ব্রেকিং নিউজ
Home | শীর্ষ সংবাদ | সাধনাই শিল্পী নাজমার সৃষ্টিকর্ম

সাধনাই শিল্পী নাজমার সৃষ্টিকর্ম

arist-najma-aktar20160409055704

মিয়া মো. মিঠুন : বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী নাজমা আক্তার। সাধনাই যার সৃষ্টিকর্ম। রঙের খেলায় জয়ী নাজমা আক্তার ছবি আঁকছেন দীর্ঘদিন ধরে। অভিজ্ঞতা ও প্রাণদায়ী প্রেরণা, চর্চার ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন ও পরিপক্বতা স্পষ্ট তাঁর অঙ্কণে। জীবন ও প্রকৃতির নানা ব্যাঞ্জনা তার আঁকা বিমূর্ত সব ছবি থেকে উৎসারিত হয়। হয়ে উঠেছেন নিসর্গ ও জীবনের বিশিষ্ট রূপকার। রঙের প্রয়োগে কখনো উজ্জলতা, কখনো ধূসরতার খেলা। তাঁর চিত্রকর্মে জীবন ও প্রকৃতির নানা বিষয় ভিন্ন-ভিন্নভাবে সন্নিবেশিত। অমূর্ত মূর্ত হয়ে ওঠেছে তার তুলির আঁচরে, যা দর্শক মনে ভাবনার নতুন উৎসারণ জাগে। নাজমা আক্তার জানান, সময় পেলেই ছবি আঁকা তার কাজ নয়। ছবির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় দরকার।

শিল্পী নাজমা আক্তারের জন্ম ১৯৫৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। তিনি ১৯৮৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে এমএফএ ডিগ্রি লাভ করেন। মালয়েশিয়ার পেনাং, জার্মানির বার্লিন, গ্রীসের এথেন্স, বুলগেরিয়া, লন্ডন, নেপাল ভুটান, ভারতের কলকাতা ও ত্রিপুরাসহ দেশ-বিদেশে তার ১০টি একক সফল চিত্রপ্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছে। এছাড়াও তিনি ভারতের কর্ণাটক ও জয়পুরসহ দেশ-বিদেশে ৩৪টি গ্রুপ চিত্রপ্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি বুলগেরিয়ার সোফিয়াতে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল আর্ট এক্সপোতে বিচারকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে পেয়েছেন রশীদ চৌধুরী মেমোরিয়াল পুরস্কার, এর আগে তিনি ১৯৮১-৮২ দু’বছর চিত্র অঙ্কণে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার অর্জনে সক্ষম হন। ২০০৬ সাল থেকে তাঁর একক চিত্রাঙ্কণ প্রদর্শনী হয়ে আসছে। বর্তমানে নাজমা আক্তার ঢাকা ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজে চারুকলা বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত এবং শিল্পচর্চায় নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন নিবিষ্ট অনুরাগে। নানা চড়াই-উৎরাই, সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, ধৈর্য, কষ্ট এবং প্রতিকূলতা পেড়িয়ে দৃঢ় মনোবলের কারণেই নাজমা আক্তার এই পর্যায়ে এসেছেন।

শৈশবে গ্রামের আলো-বাতাসে বেড়ে উঠেছেন নাজমা আক্তার। স্মৃতিময় গ্রাম থেকেই তিনি তার উপকরণ সংগ্রহ করেছেন। গ্রামীণ জীবনের রঙের সৌরভে তিনি আন্দোলিত হয়েছেন। গ্রামের মেঠোপথ, রেললাইন, পুকুর, ধানক্ষেত, গাছপালাসহ নানা প্রাকৃতিক দৃশ্য বিচিত্র রঙে ফুটে ওঠে তার অঙ্কণে। রং তুলিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে ছোট বেলা থেকে বিভিন্ন কারণে জমে থাকা বেদনা, হতাশা, দুঃখ, কষ্ট। ছোট থেকেই স্বাধীনচেতা ছিলেন নাজমা আক্তার। বেড়ে ওঠেছেন কুমিল্লায় মামার বাড়িতে। নিজের অজান্তে শিশুকাল থেকেই ছবি আঁকায় তার হাতে খড়ি। পড়াশুনায় গভীর মনোযোগ না থাকলেও ছবি আকাঁর তীব্র বাসনা তাকে সর্বদা তাড়িত করত। ছবি আঁকার জন্য আলাদা কলেজ আছে- একথা শোনে নাজমা আক্তার সেদিন বিস্মিত হয়ে পড়েন। আর এ কারণেই বুঝি তার ছোট মনে বড় হতে থাকে ছবি আঁকার স্বপ্ন। গতানুগতিক পড়াশুনা তার মোটেই ভালো লাগত না। কুমিল্লার ফয়জুননেছা সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাস করেন। এরপর ভর্তি হন সরকারি আর্ট কলেজে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ)। আর্ট কলেজে অধ্যয়নকালে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্নাতক শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা চালিয়ে যান। সে সময় তার ছবি আঁকা হয়নি, তিনি কেবল ক্লাসই করেছেন। ১৯৮৬ সালে স্বামীর চাকরির সুবাধে তিনি ফের ঢাকায় ফিরে আসেন। হাতিরপুলের বাসা থেকে পায়ে হেঁটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করেছেন। এক বছর ড্রপ দিতে হয়েছে। তারপরও তিনি হতাশ হননি। ফের মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছেন। ততদিনে তাঁর ছেলেও স্কুলে ভর্তি হয়। ১৯৯১ সালে তাঁর মাস্টার্স শেষ হয়।

তিনি নিজেও জানতেন, এভাবে কখনো ছবি আঁকা যায় না। সে সময় ভাবতেন মাস্টার্স শেষ হোক। পরে ছবি আঁকা যাবে। সকলে যখন ঘুমান, তখন সময়ের অভাবে তিনি বাথরুমের আলোয় পিড়িতে বসে থিওরি পড়তেন। সকালে বাড়ির কাজ করার পর আর মনোযোগ থাকে না। ফলে তার পক্ষে ছবি আঁকা সম্ভবপর হয়ে উঠেনি। ছেলে অনিন্দ্য সে সময় বাবার ভূমিকা পালন করেন। ছেলে না থাকলে তিনি এ পর্যায়ে আসতে পারতেন না বলে দাবি করেন। তিনি ছবি নিয়ে সমালোচনা লেখা শুরু করেন। এ সমালোচনা লেখার সুবাদে শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে তিনি নানা জায়গায় গিয়েছেন। ঢাকার বাইরে রংপুরে তিনি শিল্প সমালোচক হিসেবে প্রথম পা রাখেন। এভাবে বেশ কয়েকটি জেলায় যান। পুনরায় শিল্পচর্চা শুরুর করার সময় তিনি ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, স্পেন প্রবাসী শিল্পী মনিরুল ইসলাম এবং বিভাগীয় শিক্ষক আবদুস সাত্তারের অনুপ্রেরণার কথা স্বীকার করেন।

art

দীর্ঘদিন তিনি ছবি আঁকা থেকে বিরত থাকায় মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছেলেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর পর ২০০১ সালের পর থেকে তিনি একাগ্র চিত্তে ছবি আঁকা শুরু করেন। নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তি এবং অধ্যবসায় গুণে তিনি রাত-দিন ছবি নিয়ে নিমগ্ন থেকেছেন। ২০০৬ সালে তিনি প্রথম প্রদশর্নী করেন। কেবল অঙ্কণে নয়, গ্যালারিতে ছবি টাঙ্গানোর ব্যাপারেও নান্দনিকতা খুঁজেন নাজমা আক্তার। তিনি ১৯৭৮ থেকে এ পর্যন্ত দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব চিত্র প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে খ্যাতিমানদের সঙ্গে তাঁর নিজের চিত্রকর্মকে বোদ্ধামহলে পরিচিত করে তুলেছেন। শিল্পীদের কাছে হয়েছেন আপনজন। নাজমা আক্তার কখনো ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে ছবি আঁকেন না। ছবি যখন দেওয়ালে ঝুলানো হয়, তখন দর্শকও দর্শক, নাজমা আক্তারও একজন দর্শক। তার মতে, ‘ছবিই তাঁকে তাঁর আসনে আসীন করবে। খ্যাতির পিছনে দৌঁড়ালে ছবি আঁকা হবে না। ছবি আঁকা ঠিক থাকলে যশ, খ্যাতি অর্থ আপনাআপনি আসবে।

নাজমা আক্তার এক কাজ একবারই করেন। কারো অনুরোধে কোনো ছবি পুনরায় আঁকেন না। বলতে গেলে তিনি একজন স্বাধীনচেতা শিল্পী। তার প্রত্যেক সৃষ্টিকর্মের রং, বিষয় এবং মেজাজসহ সব কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। সর্বদা নতুন কোনো সৃষ্টি তাঁকে ধাবিত করে।

নাজমা আক্তার একজন শিল্পী সমালোচকও। তাঁর মতে, এখন কেউ সমালোচনা করতে পছন্দ করেন না। কিন্তু তিনিই প্রথম সাহস দেখিয়ে সমালোচনার অর্থেই সমালোচনা করেছেন। অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি জানান, ‘সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকলে কখনোই কোনো কাজ শুরু করা যাবে না। কারণ তিনি মনে করেন, সুযোগ কেউ কাউকে উপহার দেয় না। সুযোগ করে নিতে হয়। উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ শিল্পী হয়ে ওঠে না। এটা তাকে অর্জন করতে হয়। শিল্পী হওয়ার জন্য নিজ উদ্যোগ থাকা চাই। নিজের ইচ্ছা, তীব্র বাসনা আর চর্চা থাকলে শিল্পী হয়ে ওঠা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*