ব্রেকিং নিউজ
Home | সাহিত্য পাতা | মেঘের আড়াল থেকে (পর্ব- ৮)

মেঘের আড়াল থেকে (পর্ব- ৮)

444

শীলা ঘটক : স্মৃতির পথ ধরে অতীত নিজেদের কক্ষপথে বন্‌বন্‌ করে ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে আসছে তিতিরের দিকে। উফ্‌ কি প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করছে, ভালো লাগছে না ,কিছু ভালো লাগছেনা। শুভ অফ হয়ে গেল! কিছু ভালো লাগছেনা…

ব্যান্ডের মিউজিক কনসার্টে সামনে জনতার হাততালি স্টেজের ওপর শুভর গীটারে গানের সুর বাজছে, ‘কুছ না কাহো…… কুছ ভিনা কাহো…… ক্যয়া ক্যহেনা হ্যয়… ক্যয়া শুননা হ্যয় …… মুঝকো পাতা হ্যয়…… তুমকো পাতা হ্যয়…… সময় কা ইয়ে পল…… থামসা গ্যয়া হ্যয়…… অর ইস পল মে কোইই নেহি হ্যয় …… ব্যস এক ম্যয় হু …… ব্যস এক তুম হো …… গানের তালে তালে শ্রোতামন্ডলীর গলা মেলানো, গানের মূর্ছনায় সেই সন্ধ্যা হয়ে উঠেছিল স্বপ্নিল সন্ধ্যা!

প্রোগ্রাম শেষ হতে অনেক রাত হয়ে গেল। যদিও বাড়ির কাছাকাছি একটা ক্লাবের মাঠে ওদের প্রোগ্রামটা হচ্ছিল। রাত এগারোটা বেজে গেছে, অনুষ্ঠান শেষ হোল। পল্লব, কৌশিক, রঙ্গন আরও সব বন্ধুরা স্টেজের ওপর বাজনাগুলো কভারে ভরছে, এমন সময় অণুরিমা বলল, শুভ আমাদের একটু দিয়ে আসবি চল, অনেক রাত হয়ে গেছে। শুভ চিরকালই খুব দায়িত্বশীল বলে বন্ধুদের কাছে ওর গুরুত্ব অন্যরকম। শুভ বলল, আমি ওদের দিয়ে আসি রে, তোরা গোছাতে থাক।

রাস্তাটা একেবারে নির্জন হয়ে গেছে, একে শীতকাল, সেবার ঠাণ্ডাও খুব পড়েছিল। সুনসান রাস্তায় ওরা তিনজন হেঁটে চলেছে…… পায়ে কি যেন একটা ঠোক্কর লাগলো শুভর, ও দাঁড়িয়ে পড়ল। তিতির, অণুরিমা সেটা লক্ষ্য করলো না এগিয়ে গেল সামনের দিকে…… শুভর থেকে ওরা প্রায় দশবারো ফুট এগিয়ে গেছে, হঠাৎ তিনজন ছেলে ওদের সামনে এসে দাঁড়ালো। তিতিরের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে রাস্তার এক ধারে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। অণুরিমার আর তিতিরের চিৎকারে শুভ দৌড়ে এগিয়ে আসে ওদের দিকে। ওই তিনটি ছেলের মধ্যে একজন তখন
তিতিরকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। তিতির চিৎ হয়ে পড়ে যায়, ছেলেটি তখন ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর হাতদুটো চেপে ধরেছে, শুভ পেছন দিক থেকে এসে একলাথি মারলো ছেলেটাকে। ছেলেটা ছিটকে গিয়ে পড়লো দু/তিন হাত দূরে। আরও দুজন এগিয়ে এলো শুভর দিকে, ওকে মারার জন্য। শুভ মার্শাল আর্ট জানতো বলে ওই দুটোকে কাবু করতে সময় লাগেনি। তিনটে কে ধরে উধম মার দিয়ে শুইয়ে দিল রাস্তার মাঝখানে। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে তিতির তখন কাঁদছে…… অণুরিমা বুঝলো শুভকে আটকাতে না পারলে যেকোন একটা আজ শুভর হাতে মরবে…… পেছন থেকে অণুরিমা ডাক দেয়, শুভওওও ছেড়ে দে ওদের, আর মারিস না।

তারপর ওদের দুজনকে নিয়ে শুভ পৌঁছালো লোকাল থানায়। ঘটনার সব বিবরণ দিয়ে একটা ডাইরি করলো। থানার IC একটু গড়িমসি করছিল ডাইরি লিখতে গিয়ে, সেটা শুভ লক্ষ্য করেছিল।
থানা থেকে বেরিয়ে এসে শুভ বলল, লোকটা ডাইরি লিখতে চাইছিল না দেখলি? কি ব্যপার একটু বুঝতে হবে।

আরে ওই যেটাকে দেখলি বেশী অসভ্যতামি করছিল, ওটা হোল এখানকার লোকাল মাস্তান, আর দুটো ওর চ্যেলা। কয়দিন আগে বাপির দোকানে এসেছিল টাকা আদায় করতে। সে এক বিশাল অঙ্কের মোটা টাকা। বাপি দিতে রাজি হয়নি, সেই ঘটনার শোধ যে এইভাবে তুলবে সেটা আমি ঘূর্ণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি। ওরা এখানকার লোকাল পলিটিক্সের মাথা। রুলিং পার্টির পোষা মাস্তান, তুই এদের গায়ে হাত দিলি আমার এখন ভয় করছে তোকে না কিছু করে দেয়।

একমুখ হাসি নিয়ে শুভ বলে অতো সহজ নাকি সবকিছু! চল বাড়িতে দিয়ে আসি।
এরপর যা ঘটলো সে আরও অভিনব !! পরেরদিন সন্ধ্যের দিকে পুলিশ ভ্যান এসে দাঁড়ালো তিতিরদের বাড়ির সামনে, কিছুক্ষণ পর তিতিরকে ভ্যানে তুলে নিয়ে চলে গেল।
কেন তুলে নিয়ে গেল?! তিতিরের মা, বাবা কিছুই বুঝল না। সঙ্গে সঙ্গে খবর চলে গেল শুভর কাছে, যে পুলিশ এসে তিতিরকে তুলে নিয়ে গেছে।
ঝড়ের গতিতে বাইক নিয়ে শুভ পৌঁছে গেল থানার সামনে।
IC কাছে জানতে চাইলো, কারণ কি ওকে ধরে আনার?
IC বলল, ওপর থেকে অর্ডার আছে, মেয়েটি ওই ছেলেগুলোকে ফালতু ব্লেম দিচ্ছে তাই।
এবার শুভর চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরে পরল,হুঙ্কার দিয়ে বলল, কাল কারা আগে ডাইরি করেছিল? আমরা না ওরা,দেখান সেই ডাইরি, না দেখালে আমি কিন্তু অন্য জায়গায় পৌঁছে যাবো, ওকে ছাড়ুন, এভাবে একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছেন? লজ্জা করেনা আপনাদের? ছেলেগুলোর টিকি কোথায় বাঁধা আছে আমি জানি, আর কোন ওপরওয়ালা আপনাকে অর্ডার করেছে দেখছি…… শুভর হুঙ্কার শুনে অফিসারটা কিছুটা হলেও হতভম্ব হয়ে গেল। সাংঘাতিক বচসা হোল শুভ আর ওই অফিসারের মধ্যে। এরপর অফিসার তিতিরকে ছেড়ে দিল।
রাতে খাওয়া দাওয়ার পর শুভ মোবাইল খুলে দ্যাখে তিতির অন আছে, শুভ লিখতে থাকে, ‘কি করছিস?
‘অফিস থেকে ফিরছি, রাস্তায় আছি, বল কি বলবি’।
‘আগে রুমে যা তারপর কথা বলবো, রুমে গিয়ে একটা ম্যাসেজ করিস’।
মোবাইলে একটা ম্যাসেজ ঢুকল, মোবাইলটা বেজে উঠলো।
‘বল, এই ঘরে এলাম’
‘তুই রেস্ট নে পরে কথা হবে’ শুভ লিখতে থাকে…
‘আরে বলনা, তোর ম্যাসেজ দেখলে খুব ভালো লাগে, সেটা কি তুই বুঝিস না?’
‘তুই বিয়ে করবিনা?’ শুভ জানতে চাইলো।
‘বিয়ে!! মাথাখারাপ! নেড়া বেলতলায় একবার যায়, বার বার যায়না বুঝলি’।
‘কেন সেই বাপিদার সাথে কন্টাক্ট নেই, তোকে যে প্রপোস করেছিল? কাজরীর দাদা বাপিদার কথা বলছি’।
‘হা হা হা হা তোর দেখছি সব কথা মনে আছে, কিছু ভুলিস নি’। তিতির হাসতে থাকে।‘ সেই কোন ছোটবেলার কথা, আরে ওটা প্রেম নয়, infatuation বাপিদা এখন নয়ডাতে থাকে, শ্রেয়াকে বিয়ে করেছে, ভালই আছে ওরা। ওদের একটা মেয়ে হয়েছে। বাপিদা ইঞ্জিনিয়ার, Wipro তে আছে। আর শ্রেয়ার বুটিকের ব্যবসা, বেশ ভালো আছে ওরা। আর কাজরীর খবরটা জানিস নিশ্চয়ই!
‘না জানিনা, কেন কি হয়েছে?’
কতকগুলো কান্নার স্টিকার দিয়ে তিতির চুপ করে থাকে, কিছু লেখে না।
শুভ বুঝতে পারে কাজরীর খবর ভালো না। কি লিখবে ভেবে পায়না, দুজনেই চুপ। কিছুক্ষণ পর শুভ লিখলো, ‘কি হয়েছে কাজরীর? বল আমাকে…
‘কলেজে পড়ার সময় একজন প্রফেসরের কাছে কাজরী প্রাইভেটে পড়তো ফিজিক্সটা। ভদ্রলোক প্রায় আঠেরো বছরের বড় ওর থেকে। ওরা প্রেম করতো, এটা কাজরীর মা, বাবা জানতো না। একদিন যখন ও ওর মাকে বলল যে ওই প্রোফেসরকে ও বিয়ে করবে, শুনে ওর মা মেনে নিতে পারেনি। সেদিন রাতে ওর বাবা কাজরীকে খুব মারধোর করেছিল। বাপিদা আর শ্রেয়ার তখন বিয়ে হয়ে গেছে। ওরা তখন কোলকাতায় ছিলনা, নয়ডাতে চলে গেছে। কোন এক রবিবার বিকেলে কাজরী নিজের ঘরের সিলিং এ ওড়না জড়িয়ে আত্মহত্যা করে!’
শুনে শুভর চোখে ভেসে ওঠে কাজরীর সেই চেহারাটা, শ্যামলা গায়ের রঙ, ঘন কালো লম্বা চুলের বেনী, দুটি ফালা ফালা দীঘল চোখ, সুন্দর শরীরের গড়ন। কপালে খুব বড় খয়েরি রঙের টিপ পড়তো। গানের গলাও খুব ভালো ছিল। এতো সুন্দর রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইত! ভাবা যায়না! ও গান গাইতে শুরু করলে সবাই চুপ করে শুনত। কাজরীর চেহারাটা মুহূর্তের মধ্যে শুভর চোখের সামনে ফুটে উঠলো।

ক্রমশঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*