ব্রেকিং নিউজ
Home | অন্যান্য সংবাদ | হিজরি সনের ইতিকথা

হিজরি সনের ইতিকথা

Hijri-Top20151015062446

মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ : হিজরি সনের সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর আদর্শ ও ঐতিহ্যের ভিত্তি সম্পৃক্ত। যার সঙ্গে জড়িত আছে বিশ্বমানবতার মুক্তির অমর কালজয়ী আদর্শ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় ও পুণ্যময় জন্মভূমি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় গমনের ঐতিহাসিক ঘটনা। যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুওয়াত প্রাপ্তির পর একত্ববাদের দিকে আহবান করায় তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষেরাও বিরোধিতা শুরু করে। গোপনে তিন বছর দাওয়াতি মিশন পরিচালনা পর আল্লাহর নির্দেশে সাফা পাহাড়ে প্রকাশ্যে এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তখন থেকেই পথে প্রান্তরে তাকে আহত, অপমানিত, লাঞ্ছিত ও নির্যাতনের ধারা শুরু হয়েছিল। অত্যন্ত ধৈর্য ও পরম সাহসিকতার সঙ্গে তিনি তাঁর মিশন নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন।

প্রাথমিক ইতিহাস
দারুন নাদওয়া বৈঠকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধন্ত হয়। ঘোষণা করা হয়, তাঁকে জীবিত বা মৃত নাদওয়া গৃহে উপস্থিত করতে পারলেই পুরস্কার হিসেবে পাবে ১০০টি উট। একদল শক্তিশালী যুবক ঐকমত্য পোষণ করল সে রাতেই তাঁর বাড়ি ঘেরাও করে তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটানো হবে।
এদিকে আল্লাহর নির্দেশ, মদিনার মানুষ আপনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, মদিনায় আপনি হিজরত করে চলে যান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নির্দেশে ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর মোতাবেক ২৭ সফর মক্কা মুকাররামা থেকে মদিনার উদ্দেশে হিজরত করেন। ২৩ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মোতাবেক ৮ রবিউল আওয়াল কুবায় পৌঁছেন। ২৭ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মোতাবেক ১২ রবিউল আওয়াল মদিনা মুনাওয়ারায় পৌঁছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এ হিজরতেরই স্মৃতিবহন করে আসছে হিজরি সন।

হিজরি বর্ষ পূর্ণতা লাভ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়কাল থেকেই বিক্ষিপ্তভাবে হিজরি বর্ষ গণনা শুরু হয়। হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতের সময় তা সুনির্দিষ্ট রূপে প্রকাশিত ও বাস্তবায়িত হয়। সে সময় রাষ্ট্রীয় কাজে সন তারিখ ব্যবহৃত না হওয়ায় প্রশাসনিক সমস্যা দেখা দেয়। এ সমস্যা সমাধানকল্পে ১৭ হিজরির ১০ জমাদিউল আউয়াল হজরত আবু মুসা আশয়ারি কর্তৃক হজরত ওমরের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি  সাহাবায়ে কেরামদের মজলিসে শুরায় সবার পরামর্শক্রমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতকে ভিত্তি করে হিজরি সন গণনার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সম্মেলনের স্লোগান ছিল- ‘হিজরতের ঘটনা মিথ্যা থেকে সত্যের পার্থক্য করেছে, মক্কার অবিশ্বাসীদের ওপর ইসলামের বিজয় এসেছে।’ পৃথিবীর ইতিহাসে মুসলমানদের উন্নতি, অগ্রগতি, বিজয় ও সাফল্যের প্রতীক ও শ্রেষ্ঠ তৌহিদী বিপ্লব ছিল হিজরত। যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগ করা ছিল ইসলামের ইতিহাসে একটি মহান ঘটনা। সে কারণেই হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিজরি সন গণনা শুরু হয়।

মহররম দ্বারা হিজরি সন শুরু
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদিনা মুনাওয়ারায় আসেন, তখন মাসটি ছিল রবিউল আওয়াল। হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হিজরি সনের প্রথম মাস ধরেন মহররমকে। যদিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় পৌঁছেন রবিউল আওয়াল মাসে। কিন্তু হিজরতের পরিকল্পনা হয়েছিল নবুওয়াতের ১৩তম বর্ষের হজের মৌসুমে মদিনার আনসারি সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে আকাবার দ্বিতীয় শপথ সংঘটিত হওয়ার পর। তখন ছিল জিলহজ মাসে। তার পরের মাসই হলো মহররম। মুসলমানদের হিজরতকারী প্রথম দলটি মদিনা মুনাওয়ারায় পৌঁছেন মহররম মাসে। এ হিজরত ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদিনায় হিজরতের শুভ সূচনা।

তাছাড়া আরবি বর্ষ গণনায় বিভ্রান্ত লক্ষ্য করে স্বয়ং আল্লাহ্-এর সংশোধনের জন্য একটি আয়াত নাযিল করেন। আয়াতে হিজরি সনের ১ম মাস মহররম, সপ্তম মাস রজব, ১১তম মাস জ্বিলকদ আর ১২তম মাস জিলহজ বলে উল্লেখ আছে। যা ১০ হিজরিতে অবর্তীন হয়।

বাংলাদেশে হিজরি সনের প্রচলন
৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক হিজরি সন প্রবর্তিত হওয়ার এক বছর পরই আরব বণিকদের আগমনের মাধ্যমে আমাদের দেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ও হিজরি সনের প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তীতে ৫৯৮ হিজরি মোতাবেক ১২০৯ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গবিজয়ের মাধ্যমে বাংলার জমিনে মুসলিম শাসনের ইতিহাস সূচিত হয়। হিজরি সন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভের মাধ্যমে জাতীয় সন গণনায় পরিণত হয়। সন গণনায় ৫৫০ বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর থাকার পর ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধের পরাজয়ের মধ্যেমে শেষ হয়।

পরিশেষে…
চন্দ্র মাসের হিসাব রাখা ফরজে কিফায়া, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ও খুলাফায়ে রাশেদার সুন্নাত। যার অনুসরন, অনুকরণ করা মুসলিম উম্মাহর জন্য পূন্যময় ও কল্যাণকর আমল। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ ও ইদ্দতের ক্ষেত্রে চান্দ্রবর্ষের হিসাব ব্যবহার করার তাওফিক দান করুন। চন্দ্র মাসের যাবতীয় আমল করে আল্লাহ নৈকট্য অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*