Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | চট্টগ্রামে মেট্রোরেল নিয়ে তৎপরতা শুরু

চট্টগ্রামে মেট্রোরেল নিয়ে তৎপরতা শুরু

নিউজ ডেক্স : চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মাধ্যমে নগরে ‘মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট’ (এমআরটি) সার্ভিস চালু তথা মেট্রোরেল এবং মনোরেল নির্মাণে গত পাঁচ বছরে চারটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করে। এছাড়া ২০১৯ সালে বেসরকারি একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দিয়ে শহরে মেট্রোরেল চালুর প্রাক সম্ভাব্যতা যাচাই (প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি) করে চসিক। প্রতিষ্ঠানটি ৫৪ দশমিক ৫০ কিলোমিটার রুটে পৃথক তিনটি মেট্রোরেল সার্ভিস চালু করা সম্ভব বলে জানায়। অবশ্য সেখানে নানা প্রতিবন্ধকতার কথাও বলা হয়।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ এবং প্রাক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরও চট্টগ্রাম শহরে এমআরটি চালু বা এ সংক্রান্ত আরো অধিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। সর্বশেষ গত ৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ঢাকার পর চট্টগ্রামেও মেট্রোরেল চালুর নির্দেশ’ দেয়ার পর তৎপরতা শুরু করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সম্মেলন কক্ষে ‘চট্টগ্রাম মহানগরীতে মেট্রোরেল অথবা মনোরেল চালুকরণ’ সংক্রান্ত সভা হওয়ার কথা রয়েছে। এতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম উপস্থিত থাকবেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, বৈঠকে কী আলোচনা হবে সেটা নিয়ে এখনো নিশ্চিত না। মেট্রোরেল চালুর বিষয়ে আমরা প্রাক সম্ভাব্যতা যাচাই করেছিলাম। সেটা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই করতেও মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম। এছাড়া একটি চাইনিজ প্রতিষ্ঠান মনোরেল করার আগ্রহ দেখিয়ে আমাদের সাথে এমওইউ (সমাঝোতা স্মারক) সই করার প্রস্তাব দেয়। আমরা এমওইউ করিনি। তবে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য চিঠি দিয়েছিলাম। অনুমোদন পাইনি। সবকিছু মিলিয়ে আজকের বৈঠকে আলোচনা হবে বলে জানান তিনি।

মেট্রোরেল ও মনোরেলের পার্থক্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এ প্রকৌশলী বলেন, মেট্রোরেলের চেয়ে মনোরেলের ধারণ ক্ষমতা ও গতি একটু কম। মনোরেল একটু ছোট আকৃতির। ট্র্যাকে ইঞ্জিন নষ্ট হলে রেসকিউ প্রবলেম হয় মনোরেলে। ওই জায়গা থেকে মেট্রোরেল হলে সুবিধা বেশি।

নগরে মেট্রোরেলের দুই প্রস্তাব : ২০১৬ সালে প্রথমবার চসিকের মাধ্যমে নগরীতে মেট্রোরেল চালু করতে আগ্রহ প্রকাশ করে চীনের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ওই বছরের ২৮ নভেম্বর নগর ভবনের সম্মেলন কক্ষে সিটি কর্পোরেশন ও ‘সিনোহাইড্রো ব্যুরো অ্যান্ড কো. লি.’ নামে চীনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির মধ্যে একটি মতবিনিময় সভাও হয়েছিল। মূলত, ওই সভায় সিনোহাইড্রো ব্যুরো অ্যান্ড কো. লিমিটেডের কান্ট্রি ম্যানেজার হোয়াং জিং চট্টগ্রাম শহরে মেট্রোরেল চালুর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। তবে পরবর্তীতে এ কার্যক্রমের তেমন অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায় নি। এরপর ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি চট্টগ্রামে মেট্রোরেল নির্মাণ, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে চসিকের মতামত চেয়েছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছিল চসিক। একই বছর ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড ট্রেন চালুর বিষয়ে একটি সমীক্ষা শুরু করে সরকার। ওই হাই স্পিড ট্রেনের সঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগরীকেও যুক্ত করার আলোচনা চলে তখন। এ বিষয়ে ওই বছরের ২০ জানুয়ারি চীনের প্রতিষ্ঠান ‘চায়না রেলওয়ে ডিজাইন কর্পোরেশন’ চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে প্রস্তাবও দেয়। সর্বশেষে কয়েকদিন আগে হাইস্পিড ট্রেনের পরিকল্পনা থেকে সরে আসে সরকার। ফলে ওই প্রকল্পে চট্টগ্রাম মহানগরীর যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও থমকে গেল।

মনোরেলের দুই প্রস্তাব : পরবর্তীতে ২০২১ সালের ১৯ মে মনোরেল চালুর প্রস্তাব করে চীনের প্রতিষ্ঠান উইহায় ইন্টারন্যাশনাল ইকোনোমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেটিভ কোম্পানি লিমিটেড ও চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের একটি টিম। সর্বশেষ একই বছরের ৮ জুন মনোরেল চালুর প্রস্তাব করে চায়না প্রতিষ্ঠান উইটেক।

সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আগ্রহ চসিকের : ২০২১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘বাসস্থান ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনসালটেন্ট লিমিটেড’ এর সাথে সমাঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই) সম্পাদনের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুমতি চেয়েছিল চসিক। তবে মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেয়নি। তবে একই বছরের ১ নভেম্বর নগরে মেট্রোরেল অথবা মনোরেল সার্ভিস চালুর বিষয়ে ইতোপূর্বে সম্পন্নকৃত প্রাক সম্ভাবতা যাচাইয়ের উপর চসিককে মতামত পাঠানোর নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। চসিক পরবর্তীতে জবাবও পাঠায়।

কি ছিল প্রাক সম্ভাব্যতায় : এমআরটি বিষয়ে ২০১৯ সালে ‘বাসস্থান ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনসালটেন্ট লিমিটেড’ দিয়ে প্রাক সম্ভাব্যতা যাচাই করেছিল চসিক। একই বছরের জুলাই মাসে চসিকের কাছে হস্তান্তরকৃত প্রতিবেদনে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি জানায়, নগরে ৫৪ দশমিক ৫০ কিলোমিটার রুটে পৃথক তিনটি এমআরটি সার্ভিস চালু করা সম্ভব। এ মেট্রোরেলের সর্বোচ্চ গতি হবে ঘন্টায় ১০০ কিলোমিটার এবং গড় গতি ৪৫ কিলোমিটার। চালু হলে একটি ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটির মাধ্যমে ঘণ্টায় দুই প্রান্তে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা যাবে। প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল লাইন নির্মাণে ব্যয় হবে (সম্ভাব্য) এক হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা। ‘বাসস্থান ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনসালটেন্ট লিমিটেড’ এর প্রতিবেদনে তিনটি এমআরটি লাইন বা রুটের কথা প্রস্তাব করে। এর মধ্যে কালুরঘাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার, সিটি গেইট থেকে শহীদ বশিরউরজ্জামান স্কোয়ার পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার এবং অঙিজেন থেকে এ কে খান বাস স্টপ পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৫০ কিলোমিটার। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে তিনটি এমআরটি লাইনে ৪৭টি স্টেশন করার প্রস্তাব আছে।

প্রতিবন্ধকতাগুলো : প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে এমআরটি চালুর ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রতিবন্ধকতার বিষয়ও উঠে আসে। তবে এসব প্রতিবন্ধকতা আছে শুধু এমআরটি লাইন-১ তথা কালুরঘাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত অংশে। এখানে বহাদ্দারহাট থেকে লালখান বাজার সড়কে ইতোমধ্যে নির্মিত ফ্লাইওভার এবং লালখান বাজার হতে বিমানবন্দর সড়কে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারকেই এ প্রতিবন্ধক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবনা হচ্ছে- বহাদ্দারহাট থেকে লালখান বাজার অংশে বিকল্প পথে এমআরটি চালু করা। এ পথ হচ্ছে- বহাদ্দারহাট, বাদুরতলা, কাপাসগোলা, চকবাজার, কাজীর দেউড়ি ও লালখান বাজার। এছাড়া লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্মাণাধীন এলিভেটেড এঙপ্রেসওয়ের কাজ স্থগিত করা এবং সড়কটি এমআরটি এর জন্য উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। লালখান বাজার হতে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়ককে এলিভেটেড এঙপ্রেসওয়ে ডিজাইন পুর্নবিবেচনা করে সমন্বিতভাবে এলিভেটেড এঙপ্রেসওয়ে ও এমআরটি স্থাপন করা যেতে পারে বলেও প্রস্তাব দেয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি উড়াল সেতুর পাশ দিয়ে এমআরটি নির্মাণ করার প্রস্তাব ছিল। সেক্ষেত্রে ভূমি হুকুম দখল, ক্ষতিপূরণ ও ইউলিটি শিফটিং এর জন্য ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে পরে বলেও সতর্ক করা হয়।

তবে ইতোমধ্যে দ্রুতগতিতে এগুচ্ছে এলিভেটেড এঙপ্রেসওয়ে নির্মাণ কাজ। এর ডিজাইন পুর্নবিবেচনার প্রস্তাবনাটিও আমলে নেয়নি সিডিএ। ফলে এ রুটে এমআরটি নির্মাণে অনিশ্চিয়তা তৈরি হয়েছে। -দৈনিক আজাদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*