ব্রেকিং নিউজ
Home | লোহাগাড়ার সংবাদ | মেশিনে ধান কাটা মাড়াই গ্রামীণ জনপদে অন্যতম উদ্দীপনা

মেশিনে ধান কাটা মাড়াই গ্রামীণ জনপদে অন্যতম উদ্দীপনা

09

মোঃ জামাল উদ্দিন : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গ্রামীণ জনপদে ধান কাটা, মাড়াই ও একই সময়ে বস্তাবন্দী করার মেশিন প্রদর্শনী ব্যবস্থা নিয়েছে। লোহাগাড়ার মজিদার পাড়ায় অনুষ্ঠিত মাঠ দিবসে জনৈক কৃষক বলেছেন, ইবা হনডইল্যা মেশিন। ধান হাড়িবারলাই গউর নলাগিব। উৎসুক জনতা ও লোহাগাড়ার বিভিন্নস্থানে এ মেশিন দেখে অন্যরকম উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও কৃষিবিদ আবদুল আহাদ জানিয়েছেন, একটি মেশিনের নাম রিপার। এ মেশিন দিয়ে শুধু ধান কাটা যায়। অন্যটি কনবাইন হারর্বেষ্টার। এ মেশিন দিয়ে কৃষক ধান কাটার সাথে সাথে মাড়াই, শুকানো ও ধান বস্তাবন্দি করতে পারেন। সাশ্রয়ী মূল্যে এসব মেশিন ক্রয় করা যায়। রিপার কিনতে একজন কৃষককে ভর্তুকবাদে লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করতে হয়ে। এক কানি অর্থাৎ ৪০ শতক ধান কাটতে ৮শ টাকা ব্যয় হয়। লোহাগাড়ায় বর্তমানে দু’টি রিপার রয়েছে। একজন রিপারের মালিক লক্ষাধিক টাকা বিনিয়োগ করে প্রতিদিন ৮ কানি জমির ধান কাটতে পারেন। আমন মৌসুমে ২০-২৫ দিন ধান কাটলে রিপারের একজন মালিক আশি হাজার টাকা আয় করতে পারেন। এক মৌসুমেই তার বিনিয়োগের সিংহভাগ টাকা উঠে আসে। বর্তমানে এক কানি জমির আমন ধান কাটতে দেড় হাজার টাকার মজুরী ও অন্যান্য খাতে ৫শ টাকা ব্যয় হয়। রিপারের সাহায্যে ধান কাটলে কৃষকের বাড়িতে ধান উঠতে এক হাজার টাকার অধিক খরচ হয় না বলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দাবী করছেন। তিনি মাঠ দিবসে কৃষকদেরকে জানিয়েছেন, এ প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে ও কিনতে তার সাথে কৃষকরা যেন সরাসরি যোগাযোগ করেন। কনবাইন হারর্বেষ্টারের আকৃতি দেখতে একটা ধৈত্যের মতো। চালক দন্ডায়মান ধান কাটতে এটি যখন চালু করেন তখন হাতির মতো মনে হয়। হাতি যেমন কলাগাছ ভক্ষণ করে তেমনি ভাবে এটিও ধান কেটে শরীরের মধ্যে প্রবেশ করায়। পরে প্রযুক্তির সাহায্যে নাড়া ও ছিটা আলাদা করে ধানগুলো বস্তায় ভরা হয়। কৃষক বস্তা ভরে ধান বাড়িতে নিয়ে যান। এ যন্ত্রের দামও কৃষকের নাগালের মধ্যে। বাঙ্গালীকে চা পান করা শিখানোর জন্য এক সময় বিনামূল্যে চা খায়ানোর পাশাপাশি একটি রুমালও দেয়া হতো বলে জনশ্র“তি আছে। তেমনিভাবে কৃষি বিভাগ মাঠ দিবসে বিনামূল্যে ধান কাটা প্রত্যক্ষ করার জন্য এলাকাবাসীকে জড়ো করেন। তাদেরকে নাস্তা পানি খাইয়ে মেশিনের গুণগত কার্যকারিতা সম্পর্কে অবহিত করেন। তাদের ধারণা একদিন কৃষকরা নিজেদের লাভ বুঝতে পেরে এ মেশিন কিনবেন। জানা যায়, এ দেশে কৃষি প্রযুক্তি পরিচিত করতে তদানীন্তন সরকারের গলদঘর্ম হতে হয়েছে। সার, বীজ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করার সময় অনেক জায়গায় কৃষি কর্মকর্তাকে নাজেহাল হতে হয়েছে। সার দেওয়ার সময় কৃষকরা বলতেন আল্লাহর হুকুমেই ধান হয়। এতে সার দিতে হবে কেন। বিষ ও কীটনাশক দেয়ার সময়ও একই ধারণা বিদ্যমান ছিল। তবে আস্তে আস্তে তা সয়ে গেছে। এখন হালের বলদ ও লাঙ্গল কাদে কৃষকের মেঠো জনপদে ভোরবেলা যাওয়ার দৃশ্য তেমন দেখা যায় না। তাদের স্থান দখল করেছে কলের লাঙ্গল। কৃষকের উঠানে আগে মইয়া (কাটের দন্ড) পুতে তার সাথে দড়ির সাহায্যে গরুর সারি বেঁধে ধান মাড়াই হতো। এখন সেসব অতীত দিনের স্মৃতি সেই মইয়াও নেই ধান মাড়াইও নেই। তাও মেশিন দখল করে নিয়েছে। আগে ভোরবেলা মাড়াই করা ধানের মধ্যে ছোট ছোট শিশুরা ডিগবাজি খেত। মহিলারা খড়গুলো একইস্থানে জড়ো করতেন। পরে এ খড় দিয়ে কুইরগ্যা (খড়ের গাদা) বানানো হতো। যা বর্ষাকালে গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখন কৃষকের ঘরে কুইরগ্যার উপস্থিতিও নেই। যান্ত্রিক উপায়ে ধান মাড়াইয়ের পর ২/৩ মাস খড় খায়ানো হয়। পরে বাজার থেকে ভুষি, কুড়া কিনে নিয়ে পশুখাদ্যের অভাব মিটানো হয়। কৃষকের বাড়িতে আজ গো-পালন নেই বললেই চলে। আগে গরু দিয়ে চাষ করা হতো বলে একজোড়া গরু প্রতি কৃষকের ঘরে মোতায়েন থাকতো। অপরদিকে, দুধের গাভিও তারা লালন-পালন করতেন। আহরিত দুধ দিয়ে নিজেদের প্রয়োজন মিটানোর পাশাপাশি অনেক গৃহিনী হাড়িতে দই বসাতেন। এসব দই বাজারে বিক্রি হতো। সেটিও আজ গতায়ু হয়ে গেছে। গ্রামীণ জনপদে দইয়ের স্থান দখল করেছে কৃত্রিমভাবে তৈরী পাউড়ারের দই। এসব খেয়ে অনেকে তৃপ্তির ঢেকোর তুলেন। গ্রামীণ মহিলারা আগে ঢেঁকির সাহায্যে চাল তৈরী করতেন। নতুন ধানের চালের গুড়া ঢেঁকিতেই তৈরী হতো। আজ ঢেঁকি নেই। কলের মেশিন রয়েছেন। ঢেঁকি ছাটা চাল ভিটামিনযুক্ত বলে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এখন ক্রেতারা চাল যত সাদা হয় সেসব চাল কিনেন। বর্তমানে কৃষকের ধান কাটার জন্য আর সকালবেলা মজুরকে গরম ভাত খায়ানো কিংবা জুনা (ধান বাঁধার জন্য খড়ের দড়ি) তৈরী করতে হবে না। হুইচা অর্থাৎ একটি কাটের তৈরী দন্ড। যার দু’মাথায় মসৃণ থাকে। হারিয়ে যাবে কাস্তে দিয়ে ধান কাটা হবে না বলে পরবর্তী প্রজন্ম হইচা-কাচি কি জিনিস তা চিনবে না। অথচ গ্রামীণ সংস্কৃতিতে ঢেঁকি, হুইচা, কাঁচি অমূল্য উপাদান। যান্ত্রিক সভ্যতায় মানুষ বিজ্ঞানের মাধ্যমে দূরকে করেছে নিকট। পরকে আপন করেছে। আজ চিঠির মাধ্যমে প্রেম নিবেদন হয়না। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট প্রেমিক যুগলকে কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। নিকট ভবিষ্যতে রিপার, কনবাইন হারর্বেষ্টারকে নতুনভাবে পরিচয় করে দেয়ার প্রয়োজন পড়বে না। এমনটাই অভিমত রেখেছেন এলাকার কৃষকরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*