্রন্থমেলা সামনে রেখে ৮০টি কবিতা নিয়ে পদযাত্রা শুরু করলো অামার স্বপ্নের ” ভালোবাসার গল্প শোনাও নিরন্তর ” কাব্যগ্রন্থটি ! কাব্যগ্রন্থটির মোড়ক উম্মোচন করা হয়েছিলো দেশের বরেণ্য বেশ কয়কজন গুণী কবি লেখকের হাত দিয়ে, গ্রন্থমেলা শুরুর একদিন দূরত্বে দাঁড়িয়ে “বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে।” সেখানে লেখা ছিলো “মানুষ তার, স্বপ্নের সমান বড়ো “! অামি সেদিন অনুভব করেছিলাম ” মানুষ তার স্বপ্নের থেকেও অনেক বড়ো কিছু পায় মহান অাল্লাহর অপার কৃপায় ! ” তারপর লেখার প্রতি অারো অাগ্রহ ও অাকর্ষণ বেড়ে গেলো। লিখতে থাকলাম ভুলভাল বানানে। ক্রমান্বয়ে অামার ফেসবুক বন্ধুও বাড়তে থাকে । দীর্ঘ বছরের ব্যবধানে বরগুনার অনেকের মন থেকেই ফিরোজা নামটি মুছে গিয়েছলো। ফেবুকের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে তাদের ফিরে পেতে থাকি। কেউ এসেছে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে অাবার কেউ এসেছে কৌতুহলের বসে।

অামার বড়ো বোনের নাতি এম. সোলায়মান । সংবাদ পত্রের সাথে সংযুক্ত সেই ছাত্রাবস্থায়। বরগুনার স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা দীপাঞ্চলে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে ঢাকায় এসে একটি অনলাইন পত্রিকায় তখন কাজ করছিলো। এক সময় ওর সেই অনলাইন পত্রিকা “সাহসি সংবাদ” এও অামার কয়েকটি কবিতা প্রকাশ করেছে । পরে অবশ্য ওটা ছেড়ে দিয়ে বর্তমানে দৈনিক যায়যায়দিন এবং দৈনিক অালোকিত সময় পত্রিকায় যোগদান করে অামার বিভিন্ন লেখা ও সমকালিন লেখা লেখা নিয়ে নিয়মিত কলাম প্রকাশিত হতে থাকে। ও অামার কাছেই থাকে, বর্তমানে দুইটি প্রতিষ্ঠিত দৈনিকে সিনিয়র এডিটর হিসেবে কর্মরত। কাজেও বেশ মনোযোগি। ওর উত্তোরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।

প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর, বইমেলায় বসেই কেউ একজন অামায় সালেক নাছির উদ্দিন নামে একজন সাহিত্য প্রেমির ফেসবুকে যুক্ত হতে অনুপ্রাণিত করেন। সালেক নাসিরুদ্দিন সমধারা নামে একটি ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং দৈনিক ভোরের কাগজের সাহিত্য সম্পাদক। তার সাথে যুক্ত হয়ে কখন যেনো সমধারা পরিবারের একজন সদস্য হয়ে গেলাম। সেই সমধারা পরিবারে অামি অামার অনেক প্রিয়জনকেও সদস্য করতে পেরেছি। তারাও এখনো সেখানে নিয়মিত লিখছে, অনেক সময় অামার উপস্থিতি না থাকলেও। দৈনিক ভোরের কাগজেও অামার লেখা প্রকাশিত হতো। এখন অামি অনেকটাই অন্তরালে থাকতে চেষ্টা করছি। তারপরেও পুত্র সমতুল্য ফেসবুক বন্ধু Maruf Khan তার অনলাইন পত্রিকায় অামার লেখা প্রকাশ করে অামায় কৃতজ্ঞতার বন্ধনে অাবদ্ধ রেখেছেন।

নতুন করে খুব বেশি কবিতা, ঝড়া কবিতা, গল্প বা অন্য কোনো লেখা লিখছি না। শুধু অসমাপ্ত কাজগুলো সংশোধন,পরিবর্ধন, পরিমার্জন করছি। কবিতায় সুর দিয়ে গানে রূপান্তর করতে চেষ্টা করছি । অামার মা’কে নিয়েও লেখার একটু চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, যা অামার স্বপ্নের অার একটি অংশ। লেখা ছিলো অামার মনের অানন্দের খোরাক মেটানো অনেকটা নেশার মতো। কখনোপেশাদারিত্বের কথা মনেও অাসে নি। ভবিষ্যতে সে ভাবনা অামার নেই। যা কিছু করি মন চাইলে,মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করার বাসনা অামার নেই।

যে ক’টা দিন এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকি, অামি যেনো মানবিকতার সাথে মহান অাল্লাহর পথে থেকে অন্তত অসহায় কিছু মানুষের জন্য নিজেকে নিবেদন করে যেতে পারি, অাপনারা শুধু সেই দোয়া করবেন, অামার পরিবারের জন্য!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!