ব্রেকিং নিউজ
Home | লোহাগাড়ার সংবাদ | বৃক্ষপ্রেমিক সুনীল কুমার চৌধুরী : শিক্ষকতার পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ যার নেশা

বৃক্ষপ্রেমিক সুনীল কুমার চৌধুরী : শিক্ষকতার পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ যার নেশা

18

মোঃ জামাল উদ্দিন : প্রায় ৪৮ বছর ধরে একটানা শিক্ষকতা করছেন। শৈশব থেকেই বাড়ির আঙ্গিনা, ভিটেবাড়ি বা পরিত্যক্ত জায়গায় গাছ লাগানো ছিল তাঁর নেশা। প্রাকৃতিক সম্পদ প্রতিনিয়ত উজাড় হচ্ছে এ সত্যকে উপলব্ধি করে পরিবেশ ও বন রক্ষায় তিনি নিরলস কাজ শুরু করেন। অদম্য সাহস ও বনায়নের প্রবল ইচ্ছা থাকায় দুর্গম পাহাড়কে তিনি সবুজ গাছে ঢেকে দিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন মৎস্য খামার। তাকে দেখে অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে বাগান তৈরিতে মনোনিবেশ করেছেন। লোহাগাড়ার পদুয়ার শিক্ষক সুনীল কুমার চৌধুরী একজন বৃক্ষপ্রেমিক হিসেবেই এলাকায় সবার কাছে পরিচিত। প্রবীণ এ শিক্ষক বলেন , বৃক্ষকে ভালবাসি বলেই সত্তর বছর বয়সে এখনও সুস্থ আছি। বেকার থাকতে হয়নি।

সুনীল কুমার চৌধুরী ১৯৬৮ সালে কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেন এবং ওই বছরই লোহাগাড়া পদুয়া এসিএম উচ্চবিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০০৯ সালে নিয়মিত চাকুরী থেকে অবসর নেয়ার পর বর্তমানে তিনি লোহাগাড়ার আধুনগর হাজী সামশুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

সুনীল চৌধুরী বলেন, শৈশব থেকেই বৃক্ষরোপন ও মৎস্য চাষের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। বাড়ির আশাপাশে যে কোনো খালি বা পরিত্যক্ত জায়গা পেলেই তিনি গাছ লাগাতেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ীর আশপাশে গাছগুলোতে পানি দেন। বৃহৎ বনায়নের ইচ্ছা থাকলেও জায়গার অভাবে তিনি তা বাস্তবে রূপ দিতে পারেননি। অবেশেষে ১৯৯৫ সালে বান্দরবান জেলার দক্ষিণ হাঙ্গর মৌজার ৪৮ নং ফ্রি চিম্পল লর্ডে তাঁর নিজের ৪০ একর জায়গায় বনায়ন, মৎস্য ও কৃষি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে হাত দেন। বর্তমানে প্রায় আম, কাঠাল, লিচু, পেয়ারা, সফেদা, কমলা, জাম্বুরাসহ প্রায় তিন হাজার ফলজ গাছ রয়েছে। বিভিন্ন জাতের বনজ গাছ রয়েছে প্রায় লাখের কাছাকাছি। এছাড়া ঔষধি গাছের মধ্যে রয়েছে অর্জুন গাছ।

পাহাড়ি অঞ্চলে বাঁধ দিয়ে সৃষ্ট জলাশয়ে তিনি মাছ চাষ করেন। এখানে চাষ হচ্ছে রুই, কাতলা, মৃগেল, কার্ফু, তেলাপিয়া, সিলভারকার্প, গ্রাসকার্পসহ অন্যান্য মাছ। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিবছর তিনি লক্ষাধিক টাকার মাছ বিক্রি করেন। এছাড়া মিষ্টিকুমড়া, শিম, আলু, মরিচ, শসা, লাউ, টমেটো, কাঁকরোল, করলা, কাঁচালঙ্কা, আদা ইত্যাদির চাষ করেন। নিজের সংসারের চাহিদা মিটিয়ে শাক সব্জী বিক্রি করেন।

সুনীল চৌধুরী বলেন, সবুজ বনায়ন ও মৎস্য প্রকল্প নিজের অর্থেই তিনি গড়ে তুলেছেন। আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও স্কুল শেষে প্রতি সপ্তাহে দুই-তিন দিন এ অরণ্যে রাত কাটান। তিলে তিলে গড়ে তুলেন এ বাগান। সরকারী-বেসরকারী আর্থিক সহযোগিতা পেলে এ বাগানকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারবেন বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে পৃথিবী হারাচ্ছে প্রকৃতির দেওয়া রূপ। পাশাপাশি এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী বনভূমি উজাড় করার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। এতে সবুজ এ দেশটি দিনে দিনে মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে দক্ষিণ এলাকায় বিশাল বন সম্পদ অযতœ-অবহেলায় পড়ে আছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যোগাযোগসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে এখানে পর্যটনকেন্দ্রসহ বিভিন্নধরনের বাগান গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি আরোও বলেন, বর্তমানে এখানে গাছ চুরিসহ বিভিন্ন অপকর্মরোধে দক্ষিণ হাঙ্গর মৌজায় একটি স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে। বান্দরবান জেলা সদর থেকে দূরে হওয়ায় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা দূর্গম হওয়াতে বিভিন্ন অপরাধীরা এখানে লুকিয়ে থেকে মানুষের সৃজনকৃত বাগানের গাছ রাতে চুরি করে। এতে দূর্গম এলাকায় যারা বাগান করছেন তারা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ এলাকাবাসীর অভিমত শিক্ষক সুনীল চৌধুরীর বৃক্ষরোপণ দেখে এ এলাকার অনেকে বৃক্ষরোপণে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তাঁর মতো এভাবেই বনাঞ্চলসহ প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগানো উচিত এবং ফলে ভবিষ্যত প্রজন্ম জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি হতে রক্ষা পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*