Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা গ্যাস সংযোগে পিছিয়ে

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা গ্যাস সংযোগে পিছিয়ে

image_printপ্রিন্ট করুন

LNG_-Pipe-Line-Working-Prog

নিউজ ডেক্স : তরলায়িত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নিয়ে মহেশখালীর মাতারবাড়িতে অপেক্ষা করছে জাহাজ ‘এক্সিলেন্স’। দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ঘনমিটার গ্যাস রয়েছে জাহাজটিতে। সবার আগে এই গ্যাস যাতে চট্টগ্রাম ব্যবহার করতে পারে সেজন্য আনোয়ারা পর্যন্ত পাইপ লাইন স’াপন করা হয়েছে। আনোয়ারায় করা হয়েছে সাব স্টেশন। সেখান থেকে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) নগরীতে গ্যাস সরবরাহের সকল প্রস’তি সম্পন্ন করে রেখেছে। কিন’ আদৌ কি এই গ্যাসের পুরো সুবিধা চট্টগ্রাম নিতে পারবে?

ইতিমধ্যে এই প্রশ্ন গ্যাস বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান কেজিডিসিএল এবং এলএনজি আমদানিকারী সংস’া পেট্রোবাংলার মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ চট্টগ্রামে দৈনিক ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন থাকলেও বর্তমানে খাগড়াছড়ির সেমুতাং থেকে ২ মিলিয়ন ঘনফুটের সাথে জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে ২৭৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এখন বাড়তি গ্যাস চট্টগ্রামের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ধারণ করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে পেট্রোবাংলা ও কেজিডিসিএলের। আর এই সন্দেহের কথা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চিটাগাং চেম্বারে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের সাথে মতবিনিময় সভায় উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর খনিজ ও জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহি চৌধুরী এবং পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়েজউল্লাহসহ অনেকে। এই সন্দেহের অন্যতম কারণ হচ্ছে গ্যাস সংযোগের ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দেয়ার ধরিগতির কারণে। ওই সভায় পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়েজউল্লাহ বলেছিলেন, এর আগে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের সাথে পাঁচ দফায় বৈঠক করেছি। বারবারই বলেছি এলএনজি আসার কথা। কিন’ আপনাদের বিশ্বাস করাতে পারিনি। আজ সেই বিশ্বাস তৈরির জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে আপনাদের এখানে নিয়ে এসেছি। যাতে আর বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের দোলাচালে থাকতে না হয়। সরকার এতো দাম দিয়ে এলএনজি কিনে আনছে তা ব্যবসায়ীদের মাঝে বিক্রি করতে হবে। আপনারা গ্যাসের ডিমান্ড নোটের টাকা দ্রুত জমা দিন।

সভায় আরো বলা হয়েছিল, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা যদি প্রথমে এলএনজি গ্রহণের সুবিধা না নেন তাহলে তা জাতীয় গ্রিডে চলে যাবে। সেখান থেকে আবার চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের জন্য বরাদ্দ দেয়া সময় সাপেক্ষ হতে পারে।

সভার এই বক্তব্যের পক্ষে পেট্রোবাংলার প্রস্তুতির নমুনা পাওয়া যায় পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহারহাট পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ ৪০ ইঞ্চি ব্যাসের নতুন পাইপ লাইন স’াপন কার্যক্রমে। গতকাল হালিশহর থেকে পতেঙ্গার সাগর পাড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, হালিশহর আনন্দ বাজার এলাকায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্মাণাধীন আউটার রিং রোডের তলদেশ দিয়ে বসানো হচ্ছ পাইপ লাইন। গ্যাস লাইনটি পতেঙ্গা থেকে বেড়িবাঁেধর ভেতরের (স’লভাগের দিকে) দিক দিয়ে এলেও ইপিজেডের কাছে এসে তা সাগরের দিকে চলে যায়। আবার ইপিজেড শেষ হলে তা বেড়িবাঁধ ক্রস করে স’লভাগের দিক দিয়ে ফৌজদারহাট পর্যন্ত যায়।

এই পাইপ লাইন স’াপন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দেশে গ্যাসের পাইপ লাইন স’াপনকারী সরকারি সংস’া গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) মহেশখালী-আনোয়ারা-ফৌজদারহাট পর্যন্ত পাইপ লাইন স’াপন প্রকল্পের পরিচালক সুশীল কুমার সরকার বলেন, ‘মহেশখালী থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত পাইপ লাইন স’াপনের কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। আনোয়ারায় একটি সাব স্টেশন হচ্ছে। সেখান থেকে একটি লাইন দিয়ে কেজিডিসিএলের মাধ্যমে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ করা হবে। আরেকটি লাইন চলে যাবে পতেঙ্গা হয়ে ফৌজদারহাট পর্যন্ত। এই লাইনটি দিয়ে এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।’

জাতীয় গ্রিডে কখন যাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চট্টগ্রামে ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে চলে যাবে। আর এজন্যই নতুন করে এই পাইপ লাইনটি স’াপন করা হচ্ছে।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের পিছিয়ে থাকা ও ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিতে ধীরগতির কারণ প্রসঙ্গে চিটাগাং চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম বলেন, প্রকৃতপক্ষে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারেনি যে এতো আগে এলএনজি চলে আসবে। আর যখন চলে এসেছে নিশ্চিত হয়েছে তখন এই গ্যাস নেয়ার জন্য যে বিনিয়োগ করতে হবে সেই প্রস্তুতি এখনই অনেকের নেই। তবে ব্যাংক ঋণ নিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আবারো চাঙ্গা হবে এবং এই গ্যাস চট্টগ্রামের প্রয়োজন হবে।

জাতীয় গ্রিডে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখনো চট্টগ্রামের গ্যাস আসে জাতীয় গ্রিড থেকে। আর এলএনজি যুক্ত হওয়ার পর চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এতে সমস্যার কিছু নেই।

এবিষয়ে কথা হয় কনফিডেন্স সিমেন্টের ব্যবস’াপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহির উদ্দিন আহমেদের সাথে। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা সবকিছু একটু দেরিতে গ্রহণ করে। এক্ষেত্রেও হয়তো তাই হতে পারে। তবে অবশ্যই এলএনজির বিকল্প নেই, কারণ গ্যাসের প্রয়োজন বিদ্যুৎ দিয়ে মিটবে না।’

ব্যবসায়ীদের সাড়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কেজিডিসিএলের ব্যবস’াপনা পরিচালক প্রকৌশলী খায়েজ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘আমরা ২৬৫ জনকে ডিমান্ড নোট দিয়েছিলাম, এরমধ্যে টাকা জমা দিয়েছে মাত্র ৮১ জন। সংযোগের জন্য টাকা জমা দেয়ার এই হার তুলনামূলকভাবে কম। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চেম্বারের সাথে মিটিংয়ের সময় এই সংখ্যা ছিল ৭০।’

বর্তমানের ৫০০ মিলিয়নের পর সামিটের আরো ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আসছে। তাহলে কি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা সংযোগ না নিলে তা জাতীয় গ্রিডে চলে যাবে? এমন প্রশ্ন করা হলে কেজিডিসিএলের ব্যবস’াপনা পরিচালক প্রকৌশলী খায়েজ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘এধরনের শঙ্কা রয়েছে। তবে আমাদের বিশ্বাস চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা সংযোগ নিবেন। আর যদি সময়মতো সংযোগ না নেন পরবর্তীতে জাতীয় গ্রিড থেকে দেয়া কিছুটা সমস্যা হতেই পারে।

এদিকে পেট্রোবাংলা ও কেজিডিসিএল কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মহেশখালীতে বর্তমানে অবস’ান করা এক্সিলেন্স জাহাজ থেকে দিনে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হবে আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে। আর কিছুদিন পর একই এলাকায় সামিট পাওয়ার আনছে আরো ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। দ্বিতীয় পর্যায়ে আনা ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের পুরোটা দেশের মধ্যাঞ্চলের এলাকায় সরবরাহ করা হতে পারে জাতীয় গ্রিডের পাইপ লাইন দিয়ে। এছাড়া কর্ণফুলী নদীর মোহনায় কাফকো ও সিইউএফএল জেটিতে এবং সাঙ্গুর পরিত্যক্ত টার্মিনালে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস করে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের লক্ষেও কাজ করছে পেট্রোবাংলা। আর তা হলে ছোটো আকারের এসব গ্যাস দিয়ে চট্টগ্রামের চাহিদা পূরণ করে মহেশখালী দিয়ে আসা পুরো গ্যাস চলে যাবে জাতীয় গ্রিডে।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের সমস্যা রয়েছে। গত ২৪ এপ্রিল এলএনজিবাহী জাহাজ আসার পর গ্যাস দুর্ভোগ কমে যাবে বলে কেজিডিসিএল থেকে জানানো হচ্ছে। বর্তমানে জাহাজ থেকে গ্যাস কমিশনিং করতে কিছুটা সময় লাগছে এবং লাইন ঠিক রয়েছে কিনা তা যাচাই করে সরবরাহ করা হবে।

সূত্র : দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!