ব্রেকিং নিউজ
Home | লোহাগাড়ার সংবাদ | লোহাগাড়ায় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ অলিখিত অবদানের এক সোনালী স্বাক্ষর

লোহাগাড়ায় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ অলিখিত অবদানের এক সোনালী স্বাক্ষর

17

মোঃ জামাল উদ্দিন : লোহাগাড়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। যেটি পরবর্তীতে স্মৃতিসৌধ। লোহাগাড়া উপজেলা পরিষদের প্রবেশ মুখে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে রয়েছে। ১৯৯১ সালে এ শহীদ মিনার স্থাপনে দু’তরুনের অগ্রণী ভূমিকার গৌরবোজ্জল ইতিহাস। দীর্ঘদিন ছাইচাপা পড়ে রয়েছে। সেদিনের সোনালী ভূমিকার কথা তুলনাহীন। প্রতিবেদনটি স্মৃতিচারণমূলক বিধায় সংগত কারণে আমিত্ম এসে গেছে।

যেভাবে শহীদ মিনার হলো : সেদিন ১৯৯১ সালের ২০ ফেব্র“য়ারী। এ প্রতিবেদক বর্তমান লোহাগাড়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি নুরুল ইসলামকে নিয়ে একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ বেদীতে পুষ্পস্তবক দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। উভয়ের পকেটে টাকা না থাকায় রাতে লোহাগাড়া অফিসার্স ক্লাবের তদানীন্তন সেক্রেটারী বিএডিসি’র উর্ধতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মজিবুল হায়দার চৌধুরীর উপস্থিতি ও পরামর্শে তদানীন্তন লোহাগাড়া আনসার ভিডিপি কর্মকর্তা আবদুল কুদ্দুছের কাছ থেকে একশত টাকা নিয়ে দু’জনে একটি ফুলের তোড়ার অর্ডার দিয়েছিলাম। তখন রাত দশটা। পুষ্পস্তবক হাতে পাবার পর নুরুল ইসলাম জানালেন লোহাগাড়ায় কোন শহীদ মিনার নেই। যে যার মত হাইবেঞ্চ, লোবেঞ্চ এর উপর সাদা কাপড় ঢেকে দিয়ে অস্থায়ী শহীদ মিনার বানান। ফুল দেন। এ প্রতিবেদকের কাছে তখন কিছু টাকা অবশিষ্ট ছিল। তখন মনে আসে শহীদ মিনার বানানোর কথা। তিনি তখনও বগুড়া প্রেস ক্লাবের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক। যেখানে গত ফেব্র“য়ারীতেও সস্ত্রীক প্রভাত ফেরীতে অংশ নিয়েছিলেন। নিজের উপজেলায় অস্থায়ী শহীদ মিনারে শ্রদ্ধার্ঘ দিতে মন সায় দিলনা। নুরুল ইসলামের পরামর্শে তখন সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বড় বড় সাইজ কাঠ পুতে লোহাগাড়া উপজেলা চত্বরে শহীদ মিনার করা হবে। আমরা প্রথমে আওয়ামীলীগ তারপর শ্রমিক সংগঠন ও সর্বশেষ একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কাছে শহীদ মিনার গড়ার প্রস্তাব নিয়ে যাই। তারা কুত্তা বিড়ালের মত তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। প্রশ্ন করেছিলেন তারা কি ভোট করবেন, নাকি শহীদ মিনার করবেন ? তাদেরকে বোঝানো যায়নি, স্বাধিকার না আসলে স্বাধীনতা আসতো না। আগে শহীদ মিনার পরে ভোট। যা হোক তখন স্কুল রোডে মফিজুর রহমানের সাইজ কাঠের দোকানে কাঠ কিনতে যাই। সেখানে কামাল উদ্দিন নামে একজন ছাত্র বসা ছিলেন। তিনি আমাদেরকে একটা শাবল যোগাড় করে দিয়েছিলেন। মফিজ ছিলেন একজন রাজনৈতিক (বাকশাল) দলের নেতা। কাঠ গুলো তিনি বিনা মূল্যে দিয়েছিলেন। আমরা তখন একটা গামপট ও কিছু সাদা কাগজ কিনলাম। কাঠগুলো সাদা কাগজে গাম লাগিয়ে মুড়িয়ে দিলাম। স্থানীয় জুয়েল ষ্টুডিও থেকে একজন ফটোগ্রাফার নিয়ে দুটি রিক্সা করে উপজেলা সদর অভিমুখে রওয়ানা দিই। কাঁচা বাজারের সামনে যাবার পর প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দ শুনে থেমে গেলাম। তখন সংসদ নির্বাচন চলছিল। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ’র নেতৃত্বে গঠিত তদানীন্তন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০ ফেব্র“য়ারী থেকে ২৭ ফেব্র“য়ারী অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন উপলক্ষে বৈধ অস্ত্র পরিবহনও নিষিদ্ধ করে ফরমান জারি করেছিলেন। লোহারদিঘীর পাড় ও শুটকীবাজার হতে বিএনপি-আওয়ামীলীগ সমর্থকরা তখন গোলাগুলি করছিলেন। আধঘন্টা পর গোলাগুলি থেমে যায়। তখন রাত সাড়ে এগারটা। আমরা কাঠ, শাবল ও ফুল নিয়ে যাত্রা করতে থাকি। পুলিশ আমাদেরকে থানায় ধরে নিয়ে যায়। তখন ওসি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবদুল আওয়াল। তাকে আমাদের অভিপ্রায়ের কথা জানালে তিনি আমাদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি শহীদ মিনার পাহারার ব্যবস্থা করেন। তিনি বলেছিলেন পুলিশ শহীদ মিনার স্থাপন করতে পারেন না। তবে যদি শহীদ মিনার হয় সেটা রক্ষা করতে পারেন। তখন আমরা উপজেলা পরিষদের গেইটে যেখানে কাদেরের দোকান সে স্থানে শহীদ মিনার স্থাপন করে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করি। পরদিন সকালে তদানীন্তন ইউএনও এবিএম শফিকুল হক মজুমদার, উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা, তাদের স্ত্রী-পুত্রদেরকে সাথে নিয়ে উপজেলা চত্বরে প্রভাত ফেরী করি। ইউএনও’র নেতৃত্বে ২২ ফেব্র“য়ারী সকাল ৭টায় উপজেলা আবাসিক এলাকাবাসীরা কয়েকটি গোলাপ শহীদ মিনারে অর্পণ করেন। তখন আমরাসহ আবু জাহেদ চৌধুরী (বর্তমান একটি পরিবহন কোম্পানীর গাড়ির মালিক), তৈয়ব তাহের (বর্তমানে ব্যবসায়ী), তদানীন্তন শুটকী বাজারের ব্যবসায়ী রতন বড়–য়া শহীদ মিনারের চারিদিকে দড়ি দিয়ে নিরাপত্তা বলয় সৃজন করি। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে শহীদ স্মরণে আলোচনা সভা করি। ম.ই.হাশেমুর রশিদ তাতে সভাপতিত্ব করেন। একই বছর ১২ মার্চ শহীদ মিনার বাস্তবায়ন উপলক্ষে এক সভা ম.ই.হাশেমুর রশিদ এর সভাপতিত্বে উপজেলা পাবলিক হলে অনুষ্ঠিত হয়। তদানীন্তন ইউএনও এবিএম শফিকুল হক মজুমদারকে পৃষ্টপোষক, তদানীন্তন ওসি মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবদুল আওয়ালকে উপদেষ্টা, লোহাগাড়া থানা আওয়ামীলীগের জেষ্ট সহ-সভাপতি ম.ই হাশেমুর রশিদকে সভাপতি, মোঃ জামাল উদ্দিনকে সম্পাদক ও নুরুল ইসলামকে যুগ্ম সম্পাদক করে ২৭ সদস্য বিশিষ্ট শহীদ মিনার বাস্তবায়ন কমিটি গঠিত হয়। ইউএনও এবং ওসি সভায় উপস্থিত ছিলেন না।

অন্যান্যদের মধ্যে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা হলেন প্রদত্ত স্বাক্ষরের ক্রমানুসারে ছৈয়দ মোঃ ইলিয়াছ, সামশুল আলম চৌধুরী, আহমদ হোসেন, মোঃ সামশুল কামাল, রূপন দাশ, ফজল করিম, ছিদ্দিক আহমদ, আবদুল ছালাম মাষ্টার, আবুল বশর এমইউপি, আসহাব মিয়া, নুরুল ইসলাম, মাষ্টার সুভাষ চন্দ্র নাথ, মাষ্টার মাহবুবুর রহমান, এইচ.এম আবদুল গণি সম্রাট, নুরুল আমিন, আবদুর রশিদ, মোঃ আবু তালেব, ব্রজেন্দ্র দেব নাথ ও মাষ্টার সাধন চন্দ্র নাথ প্রমুখ। এটি বাস্তবায়নের জন্য তদানীন্তন উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার রেজাউল করিম তার অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবুল কাশেমের সাহায্যে একটি নকশা অংকন প্রাক্কলন তৈরী করেন। যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ১,৩০,৩১২ টাকা ২৫ পয়সা। এসবের তথ্য উপাত্ত এ প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৯০ সালের ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সংগ্রাম পরিষদের প্যাডে ইউএনও বরাবরে একটি শহীদ মিনার করার দাবীতে ডাঃ মোঃ এমরান, নুরুল ইসলাম ও লোহাগাড়া ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবু তালেব স্মারকলিপি প্রদান করেন। তার প্রেক্ষিতে তদানীন্তন উপজেলা চেয়ারম্যান “উপজেলা চত্বরে শহীদ স্মরণ করার জন্য কোন বাধা নাই তবে স্থানীয়ভাবে চাঁদা আদায় করতঃ নির্মাণ করিতে হইবে” এরূপ লিখে দিয়ে ছিলেন। বস্তুতঃ শহীদ মিনার নির্মাণ শব্দটি না লিখে এটি নির্মাণের বিষয় তিনি এড়িয়ে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*